শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৪ অপরাহ্ন




প্রাথমিকের শিক্ষক বদলিতেও লটারি করার চিন্তা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ৫:২৮ pm
Teacher Recruitment প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
file pic

তদবির ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারির কথা ভাবছে সরকার। একই স্থানে বদলির জন্য একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রয়োজনে লটারির আশ্রয় নিতে পারবেন জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। তবে বর্তমান বদলি নীতিমালায় এ ধরনের লটারির বিধান নেই। ফলে সরকারের এ চিন্তা বাস্তবায়িত হলে বদলি প্রক্রিয়ায় নতুন পদ্ধতি যুক্ত করতে হবে। এ জন্য এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বদলি নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

লটারির মাধ্যমে শিক্ষক বদলির উদ্যোগের কথা স্বীকার করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। গত মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়’ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের দেওয়া হয়েছে। একই স্থানে একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রয়োজনে লটারি করা হবে। বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বদলিতে তদবিরের প্রবণতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আত্মীয়স্বজনের পরিচয় ব্যবহার করে বদলির জন্য তদবির করা হয়। তবে সরকার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বদলির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। ঢাকায় বদলির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনার সুযোগ থাকলেও তা নির্ধারিত নিয়মের বাইরে গিয়ে করা হবে না।

শিক্ষক সংকটের মধ্যেই বদলি নিয়ে নতুন ভাবনা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশে প্রায় ৫০ হাজার সহকারী শিক্ষক দরকার। এ ছাড়া প্রধান শিক্ষকের পদেও প্রায় ৩৮ হাজার জনবল প্রয়োজন। তবে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) জানিয়েছে, একসঙ্গে এত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।

শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলেও জানান মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী এ সংকট নিরসনে বিকল্প উপায় খুঁজে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। আগের সরকারের নেওয়া ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে পিএসসির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষক সংকটের এ পরিস্থিতিতে বদলির সিদ্ধান্তে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক সংখ্যা বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। কোনো বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকলে সেখান থেকে শিক্ষক সরিয়ে নেওয়ায় পাঠদান ব্যাহত হতে পারে। তাই বদলির আগে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শূন্য পদ, শিক্ষক সংকট ও পাঠদান কার্যক্রমের বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

চার স্তরের কমিটিতে বদলি নিষ্পত্তি

জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রমে চলতি বছরই পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। আবেদন যাচাই-বাছাই এবং নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে বদলির আবেদন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ২১ জুন নতুন করে বদলি ও পদায়ন পদ্ধতি চালু করে। পরে ১৬ জুলাই সংশোধিত নীতিমালায় কমিটির গঠন ও বদলির শর্তে পরিবর্তন আনা হয়। এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল ‘সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা, ২০২৬’।

বর্তমানে উপজেলা বা থানা পর্যায়ে বদলি কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট ইউএনও। জেলা পর্যায়ের কমিটিতে জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় পর্যায়ের কমিটির নেতৃত্বে থাকেন বিভাগীয় কমিশনার। স্থানীয় পর্যায়ের কমিটিতে সভাপতি মনোনীত দুজন বিদ্যোৎসাহী বা শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধানও রয়েছে।

একই উপজেলা, জেলা বা বিভাগের মধ্যে বদলির আবেদন সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের কমিটিতে নিষ্পত্তি হয়। আর আন্তঃবিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ের বদলির ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করে জাতীয় কমিটি। কমিটিগুলোকে প্রতি মাসে অন্তত একবার সভা করে আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে।

চাকরির মেয়াদ দুই বছর, পুনর্বদলিতে তিন বছরের শর্ত

সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো সহকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকার চাকরির মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ না হলে সাধারণভাবে বদলির জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই। একবার বদলি হওয়ার পর পরের তিন বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ফের বদলির আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।

অর্থাৎ, শুধু পছন্দের কর্মস্থলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেই বদলি পাওয়া যাবে না। নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শূন্য পদ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে হবে।

একই বিদ্যালয় থেকে একাধিক শিক্ষক বদলির আবেদন করলে জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে জ্যেষ্ঠতা থাকলেই বদলি নিশ্চিত হবে না; অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে।

শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলিতে রয়েছে বিধিনিষেধ। বদলির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শূন্য পদ থাকা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। যে বিদ্যালয়ে অনুমোদিত পদ শূন্য নেই, সেখানে সাধারণভাবে শিক্ষক বদলির সুযোগ নেই।

এ ছাড়া পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত– এমন বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এর বেশি, এমন বিদ্যালয় থেকেও বদলির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষক সরিয়ে নিয়ে সংকট আরও বাড়তে না দেওয়া।

সংশোধিত নীতিমালায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নারী শিক্ষকদের স্থায়ী ঠিকানা বা স্বামীর কর্মস্থল কিংবা স্থায়ী ঠিকানার কাছাকাছি বিদ্যালয়ে বদলির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে এ অগ্রাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলির অনুমোদন নিশ্চিত করে না। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে শূন্য পদ, শিক্ষক সংকট এবং অন্যান্য প্রযোজ্য শর্ত যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজন বিবেচনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের স্বার্থও সংরক্ষণ করতে হবে।

লটারির চিন্তা বাস্তবায়নে নীতিমালা সংশোধন প্রয়োজন

প্রাথমিক শিক্ষকরা বলছেন, বর্তমান বদলি ব্যবস্থায় চাকরির মেয়াদ, শূন্য পদ, শিক্ষক সংকট, জ্যেষ্ঠতা এবং নির্ধারিত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের বিধান রয়েছে। কিন্তু একই স্থানে একাধিক প্রার্থী থাকলে লটারির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো স্পষ্ট বিধান নেই।

অন্যদিকে, নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের পদায়নে লটারির ব্যবস্থা থাকলেও কর্মরত শিক্ষকদের বদলিতে একই পদ্ধতি প্রয়োগের বিষয়টি আলাদা। ফলে বদলিতে লটারি চালু করতে হলে কোন পরিস্থিতিতে তা ব্যবহার করা হবে, কারা এতে অংশ নিতে পারবেন এবং নীতিমালার অন্যান্য শর্তের সঙ্গে এর সমন্বয় কীভাবে হবে; এসব বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

লটারি চালু হলে একই স্থানে বদলির জন্য একাধিক যোগ্য প্রার্থীর মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তদবিরের সুযোগ কমতে পারে। তবে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট, শূন্য পদ, চাকরির মেয়াদ ও জ্যেষ্ঠতার মতো শর্ত কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নির্ধারণ করাও জরুরি।

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, অনলাইনে একাধিক আবেদন হলে লটারি করা যেতে পারে। তবে সমস্যাগ্রস্ত শিক্ষকের জন্য তার বিকল্প রাখা উচিত। তিনি বলেন, বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাই শুধু লটারির ঘোষণা নয়; নির্ধারিত নীতিমালার ধারাবাহিক প্রয়োগ, আবেদন নিষ্পত্তির যুক্তি প্রকাশ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD