রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৫ অপরাহ্ন




স্যাটেলাইট নজরদারিতে আসছে বঙ্গোপসাগরের নৌযান, বসবে এআইএস

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:৫৩ pm
মহাবিশ্ব sky satellite Bangabandhu Satellite-1 বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ satellite space orbit surface solar moon planet কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১
file pic

বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী নৌযানকে সার্বক্ষণিক স্যাটেলাইট নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ জন্য নৌযানে থাকা ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা এআইএস-কে স্যাটেলাইটভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র মেরিটাইম এআইএস ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রে থাকা আওতাভুক্ত নৌযানের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও গতিপথের তথ্য উপকূলে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার, এমনকি রাজধানী ঢাকায় বসেও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

মূলত গভীর সমুদ্রে নৌযানের সঙ্গে স্থলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণেই এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি পেরিয়ে মাছ ধরার ট্রলারগুলো যতই উপকূল থেকে দূরে যায়, ততই দুর্বল হয়ে আসে মোবাইল নেটওয়ার্ক। স্বাভাবিক অবস্থায় উপকূল বা দ্বীপ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত কোনো বিশেষ সরঞ্জাম ছাড়াই মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। হাই-গেইন কোস্টাল অ্যান্টেনা ও বুস্টারের সহায়তায় এই পরিসর সর্বোচ্চ ৩৮ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এরপর নৌযানগুলো সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে চলে যায়। ফলে সেগুলোর অবস্থান, গতিপথ কিংবা গতি তাৎক্ষণিকভাবে জানার সুযোগ থাকে না।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে গভীর সমুদ্রে কোনো নৌযান ঝড়, যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা দুর্ঘটনার কবলে পড়লে সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নৌযানটি সর্বশেষ কোথায় ছিল বা কোন দিকে যাচ্ছিল— এমন তথ্য না থাকায় দীর্ঘ অনুসন্ধান চালাতে হয়। বিশাল সমুদ্র এলাকায় নিখোঁজ নৌযান খুঁজে বের করা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি জটিল হয়ে ওঠে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতাও। ফলে সময়মতো উদ্ধার করা সম্ভব হয় না অনেককেই।

প্রস্তাবিত স্যাটেলাইটভিত্তিক এআইএস ব্যবস্থা চালু হলে এই চিত্র বদলে যাবে। নৌযানে থাকা এআইএস ডিভাইসের মাধ্যমে পাওয়া পরিচয়, অবস্থান, গতি ও গতিপথের তথ্য স্যাটেলাইটের সাহায্যে সোজা পৌঁছাবে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায়। ফলে মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে থাকা নৌযানও নির্দিষ্ট ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় থাকবে।

দেশের একমাত্র স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বতন্ত্র মেরিটাইম এআইএস ব্যবস্থা তৈরির জন্য চারটি লো আর্থ অরবিট (এলইও) স্যাটেলাইট নিয়ে একটি ‘স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন’ গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী প্রায় ৩০ হাজার নৌযানকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আনতে ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা এআইএস স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। গভীর সমুদ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় যেসব নৌযান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেগুলোর পরিচয়, অবস্থান, গতি ও গতিপথ উপকূলে বসেই নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে
তবে, উদ্যোগটি এখনও বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কারিগরি নকশা, অর্থায়ন ও টেন্ডারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কতটি স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হবে এবং পুরো ব্যবস্থাটি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা পরবর্তী ধাপে চূড়ান্ত হবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মৎস্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মাছ ধরার নৌযানকে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনার বিষয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে বৈঠকও হয়েছে। তবে, কীভাবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে পরিকল্পনা ও আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে কীভাবে কাজটি করা যায়, সেটি যাচাই করা হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার আয়তন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। বিশাল এই জলসীমায় প্রতিনিয়ত মাছ ধরতে যায় প্রায় ৩০ হাজার নৌযান। এসব নৌযানের কোনটি মাছ ধরছে আর কোনটি অন্য কাজে বা অন্য গন্তব্যে যাচ্ছে, তা আলাদাভাবে শনাক্ত করে সার্বক্ষণিক নজরে রাখা বেশ কঠিন। এর বাইরে সমুদ্রসীমায় বাণিজ্যিক ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি নৌযানও চলাচল করে। ফলে এত বিস্তৃত জলসীমায় নৌযানের অবস্থান ও গতিবিধি নিয়মিত ডিজিটাল প্রযুক্তিতে পর্যবেক্ষণ করা এখনও সম্ভব হচ্ছে না।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে যুক্ত নিবন্ধিত নৌযান রয়েছে ২৮ হাজার ৮১২টি। এর মধ্যে শিল্প ট্রলার ২৩৭টি এবং যান্ত্রিক ও আর্টিজানাল নৌযান ২৮ হাজার ৫৭৫টি। তবে সার্বিক জরিপ ও তথ্য হালনাগাদের পর এ সংখ্যায় কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। ছোট-বড় এবং নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার নৌযানের এই বিশাল বহরকে নিয়মিত ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে, এই নজরদারি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা আগেও করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালক শওকত কবির চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় তিন বছর ধরে নৌযানগুলোর ওপর সমীক্ষা চালানো হয়। সেই সমীক্ষায় শুরুতে প্রায় ২৯ হাজার নৌযানের তথ্য মিললেও পরবর্তীতে তা হালনাগাদ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, একই প্রকল্পের আওতায় ছোট নৌযানগুলোতে প্রায় ১০ হাজার ট্র্যাকিং ডিভাইস দেওয়া হয়েছিল, যার মাধ্যমে নৌযানের অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হতো। পাশাপাশি পাঁচটি বড় শিল্প ট্রলারে ‘ভেসেল মনিটরিং ডিভাইস’ বসিয়ে পাইলটিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওই ডিজিটাল তদারকি কার্যক্রমও আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শওকত কবির চৌধুরী বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এখন সমুদ্রে থাকা নৌযানগুলোকে ওই ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে না। আগের প্রকল্পের আওতায় স্যাটেলাইট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যে কার্যক্রম চালানো হয়েছিল, অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় সেটিও স্থবির হয়ে পড়েছে।

তবে, নৌযানের শারীরিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি সার্ভিলেন্স চেকপোস্টের মাধ্যমে নৌযানের যাতায়াত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা কর্মকর্তা ও পরিদর্শকরা দায়িত্বে থাকেন। পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী সমুদ্রে টহলের সময় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড মাছ ধরার নৌযানগুলো পরিদর্শন করে থাকে।

সমুদ্রে ঝড়, যান্ত্রিক ত্রুটি বা দুর্ঘটনার কবলে পড়া নৌযানগুলোর দ্রুত সন্ধান পাওয়া প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকলেও প্রতিটি নৌযান ডিজিটাল নজরদারিতে থাকবে। বিপদগ্রস্ত নৌযান থেকে জরুরি সংকেত পাঠালে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো সহজ হবে এবং জেলেদের জীবন ও নৌযানের সুরক্ষা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে
এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সমুদ্রে নৌযানের ডিজিটাল নজরদারি বাড়াতে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়ে শওকত কবির চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড মাছ ধরার নৌযানের জন্য এআইএস ডিভাইস চালুর একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রতিটি নৌযানের জন্য একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয় রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি অনেকটা সড়কের যানবাহনের নম্বরপ্লেটের মতো কাজ করবে, যার মাধ্যমে সমুদ্রে থাকা প্রতিটি নৌযানকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যাবে। নৌযানে থাকা এআইএস ডিভাইস থেকে সেটির নাম ও পরিচয়, তাৎক্ষণিক অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিকের তথ্য পাওয়া যাবে। এসব তথ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি পৌঁছে যাবে কেন্দ্রীয় ডেটা সিস্টেমে।

কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় এসব তথ্য জমা হলে একপলকেই দেখে নেওয়া সম্ভব হবে কোনো নৌযান ঠিক কোথায় অবস্থান করছে, কোন দিকে যাচ্ছে এবং এর চলাচলের ধরন কেমন। কোনো নৌযানের গতিপথে অস্বাভাবিকতা বা অনিশ্চয়তা দেখা দিলে সেটিকে আলাদাভাবে নজরদারিতে আনার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নৌযানের এই তথ্য দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরিতে কাজে লাগানো সম্ভব। ভবিষ্যতে এসব তথ্য বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এছাড়া, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নৌযান থেকে জরুরি সংকেত বা ‘এসওএস’ পাঠানোর সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো নৌযান গভীর সমুদ্রে দুর্ঘটনা বা বিপদে পড়লে সেখান থেকে সংকেত পাঠানোমাত্রই তা কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারে পৌঁছে যাবে। এতে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট স্থানে উদ্ধার অভিযান চালাতে পারবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে তথ্যের ব্যবহার কেবল নিরাপত্তা বা ট্র্যাকিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি মৎস্যসম্পদ উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ, বঙ্গোপসাগরের বিপুল মৎস্যসম্পদের একটি বড় অংশ এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের বা পেলাজিক মৎস্যসম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব রয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের সামুদ্রিক উৎস থেকে মোট ৬ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যেখানে দেশের সর্বমোট মাছের উৎপাদন ছিল ৫০ দশমিক ১৮ লাখ মেট্রিক টন। তবে, সামুদ্রিক মাছের উৎপাদনে বছরভেদে ওঠানামা দেখা যায়। যেমন— ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৬ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮১ লাখ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৬ লাখ মেট্রিক টনে। পরবর্তী সময়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৬ দশমিক ৭৯ লাখ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৬ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে নেমে আসে।

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের সঙ্গে সমুদ্রের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সামুদ্রিক উৎস থেকে ২ দশমিক ৮১ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরিত হয়েছে, আর অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে এসেছে ২ দশমিক ৪৮ লাখ টন। সবমিলিয়ে ওই অর্থবছর ইলিশের মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪টি নতুন লো আর্থ অরবিট স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে একটি কনস্টেলেশন তৈরির পরিকল্পনা করছে বিএসসিএল। এই প্রযুক্তি কেবল নিরাপত্তা নয়, সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ডেটাভান্ডার তৈরিতেও ভূমিকা রাখবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করে ২০২৮ সাল নাগাদ এই স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে
ফলে সমুদ্রে কোন নৌযান কখন যাচ্ছে, কোথায় মাছ ধরছে এবং কখন উপকূলে ফিরছে— এসব তথ্য নিয়মিত পাওয়া গেলে মাছ আহরণের ধরন ও পরিধি নিয়ে একটি সমৃদ্ধ ডেটাভান্ডার তৈরি হবে। এই তথ্য অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজাতি সংরক্ষণ এবং টেকসই নীতি নির্ধারণে ব্যাপকভাবে সহায়তা করবে।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এআইএসের কাজ মাছের অবস্থান চিহ্নিত করা নয়; এর মূল কাজ নৌযানের পরিচয় ও গতিবিধি নজরদারিতে রাখা। সমুদ্রে কোথায় মাছের উপস্থিতি বেশি, তা জানতে প্রয়োজন হবে ভিন্ন প্রযুক্তি। পানির তাপমাত্রা, রঙ, ক্লোরোফিলের মাত্রা, প্ল্যাঙ্কটনের উপস্থিতি ও সমুদ্রস্রোতের তথ্য স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে জানা যায়। আবার মাছের ঝাঁক শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয় সোনার ও ইকো-সাউন্ডার-এর মতো ডিভাইস।

সহজ কথায়, এআইএস প্রযুক্তি জানাবে ‘নৌযানটি এখন কোথায় আছে’, আর সমুদ্রবিজ্ঞানভিত্তিক সেন্সরগুলো জানাবে ‘সমুদ্রের কোথায় মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি’। এই দুই ধরনের তথ্যের সমন্বিত বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে তথ্যভিত্তিক ও আধুনিক মৎস্য ব্যবস্থাপনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

প্রস্তাবিত মেরিটাইম এআইএস ব্যবস্থায় ৪টি লো আর্থ অরবিট বা লিও স্যাটেলাইট ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে অবস্থানকারী এসব স্যাটেলাইট বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় নৌযানগুলোর এআইএস সংকেত গ্রহণ করবে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ডেটা সেন্টারে পাঠিয়ে দেবে। একটি স্যাটেলাইটের কাভারেজ শেষ হওয়ার পর অন্য স্যাটেলাইটের কাভারেজ শুরু হওয়ার মাধ্যমে সমুদ্রে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হবে।

তবে, একটি স্যাটেলাইট নির্দিষ্ট জলসীমার ওপর কতক্ষণ অবস্থান করবে, কত সময় পর পুনরায় একই এলাকায় ফিরে আসবে এবং তথ্য আদান-প্রদান কতটা নিরবচ্ছিন্ন হবে— তা নির্ভর করবে স্যাটেলাইটের চূড়ান্ত কক্ষপথ, কার্যক্ষমতা এবং পুরো ব্যবস্থার কারিগরি নকশার ওপর।

বর্তমানে মহাকাশে থাকা বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১) এই কাজে ব্যবহার করা যাবে কি না— এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঢাকা পোস্ট-কে জানান, বিএস-১ মূলত সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য নির্দিষ্ট। সমুদ্রে নৌযানের পরিচয় ও গতিবিধি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকি করতে প্রয়োজন সম্পূর্ণ আলাদা মেরিটাইম এআইএস অবকাঠামো। আর সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই চারটি এলইও স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে একটি নতুন ‘স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় স্যাটেলাইটভিত্তিক নৌযান ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে প্রযুক্তি ও অর্থায়ন— উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেজন্য নৌযানে এআইএস ডিভাইস স্থাপন, স্যাটেলাইট ও গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি, ডেটা সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নৌযান চালক ও জেলেদের প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এমন অবস্থায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও টেকসই করতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে প্রযুক্তি, স্যাটেলাইটের সংখ্যা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, ব্যয় ও রাজস্ব কাঠামো যাচাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। নিজস্ব স্যাটেলাইট তৈরি পর্যন্ত অপেক্ষা না করে প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি স্যাটেলাইট সেবা ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে পাইলট প্রকল্প চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে নৌযান থেকে তথ্য সংগ্রহ, গ্রাউন্ড স্টেশনে তা গ্রহণ, কেন্দ্রীয় ডেটা সিস্টেমে সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ইমাদুর রহমান ঢাকা পোস্ট-কে বলেন, ‘সমুদ্রে চলাচলকারী কোনো নৌযান যেন নজরদারির বাইরে না থাকে, সে লক্ষ্যেই এই মহাপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। নৌযানের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও গতিপথ সুনির্দিষ্টভাবে জানার পাশাপাশি কোনো নৌযান বিপদে পড়লে দ্রুত তার অবস্থান শনাক্ত করে উদ্ধারকাজ চালানোই এর প্রধান উদ্দেশ্য।’

তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এটি শুধু স্যাটেলাইট তৈরি বা সাময়িক কোনো উদ্যোগ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণের ভিত্তিতে পুরো ব্যবস্থাটি বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য নৌযানের ডিভাইস, গ্রাউন্ড স্টেশন, ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, মৎস্য অধিদপ্তর, শিপিং ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য ব্যবহারের সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

ড. ইমাদুর রহমান আরও যুক্ত করেন, ‘নৌযানের অবস্থান ও গতিবিধির তথ্য কেবল নিরাপত্তা ও নজরদারিতেই নয়, মৎস্যসম্পদ উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে। কোন এলাকায় কতগুলো নৌযান বিচরণ করছে কিংবা কোথায় মাছ ধরার তৎপরতা বেশি— এসব ডেটা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’

সার্বিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই, পাইলট প্রকল্প পরিচালনা, প্রযুক্তি নির্বাচন ও নিজস্ব স্যাটেলাইট নির্মাণের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ সাল নাগাদ বঙ্গোপসাগরে বড় পরিসরে এই স্যাটেলাইটভিত্তিক নৌযান ট্র্যাকিং সেবা চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ঢাকা পোস্ট




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD