পাঁচ দিনের সফরে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অ্যান্তইনেত এম সায়েহ শনিবার দুপুরে ঢাকায় এসেছেন। তিনি ১৮ই জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় থাকবেন। এ সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করা হবে।
আইএমএফ ঢাকা সফর সম্পর্কে বলছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি সহনশীল রাখতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করে আইএমএফ। এ জন্য ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে ঢাকা সফর করছেন মনসিও সায়েহ।
সূত্র জানায়, রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর পর আগামী ১৬ই জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। ১৮ই জানুয়ারি পদ্মা সেতু ভ্রমণ করবেন এবং ওই দিনই তিনি ঢাকা ছাড়বেন। আইএমএফ বলেছে, বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন স্তরে আলোচনা করে সায়েহ আইএমএফের সদর দপ্তরে প্রতিবেদন দেবেন। ওই প্রতিবেদনটি আইএমএফের পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করা হবে। আইএমএফ মতে, বাণিজ্য ঘাটতি, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকুচিত হওয়ার কারণে সংকটের সীমানায় রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এসব কারণে ব্যয়ের দিক থেকে ভোক্তাদের পরিবর্তন এসেছে অর্থাৎ কম খরচ করতে পারছেন ভোক্তারা। অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
আইএমএফ থেকে বাংলাদেশ যে ঋণ পাচ্ছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। আইএমএফ মনে করছে, রাষ্ট্রীয় তহবিল বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্ধিত মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ঋণটি ঢাকার জন্য বহুলাংশে একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও।
আইএমএফের মতে, ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ স্বল্প মেয়াদে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিকে নিম্নমুখী করবে। একই সঙ্গে তাদের পরামর্শ অনুসরণ করে বাংলাদেশকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেবে। যেমন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মধ্য মেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করে মূল্যস্ফীতি কমানো এবং পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি।
এর আগে বাংলাদেশ গত জুলাইয়ে ঋণ চাইলে সাড়ে তিন বছর ধরে সাত কিস্তিতে ৪৫০ কোটি ডলার অর্থ দেবে বলে আগেই জানিয়েছে আইএমএফ। আগামী মাসেই প্রথম কিস্তি পাওয়ার কথা।
সূত্র জানায়, আইএমএফের সঙ্গে ঋণের বিষয়ে সরকারের একটি নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। এখন বাকি রয়েছে শুধু আনুষ্ঠানিকতা। কিছু শর্ত ইতিমধ্যে সরকার বাস্তবায়ন করেছে। আইএমএফের আরও একটি শর্তের বাস্তবায়ন করতে বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের দাম গড়ে ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ আইএমএফের ডিএমডি ঢাকা আসার একদিন আগে তড়িঘড়ি করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে নির্বাহী আদেশে। যদিও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে শুনানি চলছিল। আইএমএফের আরও কিছু শর্ত বাস্তবায়নের জন্য কিছু সময় চাইবে সরকার।
এদিকে আইএমএফের শর্তের সঙ্গে মিল রেখে কাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে। এতে ঋণের সুদের হার সীমিত পরিসরে বাড়ানোর আভাস দেয়া হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হার নিয়স্ত্রণে মুদ্রানীতির ব্যবহার করবে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদের হারও বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সরকার আশা করছে, ফেব্রুয়ারিতে আইএমএফের ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে। প্রথম কিস্তি বাবদ ৪৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার মিলবে। এরপর প্রতি ছয় মাস পরপর একটি করে কিস্তি দেয়া হবে। সাত কিস্তিতে দেয়া এ ঋণের শেষ কিস্তি পাওয়া যাবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। ঋণের গড় সুদ হার ২.২ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আইএমএফ ঋণ দিতে রাজি। এ জন্য অর্থনীতির সংস্কারে কিছু শর্ত পালন করতে হবে। আইএমএফের শর্ত পূরণ যাতে ঠিকঠাক হয়, তার জন্য বিশেষ তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বয়ে ২২ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এদিকে রাজস্ব বাড়ানোসহ বৈদেশিক মুদ্রা বাজার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আর্থিক খাত পরিচালনায় নীতিমালা এবং তদারকিতে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সহায়তার আগ্রহ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে চিঠি লিখেছে আইএমএফ কর্তৃপক্ষ।
আইএমএফ প্রম্ন তুলেছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি ঠিক নেই। এটি সংশোধনের কথা বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে এটি ঠিক করার কাজে হাত দিয়েছে। সরকারের বাজেট ঘাটতি একটি নির্দিষ্ট হারের বেশি যেতে পারবে না- এমন শর্তও দিয়েছে। যখনই কিস্তি দেয়ার সময় হবে, আইএমএফ এগুলো মিলিয়ে দেখবে। আরও রয়েছে জ্বালানির দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পদ্ধতি কার্যকর, নতুন আয়কর আইন কার্যকর, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা, আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ বিষয়ে আলাদা কোম্পানি গঠন করা, আর্থিক খাতে তদারকি বাড়ানো, করছাড়ের ওপর বিশদ নিরীক্ষা, বাজেটের নির্দিষ্ট অংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য রাখা। অন্যান্য শর্তের মধ্যে রয়েছে ভর্তুকি কমানো, বাজেট থেকে সঞ্চয়পত্রকে আলাদা করা, ব্যাংক ঋণের সুদহারে ৯ শতাংশের সীমা তুলে দেয়া, নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আইএমএফ যে সংস্কার বা শর্তের উল্লেখ করেছে, সেগুলো সরকারের অনেক আগেই বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির তদারকিতে সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি মনে করেন। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে কমছে। এ অবস্থায় বহুজাতিক সংস্থা থেকে সহযোগিতা পাওয়া গেলে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।