বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪১ অপরাহ্ন




জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়েও বিকল্প ছিল?

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২৯ am
CNG stations CNG station Filing stations Filing station ফিলিং স্টেশন Petrol Octane Pump Price পেট্রোল অকটেন পাম্প Fuel energy জ্বালানি তেল Fuel Oil pump তেল ফিলিং স্টেশন
file pic

এক লাফে ২০ টাকা বাড়ায় এক লিটার ডিজেল কিনতে এখন লাগছে ১৩৫ টাকা। কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ এবং অকটেনের দাম ঠেকেছে ১৬৫ টাকায়। দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ। ডিজেল-পেট্রোলের এই দাম বাড়ার প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে কৃষির সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন– প্রায় সব খাতেই এর ধাক্কা লাগে। সব মিলিয়ে এর কারণে বাড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, এটি বাস্তবতা। পাশাপাশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের হিসাবও রয়েছে। কিন্তু সেই চাপ সামাল দিতে একবারে ভোক্তার ওপর ২০ টাকা দাম বাড়ানোই কি একমাত্র পথ ছিল? তাদের মতে, বছরের পর বছর বিপিসির অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল করা গেলে এবং সংকটের সময়ে কর-শুল্ক কিছুটা কমানো গেলে দাম বাড়ানোর চাপ অনেকটাই কমানো যেত।

বিপিসির আর্থিক হিসাবেও রয়েছে বড় অঙ্কের মুনাফার চিত্র। গত ১১ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। কোনো কোনো বছর মুনাফা ছাড়িয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন সময়ে বিপুল অর্থ ব্যাংকে জমা ছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেই মুনাফার অর্থ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল গড়ে তোলার উদ্যোগ দেখা যায়নি।

সরকার অবশ্য বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প ছিল সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম, জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে তেল বিক্রি হওয়ায় সীমান্ত দিয়ে পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। এসব কারণে বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। তাই আগের দামে জ্বালানি তেল বিক্রি অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কতটা
দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি আমদানি করে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে।
বিপিসি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানি করে। বাকি বড় অংশ আসে পরিশোধিত জ্বালানি তেল হিসেবে। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ডিজেল। মোট সরবরাহের দুই-তৃতীয়াংশ এই জ্বালানি। বিপিসির বেশি মুনাফা আসে অকটেন, পেট্রোল ও জেট ফুয়েল বিক্রি থেকে।

দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৫৮ শতাংশ যায় পরিবহন খাতে। বিদ্যুতে ১৮, কৃষিতে ১৫, শিল্পে ৬ এবং গৃহস্থালিতে ১ শতাংশ ব্যবহার হয়। অন্যান্য খাতে যায় আরও ২ শতাংশ। এই হিসাবই বলে দেয়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে কেন এর প্রভাব দ্রুত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

এক লিটার ডিজেলে আসলে কত খরচ
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১৮০ থেকে ১৮২ ডলার। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রিমিয়াম অর্থাৎ জাহাজ ভাড়া, বীমা ও অন্যান্য আমদানি খরচ। ব্যারেলপ্রতি এসব খরচ ছিল সাড়ে ১১ থেকে ১২ ডলার।

এই হিসাবে প্রতি লিটার ডিজেলের আন্তর্জাতিক মূল্য পড়ে প্রায় ১৪২ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভ্যাট-ট্যাক্স। ২৫ শতাংশ হিসাবে কর-শুল্কের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। এরপর দেশের ভেতরের পরিবহন, বন্দর চার্জ, এজেন্ট কমিশন, পাম্প মালিকদের কমিশনে ২৭ থেকে ২৮ টাকা খরচ হয়।

সব মিলিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে এক লিটার ডিজেল পৌঁছাতে খরচ হয় ২০৪ থেকে ২০৫ টাকা। কিন্তু নতুন দামে তা বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। অর্থাৎ বিপিসির হিসাবে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান থাকছে।
তবে খাত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, বাস্তবে বর্তমান দামে ডিজেলে বিপিসির লোকসান প্রতি লিটারে প্রায় ৫০ টাকা।

বিপিসির দেওয়া আন্তর্জাতিক মূল্যের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তা। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো একটি দিনের সর্বোচ্চ দাম ধরে দেশে তেলের প্রকৃত ক্রয়মূল্য হিসাব করা যুক্তিসংগত নয়।

তিনি বলেন, সারা বছরের জন্য জ্বালানি তেলের দরপত্র হয় দুই দফায়– জানুয়ারি থেকে জুন এবং জুলাই থেকে ডিসেম্বর। দরপত্রে মূলত প্রিমিয়াম, জাহাজ ভাড়া, বীমা ও কমিশনের মতো খরচ নির্ধারিত হয়। এরপর মাসভিত্তিক জাহাজে করে তেল দেশে আসে।

তেলের আন্তর্জাতিক দাম নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘প্ল্যাটস’ সূচক। সংশ্লিষ্ট জাহাজে তেল ওঠার আগের দিন, জাহাজীকরণের দিন এবং জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার দিন– এই তিন দিনের প্ল্যাটস দর বিবেচনায় নিয়ে গড় মূল্য নির্ধারণ করা হয়।

অর্থাৎ একটি জাহাজে যে তেল আসছে, তার দাম নির্ধারণে শুধু সংকটের দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনা করা হয় না। নির্দিষ্ট সময়ের আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, মোট আমদানির প্রায় অর্ধেক আসে জিটুজি চুক্তি এবং বাকিটা দরপত্রের মাধ্যমে। জিটুজি ব্যবস্থায় প্রিমিয়াম বা জাহাজ ভাড়াও প্রতিবছর আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই আগের দিনের পুরো মূল্যবৃদ্ধি তাৎক্ষণিকভাবে দেশের বাজারে প্রতিফলিত হবে, এমনটা বলা যায় না।

তাঁর প্রশ্ন, দাম বাড়ানোর সময় ব্যারেলপ্রতি ১৮০ থেকে ১৮২ ডলারের হিসাব সামনে আনা হচ্ছে। সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের হামলার পর দাম ওই পর্যায়ে উঠেছে। অথচ এর আগে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম ছিল প্রায় ১৫০ ডলার।

কর কমালে কি চাপ কমত
জ্বালানি তেলের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কর-শুল্কের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক যুক্ত হচ্ছে, যার পরিমাণ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। তাদের মতে, সংকটের সময়ে এই করের হার সাময়িকভাবে ১০ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে ভোক্তার ওপর পুরো আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ দেওয়া লাগত না।

তাদের যুক্তি, কর-শুল্কের একটি অংশ সরকার সাময়িকভাবে ছাড় দিলে রাজস্ব কমবে ঠিকই। কিন্তু এর বিনিময়ে পরিবহন, কৃষি ও পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপরও কিছুটা চাপ কমতে পারে।

কর পদ্ধতিতে খরচ বেড়েছে
জ্বালানি তেলে আগে বিপিসি কর-শুল্ক দিত ট্যারিফ ভ্যালুতে। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকার বিপিসিকে কর-শুল্ক দিতে বাধ্য করেছে ইনভয়েজ ভ্যালুতে। এতে তেলের দাম বাড়লে কর-শুল্কও বাড়ে। প্রতি লিটার তেলে এখন ২৫ শতাংশ কর-শুল্ক ধরলে ৩৫-৩৮ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ট্যারিফ ভ্যালুতে এটা প্রায় নির্ধারিত ছিল।

মুনাফার চিত্রও বড়
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১১ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে বিপিসি।
কয়েক বছরে মুনাফা ছিল উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসির মুনাফা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুনাফা ছিল প্রায় ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা লাভ করে সংস্থাটি। অর্থাৎ বিপিসি শুধু লোকসান করে এমন চিত্র সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সংস্থাটি বড় অঙ্কের মুনাফাও করে।

ব্যাংকে টাকা, বোনাস ও ভবন
বিপিসির অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিপিসি ও এর আওতাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখা হয়। সেই অর্থ থেকে সুদ আয় হয়। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল– এই তিন বিপণন কোম্পানির মোট লাভের বড় অংশ সুদ থেকে আসে বলেও তাদের দাবি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অঙ্কের লাভের বোনাস দেওয়ার নজিরও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বছরে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বোনাস পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। এর পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের মতো প্রকল্প চলছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটের সময়ে এসব ব্যয়, ব্যাংক আমানত, বোনাস ও উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

লাভের টাকা গেছে সরকারি কোষাগারেও
বিপিসির মুনাফা শুধু প্রতিষ্ঠানের কাছেই থাকেনি। ভ্যাট, ট্যাক্স, লভ্যাংশ ও উদ্বৃত্ত অর্থের মাধ্যমে বিপুল টাকা গেছে সরকারি কোষাগারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিপিসি সরকারি তহবিলে দিয়েছে ১৫ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসানে থাকলেও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দিয়েছে ১৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৭৭৮ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৪ হাজার ১৪৬ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯ হাজার ৫৯০ কোটি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯ হাজার ৯৭ কোটি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯ হাজার ২৪৮ কোটি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬ হাজার ২১৯ কোটি এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে বিপিসি।

২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুই অর্থবছরে এর পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে কমছে তেলের দাম
আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক মাসের টানা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পর জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ১০০ ডলারের ওপরে অস্থির থাকার পর গতকাল ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)–দুই প্রধান বেঞ্চমার্কের দামই ২ শতাংশের বেশি কমেছে। ওপেক প্লাসের সরবরাহ বাড়ানোর পূর্বাভাস এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ার খবরে ওই দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৭১ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে আসে।

তবে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ এখনও পুরোপুরি কমেনি। শোধন, জাহাজ ভাড়া, বীমা ও পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি থাকায় ডিজেল ও পেট্রোলের আন্তর্জাতিক দর এখনও উঁচু।

‘আপৎকালীন তহবিল করা যেত’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে দাম সমন্বয় হতে পারে। তবে ওই ফর্মুলার কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, ভ্যাট-ট্যাক্স ও বিপিসির লাভ ধরে মূল্য নির্ধারণ করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামই থাকুক, বিপিসির জন্য একটি মার্জিন থেকে যায়। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিপিসি বছরে গড়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার মতো মুনাফা করেছে।

এই উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল গঠন করা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় সেই অর্থ থেকে ভোক্তার জন্য মূল্য সমন্বয় করা যেত বলে মনে করেন তিনি।

‘হিসাবের স্বচ্ছতা নেই’
বিপিসির আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানসম্মত নিরীক্ষার প্রস্তাব দিলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। একদিকে লোকসানের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মীদের বড় অঙ্কের বোনাস দেওয়ার তথ্যও রয়েছে।

তাঁর মতে, ভোক্তাদের চাপের মুখে জ্বালানি খাতের কিছু পণ্য এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ডিজেল ও অকটেনের মূল্য নির্ধারণ এখনও বিপিসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অথচ সংস্থাটির প্রকৃত লাভ-লোকসানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না।

শামসুল আলম বলেন, ডিজেলের দাম বাড়িয়ে বিপিসি কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়তি আয় করতে পারে। কিন্তু এর প্রভাবে পরিবহন ভাড়া, পণ্যমূল্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়বে, তার আর্থিক প্রভাব আরও বড় হতে পারে।

সরকারের দাবি, বিকল্প ছিল সীমিত
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম বাড়তে থাকায় আগের দাম ধরে রাখা হলে বিপুল ভর্তুকি দিতে হতো। তাঁর হিসাবে, দাম না বাড়ালে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব জ্বালানি পণ্য মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারত।

তিনি আরও বলেন, দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হলে প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। সেই ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হয়েছে সরকারকে।

এদিকে পরিমাপে কম তেল দেওয়ার অভিযোগে রংপুর নগরীর চারতলা মোড়ে একটি ফিলিং স্টেশনকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ ছাড়া অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। samakal




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD