স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় আর দেড় মাসের মতো বাকি। ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটার কথা থাকলেও প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার আবেদন করেছে সরকার। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি-সিডিপি প্রস্তাবটির পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান জানালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো বাকি। এর মধ্যেই এলডিসি উত্তরণে সরকার ২০২৬-২০২৯ মেয়াদের জাতীয় রোডম্যাপ চূড়ান্ত করেছে। পাঁচটি রূপান্তরমূলক স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো এই পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য রূপান্তর, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো ও সুশাসনে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও মার্কেট অ্যাকসেস’বিষয়ক নথিতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। কমিটির সভাপতি সংসদ-সদস্য মো. খালেদ হোসেন মাহবুবের সভাপতিত্বে এতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নথিতে বলা হয়, ২৪ নভেম্বর এলডিসির তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটার কথা রয়েছে। মসৃণ উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) আলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয় করে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনাসহ এসটিএস পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করেছে। কাঠামোটি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। গত বার্ষিক প্রতিবেদনের পর সরকার ‘মসৃণ, টেকসই ও অপরিবর্তনীয় এলডিসি উত্তরণের জাতীয় রোডম্যাপ (২০২৬-২৯)’ গ্রহণ করে। বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রস্তুতির (স্তম্ভ ২) নেতৃত্ব দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর আওতায় রয়েছে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) ও সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) নিয়ে আলোচনা, জাতীয় মান কাঠামোর (এনকিউআই) উন্নয়ন, ভ্যালু চেইনের উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত মেধা স্বত্ব অধিকার (ট্রিপস) চুক্তির আওতায় পাওয়া ক্রান্তিকালীন নমনীয়তা সুরক্ষা। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘জাতীয় এলডিসি পরিবীক্ষণ ও সমন্বয় কমিটি’ এবং ইআরডি সচিবের সভাপতিত্বে ‘এলডিসি উত্তরণবিষয়ক সরকারি-বেসরকারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে।
ইআরডির অধীন ‘সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি)’ পরিচালনাগত পরিবীক্ষণ ইউনিট হিসাবে কাজ করছে। প্রকল্পটি ‘ত্রৈমাসিক উত্তরণ প্রস্তুতি ড্যাশবোর্ড’ প্রকাশ করছে।
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর জন্য সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যে অনুরোধ জানিয়েছে, তা জাতিসংঘের সিডিপির বিবেচনাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে সংকটকালীন সাড়াদান প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে এবং জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) অনুরোধটি সাধারণ পরিষদে পাঠিয়েছে। রোডম্যাপে বাড়তি এ সময়কে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়া হিসাবে নয়, বরং সংস্কার সম্পন্ন করার সুযোগ হিসাবে দেখছে সরকার। এ কারণে এ বছরের বর্ধিত পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা (ইএমএম) প্রতিবেদন আগের প্রতিবেদনগুলোর তুলনায় আরও তথ্যনির্ভর ও বিশ্লেষণধর্মী হওয়া প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি বলেন, বাড়তি সময় চাওয়ার উদ্দেশ্য উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করা। সরকারের পরিকল্পনায় জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ও রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, উত্তরণ পেছালেও প্রয়োজনীয় সংস্কার থেকে সরে আসা যাবে না। রপ্তানি বহুমুখীকরণের পাশাপাশি সেবা রপ্তানি, তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ বাড়তি সময়কে সাময়িক স্বস্তি হিসাবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির সময় হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।
৩৮ দেশের সঙ্গে সমীক্ষা ও বাণিজ্যসংক্রান্ত সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি : এলডিসি উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা কমে যাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি (আরটিএ) নীতি ২০২২-এর আলোকে এফটিএ, পিটিএ ও সেপা নিয়ে সক্রিয় আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য এফটিএ অংশীদার দেশগুলোর বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩৮টি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেছে। ইতিবাচক ফলাফলের ভিত্তিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি একটি বাণিজ্য আলোচক দল গড়ে তোলা হচ্ছে।
এর বাইরে বাণিজ্যমন্ত্রী কানাডা, মরিশাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ আলোচনা শুরুর অনুমোদন দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব দেশে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এছাড়া জাতীয় রোডম্যাপের কৌশলগত লক্ষ্য হলো-বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নমনীয় উৎস বিধিসহ (রুলস অব অরিজিন) অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত চুক্তিগুলো করা। সংসদীয় কমিটির ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সর্বশেষ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশ ও জোটভিত্তিক অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, তুরস্ক ও কানাডা উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) বাজার সুবিধা আরও তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অস্ট্রেলিয়া তাদের পার্লামেন্টে সংশ্লিষ্ট বিধান বাতিল না হওয়া পর্যন্ত এলডিসির জন্য নির্ধারিত বর্তমান ডিএফকিউএফ সুবিধা অব্যাহত রাখবে।
এ বিষয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম. মাসরুর রিয়াজের গবেষণায়ও উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা এবং কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া শুধু বিদ্যমান বাজার সুবিধার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, এলডিসি উত্তরণে বাড়তি তিন বছরের অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগের সুফল পেতে পাঁচ স্তম্ভের রোডম্যাপকে বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা, নির্দিষ্ট সময়সীমা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ব্যবসায়ী দাবির মুখে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার সিডিপির কাছে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করে। এতে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় চাওয়া হয়েছে। সিডিপি আবেদনটি বিবেচনা করে বাড়তি সময় দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সংস্কার অগ্রগতি নিশ্চিত করার শর্তও রয়েছে। গত ২১ জুলাই ইকোসক বিষয়টি সাধারণ পরিষদে বিবেচনার জন্য সুপারিশ করে। তবে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে ২০২৯ সালকে এখনই নিশ্চিত উত্তরণের তারিখ হিসাবে দেখার সুযোগ নেই।
(যুগান্তর)