সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন




সংবিধানে আসছে মৌলিক পরিবর্তন

আবারও গণভোটের চিন্তা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:০৯ am
Vote Ballot Election Vote_Ballot_Election CEC election commission cec ec vote election Electronic Voting Machines evm ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ইভিএম নির্বাচন কমিশন ইসি সিইসি সিইসি ইসি ইভিএম ভোট নির্বাচন জনপ্রতিনিধি ভোটার ভোটগ্রহণ সিইসি রিটার্নিং অফিসার vote ভোট
file pic

মৌলিক কাঠামোসহ সংবিধানের বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া হিসাবে আবারও গণভোট আয়োজনের চিন্তা করা হচ্ছে। রোববার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে দেশের প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের এমন তথ্যই জানানো হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, ডিসেম্বরে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ওই সংশোধনী বিল আকারে আনা হবে। সংসদে তা পাশ হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোটের আয়োজন করা হবে। সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গণভোট হবে।

ওই বৈঠকে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধান হিসাবে না থাকা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বেশকিছু সংশোধনীর সুপারিশ করেছেন তারা। সিনিয়র সাংবাদিকদের কেউ কেউ ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

সংবিধান সংশোধন কার্যক্রমের অংশ হিসাবে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে প্রথমে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বৈঠক করল বিশেষ কমিটি। কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমাদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মো. আলী, বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, কালবেলা সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, সাবেক গণমাধ্যম কমিশনের প্রধান কামাল হোসেন প্রমুখ। প্রায় ৩ ঘণ্টা চলে এ বৈঠক।

বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ ব্রিফিংয়ে গণভোট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিষয় বলা ছিল। সেটা আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে উঠিয়ে দেয়। অভ্যুত্থানের পর উচ্চ আদালত ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করতে আদেশ দিয়েছেন। এটা সংবিধানে আসবে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদসহ কিছু জায়গায় যদি সংসদ কোনো পরিবর্তন আনে তাহলে তা গণভোটে দিতে হবে। সংসদে বিল পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সই করার আগে সেটা গণভোটে দিতে হবে, এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।’ তিনি বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ আরও দুটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এগুলো ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনতে হলে গণভোট দিতে হবে সাংবিধানিকভাবে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংবিধানের পুরো সংশোধনীর ওপর গণভোটের প্রয়োজন হবে না। সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ হওয়ার পর যে অনুচ্ছেদগুলোতে পরিবর্তন এলে গণভোটের প্রয়োজন হয়, সে অনুচ্ছেদগুলোতে পরিবর্তন আনলে তখন গণভোট করতে হবে। এবার সে ধরনের অনুচ্ছেদগুলোতে, যেমন-প্রস্তাবনায় পরিবর্তন আসবে। তাই এটা গণভোটে যাওয়ার কথা।’ কমিটি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করতে চায় জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রিপোর্টের ভিত্তিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি বিল আনবে। আশা করি, বছরের প্রথম অধিবেশন জানুয়ারি সেশনেই বিলটি (সংবিধান সংশোধন) আসতে পারে।’

সংবিধান সংশোধনে জুলাই সনদ; নাকি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার গুরুত্ব পাবে-এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এখানে প্রায়োরিটি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ। তবে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী যেসব বিষয়ে আমরা ম্যান্ডেট পেয়েছি, সেগুলোও ধারণ করব। মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস-এটা সংবিধানের প্রস্তাবনায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসাবে ৮ অনুচ্ছেদে ধারণ করেছিলেন। এগুলো আমাদের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি। আজকের বিরোধী দলও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে এ বিষয়ে একমত ছিল। কোনো কারণে সর্বসম্মতভাবে না আসায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কিন্তু আমাদের প্রতিশ্রুতি আছে, বিরোধী দলও একমত।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ আমরা যেভাবে স্বাক্ষর করেছি, সেভাবেই সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করব। এর বাইরেও কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো ঐকমত্যের আলোচনায় আসেনি বা বাদ পড়েছে। সেগুলোও আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে চাই। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আরও অনেক প্রস্তাব রয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। সেগুলোও আমরা বিবেচনায় নেব। পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বক্তব্য, মতামত ও সেন্টিমেন্ট আমরা ধারণ করতে চাই। যেসব বিষয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, সেগুলো এখানে বিবেচনা করা হবে। আর যেসব বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে করা সম্ভব, সেগুলো সেভাবেই বিবেচনা করা হবে।’

বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সম্পাদকদের মধ্যে অনেকেই প্রস্তাব দিয়েছেন, বিরোধী দলের সদস্যদের এই কমিটিতে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো উচিত। তাদের (বিরোধী দলের) সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবগুলো প্রণয়ন করলে ভালো হতো। আমরা এ বিষয়ে একমত। তাদের আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি এবং এখনো জানাচ্ছি যে, তারা যখনই এই কমিটিতে যোগ দেবেন, আমরা তাদের স্বাগত জানাব। সংসদ চলাকালীনও আমরা বারবার বলেছি, আপনারা আসুন, কমিটিতে অংশগ্রহণ করুন। আপনাদের বক্তব্যগুলো নিয়ে আলোচনা হবে এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে যেগুলো গ্রহণযোগ্য, সেগুলো গ্রহণ করব। তারা আলোচনায় অংশ নিলে ভালো হতো। তাহলে তাদের দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অনেক বিষয় আমরা বিবেচনায় নিতে ও অন্তর্ভুক্ত করতে পারতাম।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সুতরাং এটা সত্য যে, অনেকেই বলেছেন বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে আমরা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারব না; আমরা শুধু বারবার আহ্বান জানাতে পারি এবং আশা করতে পারি যে তারা এই কমিটিতে অংশগ্রহণ করবেন।’

বৈঠকে অংশ নিয়ে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির প্রস্তাব দেন। তিনি বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে সংবিধান সংশোধনের পরামর্শ দেন। এ ছাড়া সংসদের উচ্চকক্ষের প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আপনাদের কমিটিতে পাঁচজন (বিরোধী দল) আসেননি। তাদের আনার জন্য আরও চেষ্টা করুন, যাতে সবার অংশগ্রহণে অর্থবহ আলোচনা হয় এবং চব্বিশের জুলাইয়ের পরিবর্তনের পর সব দল ও মতের মতামতের ভিত্তিতে কাজটি সম্পন্ন করা যায়। অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর তা যেন বাস্তবে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হয়। রাষ্ট্রপতি যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না হন সেই বিধান রাখার পাশাপাশি বিচার বিভাগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে রাখা যায় কিনা-এ ধরনের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে।’

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমাদের দেশে গণতন্ত্র গভীরভাবে শিকড় না গড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাষ্ট্রের শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব। আমাদের সংবিধান মূলত শাসন বিভাগ-কেন্দ্রিক, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ই প্রায় সব ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার যে ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে, যা বিএনপির রাজনৈতিক ইশতেহারেও অন্তর্ভুক্ত-তা বাস্তবায়ন করা উচিত। একই সঙ্গে আইন বিভাগ হিসেবে জাতীয় সংসদের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। কেবল শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই আমরা একটি শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে বিরোধী দলকে প্রায়শই পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হয় না। আমাদের এই সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে-বিশেষ করে সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে বিরোধী দলকে পর্যাপ্ত সুযোগ ও কর্তৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে। একই সঙ্গে, বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।’ কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা প্রশ্ন করেন, জুলাই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নোট অব ডিসেন্টসহ সংবিধান সংশোধনের কাজ হচ্ছে। তাহলে আবার গণভোটের প্রয়োজন আছে কি না। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই গণভোট হবে।’ নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন শুধু নির্বাচিত সদস্য বা এমপিদের দিয়ে করা সম্ভব নয়; এ ক্ষেত্রে জনগণের বৃহত্তর অংশের মতামত নিশ্চিত করতে গণভোটের প্রয়োজন।’

(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD