রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০৭ অপরাহ্ন




বিনিয়োগে স্থবিরতা: অতিরিক্ত তারল্যের চাপে ১০ ব্যাংক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬ ১:১৪ pm
Mobile Banking মোবাইল ব্যাংকিং Bangladesh Bank Explore banking services credit cards loans financial business Guarantee Finance Investment Commerce INTER BANK ‎বাংলাদেশ ব্যাংক ‎বাণিজ্যিক ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং ‎এজেন্ট ব্যাংকিং
file pic

বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর কিছু ব্যাংকে আমানত বাড়ছে। তবে সেই তুলনায় ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারছে না। ফলে ক্রমেই বাড়ছে অতিরিক্ত তারল্য। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না থাকায় প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে টাকা খাটাচ্ছে ব্যাংকগুলো। সহজ পন্থা হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড, কলমানি ও অন্য ব্যাংকে আমানত হিসেবে টাকা রাখছে। কিন্তু এর পরও উদ্বৃত থাকছে বড় অঙ্ক। যা ব্যাংকগুলোকে বিপাকে ফেলছে। ফলে এসব ব্যাংক নতুন করে আমানত নিরুৎসাহিত করছে। মাত্রাতিরিক্ত কমিয়ে দিয়েছে সুদহার।

অতিমাত্রায় তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের। ব্যাংকটির উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ৮৮ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক, ৩২ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য ২৯ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। চতুর্থ অবস্থানে অগ্রণী ব্যাংকের ২৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। আর শীর্ষ পাঁচে থাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের অতিরিক্ত তারল্য ২৮ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা।

এছাড়া সিটি ব্যাংকের ২৩ হাজার ৯৮৪ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ২৩ হাজার ৫১৮ কোটি, যমুনা ব্যাংকের ২২ হাজার ৪৬৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১৭ হাজার ৫৪৪ কোটি এবং প্রাইম ব্যাংকের ১৬ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে।

জানা গেছে, গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এই ১০ ব্যাংকের কাছেই ছিল ৩ লাখ ১২ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সরকার পতনের পর সেই সীমা তুলে দিয়ে সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়। এতে দুর্বল ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করলেও ভালো ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদে আমানত পাচ্ছে। কারণ, আমানতকারীরা বেশি সুদের চেয়ে প্রয়োজনে টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে ভালো ব্যাংকগুলোয় আমানত বাড়লেও সেই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারছে না তারা। মূলত গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘উদ্বৃত্ত তারল্যের সবটাই ট্রেজারি বিল বা বন্ড, অন্য ব্যাংকের চালু করা বন্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রি-ফাইন্যান্স প্যাকেজ এবং অন্য ভালো ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটে প্লেসমেন্টের মতো খাতে লাভজনকভাবে ও নিরাপদে বিনিয়োগ করা আছে। যেহেতু এসব বিনিয়োগ লাভজনক, তাই আমানতকারীদের সুদ পরিশোধে কোনো বাড়তি চাপ নেই। থাকার প্রশ্নও আসে না। আর এগুলো সব ভালো ব্যাংক। প্রত্যেকটির ব্যালান্সশিট বেশ ভালোভাবে ভারসাম্যপূর্ণ।’

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য ঋণ হিসেবে বিতরণ না হলেও অলস পড়ে নেই। এসব অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে। অতীতে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণের কারণে বর্তমানে খেলাপি ঋণের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী বছর থেকে ব্যাংকগুলো নতুন করে বিনিয়োগে ফিরবে।

তবে তারল্য নিয়ে সব ব্যাংকের পরিস্থিতি এক না। অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় তারল্য রাখতে পারছে না। তথ্যানুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য ঘাটতি ৪ হাজার ২২৭ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এক হাজার ৮৮ কোটি, ইউনিয়ন ৭৬৭ কোটি, পদ্মা ৬০০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৬২৫ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ৫২৫ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ৩১৯ কোটি, গ্লোবাল ৩৮৭ কোটি এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৩৮ কোটি টাকার তারল্য ঘাটতিতে রয়েছে।

আমানতের সুদহার কমাচ্ছে ব্যাংকগুলো

অতিরিক্ত তারল্যের চাপে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাংকগুলো গত দুই মাসে দুই দফায় আমানতের সুদহার কমিয়েছে। একাধিক ব্যাংক তাদের মেয়াদি আমানতের সুদহার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে। গত জুলাইয়ে এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার যেখানে ৯ থেকে ১০.১৫ শতাংশ ছিল, আগস্টে তা কমে সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে আসে। সম্প্রতি তা আরো কমে সাড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে পূবালী ব্যাংকের এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। এর চেয়ে বেশি মেয়াদের আমানতে সুদহার ছিল ৮.৪৪ শতাংশ। আগস্টে তা কমে যথাক্রমে ৮.২১ শতাংশ ও ৮.৪১ শতাংশ হয়।

ব্র্যাক ব্যাংকের এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার জুলাইয়ে ছিল ৮.৩৫ শতাংশ এবং এর চেয়ে বেশি মেয়াদের আমানতে ছিল ৯.২৬ শতাংশ। পরে তা কমে যথাক্রমে ৮.১৭ শতাংশ ও ৯.১৮ শতাংশ হয়। ব্যাংক এশিয়ার এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার জুলাইয়ে ছিল ৯.৪২ শতাংশ, আগস্টে তা কমে ৮.৯৮ শতাংশ হয়। যমুনা ব্যাংকের এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার জুলাইয়ে ৯.৬৩ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে ৯.৫৯ শতাংশ হয়। এর চেয়ে বেশি মেয়াদের আমানতের সুদহার ৯.২৬ শতাংশ থেকে কমে ৯.২০ শতাংশ হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলেন, ‘আমানত সংগ্রহ এখন অনেক ব্যাংকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমানতের সুদ ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে ব্যাংকের তেমন লাভ থাকছে না। কারণ, বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র পাওয়া যাচ্ছে না। আবার আমানতকারীরা টাকা রাখতে এলে তাদের ফিরিয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমাতে শুরু করেছে।’

টানা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে স্থবিরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ঋণ নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য ও ভালো গ্রাহক না পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ জমে থাকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.৭৫ শতাংশে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে তারল্য নিয়ে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে রয়েছে। ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে উচ্চ সুদ পরিশোধ করলেও সেই অর্থ বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র পাচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হচ্ছে না। এতে একদিকে ব্যাংকের আমানত ব্যবস্থাপনার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত তারল্য থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। আমার দেশ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD