শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ১২:০১ পূর্বাহ্ন




হঠাৎ মোদি কেন মুসলিমদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বললেন

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৩ ৮:১৩ pm
Shri Narendra Modi Narendra Damodardas Modi Prime Minister of India ভারত ভারতের ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি মোদী नरेंद्र दामोदर दास मोदी নরেন্দ্র মোদি
file pic

প্রায় এক যুগ ক্ষমতায় থাকার পরও ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অবস্থা নির্বাচনী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে খুব একটা খারাপ হয়েছে বলে এখনো মনে করা হচ্ছে না। মোটামুটিভাবে অধিকাংশ বিশ্লেষক ও রাজনীতি পর্যবেক্ষক মনে করছেন, আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনে একাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বিজেপি। এ রকম একটা অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী গত মঙ্গলবার বিজেপির অভ্যন্তরীণ এক বৈঠকে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা তাঁর দলের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে বা তাঁর নিজের রাজনীতির সঙ্গে মেলে না। বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকের দ্বিতীয় এবং শেষ দিনে গত মঙ্গলবার নরেন্দ্র মোদি এসব কথা বলেছেন।

বিজেপির ওই বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের উদ্ধৃত করে ভারতের সরকারি সংবাদ সংস্থা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য জানিয়েছে। সংবাদ সংস্থা এএনআই জানাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী বিজেপির কর্মীদের বলেছেন, ‘পশমন্দা বা দলিত এবং পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে।’

একই সঙ্গে মোদি বলেছেন, ইসমাইলি শিয়াদের অন্যতম বোহরা মুসলমান, মুসলমান সম্প্রদায়ের পেশাদার ও শিক্ষিত মুসলমানদের সঙ্গেও দলের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তাঁদের অচ্ছুত করে রাখলে চলবে না। শুধু নির্বাচনের কথা না ভেবে তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে বলে নরেন্দ্র মোদিকে উদ্ধৃত করে এ কথা জানিয়েছে এএনআই।

মহারাষ্ট্র রাজ্যে বিজেপির উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাড়নবীশ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, সংখ্যালঘু সমাজের বিরুদ্ধে যাঁরা বিতর্কিত মন্তব্য করছেন, তাঁদের সতর্ক করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

২০০২ সালে গুজরাটে দাঙ্গার সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। দাঙ্গার জন্য তিনি বা তাঁর দল ক্ষমা চায়নি। বরং বিজেপির নেতারা বারবারই বলেছেন, সেই দাঙ্গার সঙ্গে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মোদির কোনো সম্পর্ক নেই। এরপর গুজরাটে অতীতের নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে মুসলমানবিরোধী প্রচার করেছেন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৩ সালে গুজরাট দাঙ্গার প্রসঙ্গে মোদিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, কেউ যদি গাড়ির পেছনের আসনে বসে থাকে এবং গাড়ির নিচে দু-একটা কুকুর চাপা পড়ে, তবে আরোহী কী করতে পারে। খুব প্রত্যক্ষভাবেই তিনি এখানে মুসলমান সমাজের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন।

গুজরাটে মোদি যখন নিজের ভাষায় বক্তৃতা দিয়েছেন, তখনো প্রবলভাবে মুসলমান সম্প্রদায়কে আক্রমণ করেছেন। এবারও গুজরাট নির্বাচনের সময়ে তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০০২ সালের দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেছেন, একটি সম্প্রদায়কে সেই সময় উচিত শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান ভারতে প্রায় রোজই কোথাও না কোথাও মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপরে আক্রমণ হচ্ছে। যেসব রাজ্যে বিজেপির সরকার রয়েছে, সেখানেই এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। এই সবকিছু নিয়েই চুপ থেকেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি।

কিন্তু মঙ্গলবার কর্মসমিতির বৈঠকে দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদী বললেন, মুসলমান সম্প্রদায়ের পিছিয়ে পড়া অংশের সঙ্গে বিজেপির নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উন্নয়ন করতে হবে। গত জুলাই মাসে জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকেও তিনি পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের সার্বিক উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন।

আপাতদৃষ্টে এ পরিবর্তনের কারণ কী, তার নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন একটা ব্যাখ্যা হলো, মুসলমানদের মধ্যে ভারতে পিছিয়ে পড়া অংশের হার ৮৫ শতাংশ। প্রধানত তারা রয়েছে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে। সেখানে মুসলমান সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের ভোট আগামী বছরের নির্বাচনে পাওয়ার লক্ষ্যে তাদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী।

দ্বিতীয়ত, সার্বিকভাবে দিনের পর দিন মুসলমান সমাজকে বিচ্ছিন্ন রাখার ফলে সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, তা হয়তো ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে। এ ধরনের চিন্তা থেকেও হয়তো প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের কাছে টানার কথা বলছেন। হিন্দুত্ববাদী তাত্ত্বিকদের একটা অংশের ধারণা, মুসলমানদের সমাজের মূল স্রোতের একেবারে বাইরে রাখলে সমাজে যে অর্থনৈতিক অসাম্য তৈরি হবে, তা অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

তবে ঠিক কী কারণে প্রধানমন্ত্রী ধারাবাহিকভাবে মুসলমান সমাজকে কাছে টানার কথা বলছেন, সেটা এখনো খুব স্পষ্ট নয়। বরং যেটা অনেক বেশি স্পষ্ট, সেটা হলো হিন্দুত্ববাদী নেতা-নেত্রীদের দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর সাবধান বাণী।

বৈঠকে উপস্থিত বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির এক নেতা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দলের নেতা-কর্মীদের সাবধান করে দিয়েছেন। ওই নেতাকে উদ্ধৃত করে এমনটাই জানিয়েছে ভারতের সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

ওই নেতা বলেছেন, ‘যাঁরা সংবাদের শিরোনামে আসার জন্য বিবৃতি দেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের পরিষ্কার জানিয়েছেন যে এ কাজ করা যাবে না। এমন কোনো অযাচিত মন্তব্যের প্রয়োজন নেই, যা আমাদের কঠোর পরিশ্রমকে ম্লান করে দেবে।’

ভারতে একাধিক নেতা-নেত্রী বর্তমানে হিন্দি ছবির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছেন। কোনো কারণ ছাড়া তাঁরা হিন্দি ছবির নির্দিষ্ট অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আক্রমণ করছেন, বলছেন নির্দিষ্ট ছবি বিশেষ দৃশ্য বাদ না দিয়ে দেখানো যাবে না। এই নেতা-নেত্রীরাই ঠিক করে দিচ্ছেন কোন ছবির কোন গান, দৃশ্য বা সংলাপ বাদ দিতে হবে।

হিন্দুত্ববাদী নেতা-নেত্রীদের এই ধারাবাহিক আন্দোলন নিয়ে ভারতে এবং ভারতের বাইরে প্রচারমাধ্যমে যথেষ্ট লেখালেখি হচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছে অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন এবং শাহরুখ খানের সাম্প্রতিক ছবি ‘পাঠান’।
মহারাষ্ট্র রাজ্যে বিজেপির উপমুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাড়নবীশ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, দলীয় কর্মীদের শৃঙ্খলাপরায়ণ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংখ্যালঘু সমাজের বিরুদ্ধে যাঁরা বিতর্কিত মন্তব্য করছেন, তাঁদেরও প্রধানমন্ত্রী মৃদু ভর্ৎসনা করেছেন বলেও জানিয়েছেন ফাড়নবীশ।

মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র ও হিন্দুত্ববাদী নেত্রী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর ‘পাঠান’ ছবিটির বিরুদ্ধে সম্প্রতি কড়া মন্তব্য করেছিলেন। মনে করা হচ্ছে, তাঁদের এবং তাঁদের মতো নেতা-নেত্রীকে সাবধান করতেই বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নরোত্তম মিশ্র অবশ্য বুধবার বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের কথা মাথায় রেখে করা হয়নি। তবে মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন মিশ্র। এ মুহূর্তে মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে মুসলমানদের ওপরে হামলা এবং কড়া বিবৃতির বন্যা বইয়ে দিয়েছেন হিন্দুত্ববাদী নেতা-নেত্রীরা। তাঁদের মধ্যে নরোত্তম মিশ্রই সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্র। তিনি প্রায় রোজই মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো মন্তব্য করছেন। একইভাবে পূর্ব ভারতে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা নিয়মিত আক্রমণ করছেন মুসলমান সম্প্রদায়কে। নরেন্দ্র মোদির বার্তা তাঁদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD