সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন




দ্বৈত নাগরিকত্ব আইনের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩৮ pm
Online Visa application e-Visa eVisa e PASSPORT e‑PASSPORT Machine Readable Passport Application Immigration মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ইমিগ্রেশন ই-পাসপোর্ট ই পাসপোর্ট অনলাইন ভিসা আবেদন ইমিগ্রেশন চেক অ্যাপ্লিকেশন
file pic

বাংলাদেশের কোনো নাগরিক অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার পর সরকারের নীতিনির্ধারণী পদ, জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রী-উপদেষ্টা হতে পারবেন কিনা—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে, রয়েছে আইনি ধোঁয়াশা। সরকারের পদে থাকা ব্যক্তিদের দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং সংবিধান ও নির্বাচন সংক্রান্ত বিধিমালার সাংঘর্ষিক ব্যবস্থার কারণে এই আইনি সংকট দিন দিন জটিল হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনে ভিন্নতা রয়েছে। কোনো কোনো দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করার সময় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। কোথাও দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রাখা যায়। আবার কোনো কোনো দেশের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব বজায় রাখতে গেলে আলাদা অনুমোদন নিতে হয়।

আইনের অস্পষ্টতা ও সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার বা নির্বাচন করার যোগ্যতা হারাবেন।

তবে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকত্বের ধারায় কিছু নতুন ব্যাখ্যা যুক্ত হওয়ায় এক ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়। সেখানে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য হলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। এর ফলে আইনি প্রশ্ন ওঠে যে—যারা দ্বৈত নাগরিক, তারা যেহেতু একই সঙ্গে বাংলাদেশেরও নাগরিক, তবে কি তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বা মন্ত্রী হওয়ার অধিকার রাখবেন? এই ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে অনেক দ্বৈত নাগরিক তাদের প্রমাণপত্র দাখিল করে আসছেন।

ইতিহাস ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও সরকারি পদ নিয়ে বিতর্ক বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন আমলে ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে আইন ও নিয়ম শিথিল করার নজির দেখা গেছে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে যখন জেনেভায় বাংলাদেশ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন সরকারি পদের জন্য নিজের বা স্পাউসের (স্বামী অথবা স্ত্রী) বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার বিষয়ে আইনি বাধা ছিল। তাকে নিয়োগ দিতে তৎকালীন সিভিল সার্ভিস আইন ও বিধিমালার সংশ্লিষ্ট অংশে পরিবর্তন আনা হয়, কারণ দেবপ্রিয়র স্ত্রী রাশিয়ার নাগরিক ছিলেন।

বিচারপতিদের নাগরিকত্ব বিতর্ক বাংলাদেশসংবাদ

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে আপিল বিভাগের বিচারপতি ইমান আলী এবং বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। সংবিধান রক্ষা ও বিচার বিভাগীয় পদে থেকে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রাখা নৈতিক ও আইনি দিক থেকে কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। হাসিনার সরকারের সময়ে বহু এমপিপ্রার্থী বিদেশী নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে দ্বৈত নাগরিকরা নির্বাচন করতে পারবেন কিনাÑএ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে একটি ধারা যুক্ত করে বলা হয়, বাংলাদেশের নাগরিক হলে তারা প্রার্থী হতে পারবেন। এর ফলে ব্যাখাটি কিছুটা জটিল হয়ে পড়ে। কারণ দ্বৈত নাগরিক যারা, তারা তো বাংলাদেশেরও নাগরিক।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে সর্বদাই দ্বৈত নাগরিকত্বের ইস্যুটি সবচেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়ায়। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর বেশকিছু প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সংক্রান্ত অভিযোগ রিটার্নিং অফিসার ও আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছায়।

রিটার্নিং অফিসারদের পর্যালোচনায় বৈষম্য ও অস্পষ্টতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বেশ জোরেশোরে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি সামনে আসে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সময় কিছু রিটার্নিং অফিসার বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন জমা দেওয়ার নথি দেখেই মনোনয়নপত্র বৈধ বলে গ্রহণ করেন।

অন্যদিকে, অনেক রিটার্নিং অফিসার কেবল আবেদনের প্রাপ্তি স্বীকার নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমোদনপত্র না পাওয়ায় মনোনয়ন বাতিল করেন।

সংখ্যায় বিএনপির এমপি প্রার্থী সংখ্যা বেশি হলেও জামায়াত, এনসিপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের এরকম বেশকিছু প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয় এবং কারো কারো গৃহীত হয়। এ অবস্থায় বিষয়টি আদালতেও গড়ায়। শেষ পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দল এ নিয়ে এক প্রকার অলিখিত সমঝোতায় এলে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি আর এগোয়নি।

সর্বশেষ গত শুক্রবার মন্ত্রিসভায় রদবদলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন। পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্ট বহন করছিলেন। পরে তিনি ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্ট নিয়ে বহু দেশ সফর করেছেন। উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর যোগ্যতা, অযোগ্যতা ও দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য থাকায় তার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—যে আইন বা সংবিধানের অনুচ্ছেদ বাস্তবে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না বা রাজনৈতিক সমঝোতার নামে এড়িয়ে যাওয়া হয়, সেই আইন কাগজে-কলমে রেখে লাভ কী? দ্বৈত নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা এবং তা সর্বক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD