সীমানা পরিবর্তনে বদলে গেছে পিরোজপুর জেলার নির্বাচনি হালচাল। বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মধ্যে শুধু এই জেলায় নির্বাচনি এলাকা অদল-বদল করেছে নির্বাচন কমিশন। এতে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিপাকে পড়েছে মহাজোটের শরিক জেপিও (মঞ্জু)। বিএনপি অবশ্য এই নিয়ে খুব একটা ভাবছে না। কেননা এখানে তাদের জয়ের হিসাব একেবারেই হাতেগোনা। জোট-মহাজোট নিয়েও এই জেলায় রয়েছে দ্বন্দ্ব। ৩ নির্বাচনি আসনের জেলা পিরোজপুরে ২টি আসনই শরিক দলগুলোকে দিয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপিও এখানে দুটি আসনে ছেড়ে দেয় জোটের শরিকদের। এবার অবশ্য পুরো জেলাতেই ভিন্ন পরিস্থিতি। জোট-মহাজোটের শরিকদের আসন দেওয়ার বিরুদ্ধে নেমেছেন স্থানীয় নেতারা। আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলে একই অবস্থা। এই নিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতিও দিচ্ছেন তারা। সব মিলিয়ে নির্বাচন নিয়ে চলছে জটিল সমীকরণ।
(প্রতিবেদনটি প্রস্তুতে সহযোগিতা করেছেন-এসএম পারভেজ-পিরোজপুর, শফিকুল ইসলাম মিলন-ভান্ডারিয়া, আব্দুস সালাম আজাদী-মঠবাড়িয়া, লাহেল মাহমুদ-নাজিরপুর, রতন দাস-কাউখালী, একেএম কাওসার তালুকদার-স্বরূপকাঠী ও এইচএম ফারুক হোসাইন-ইন্দুরকানী)।
পিরোজপুর-১ (ইন্দুরকানী-সদর-নাজিরপুর) : সীমানা বদলে সদর আসনে আসা ইন্দুরকানী উপজেলা ছিল পিরোজপুর-২ এ। প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উপজেলা এটি। এক সময় ঐতিহাসিকভাবে এটি ছিল পিরোজপুর সদর আসনে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সরিয়ে দেওয়া হয় পিরোজপুর-২-এ। এর পেছনে তৎকালীন এক মন্ত্রী ও এমপির হাত ছিল বলে মনে করেন অনেকে। নিজের এলাকা হওয়ায় এখানে সাঈদীর ছিল শক্তিশালী ভোটব্যাংক। যেটি ছিল সদর আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জন্য বিপজ্জনক। আবার পিরোজপুর-২-এ থাকা স্বরূপকাঠী উপজেলা অস্বস্তিকর ছিল সাবেক ওই মন্ত্রীর জন্য। কারণ তখন পিরোজপুর-২-এ থাকা ভান্ডারিয়া আর কাউখালীর সম্মিলিত ভোটের চেয়েও বেশি ভোট ছিল স্বরূপকাঠীতে। স্বরূপকাঠী থেকে প্রার্থী দিয়ে একবার জয়ও পায় আওয়ামী লীগ। পরপর দুটি নির্বাচন নতুন সীমানায় হওয়ার পর আবার পুরোনো সীমানায় ফিরে গেছে আসন। এতে সাধারণ মানুষ খুশি হলেও শঙ্কা তৈরি হয়েছে সাবেক ওই মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিটও হয়েছিল। কিন্তু ভোটার বিন্যাস ও এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে তা নাকচ করে দেন আদালত। বর্তমানে এই আসনের এমপি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ. ম. রেজাউল করিম। তার সঙ্গে মনোনয়নের দৌড়ে আছেন সাবেক এমপি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একেএমএ আউয়াল। তার ভাই পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র হাবিবুর রহমান মালেকও চাইছেন মনোনয়ন। রাজনৈতিকভাবে পরিচিত আউয়াল-মালেক পরিবারের সদস্য আউয়ালের ছোট ভাই মজিবর রহমান খালেক বর্তমানে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান। খালেকের স্ত্রী পালন করছেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কানাই লাল বিশ্বাসও এখানে চাইছেন মনোনয়ন। ভোটের মাঠে না থাকলেও এখানে আলোচনায় আছেন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। একইসঙ্গে জোটের শরিক কোনো দলকে যাতে মনোনয়ন দেওয়া না হয়, সেই দাবিও রয়েছে দলটির স্থানীয় নেতাদের। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, আগে এই আসনটি জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দিয়েছিল বিএনপি। তিনি জেলে থাকাবস্থায় মনোনয়ন দেওয়া হয় তার ছেলে শামীম সাঈদীকে। যদিও এবার নির্বাচনে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই আমাদের। বর্তমান সরকার পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা না দিলে ভোটে যাবে না বিএনপি। শেষ পর্যন্ত যদি সেই দাবি পূরণ হয় তবে সবার আগে আমাদের দাবি থাকবে ধানের শীষের প্রার্থী দেওয়া। এছাড়া জামায়াতের সঙ্গে বর্তমানে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা আশাবাদী ধানের শীষ নিয়েই এখানে ভোটযুদ্ধে নামব। আলমগীর হোসেন ছাড়াও এখানে ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন, সাবেক এমপি গাজী নূরুজ্জামান বাবুল, জেলা বিএনপির সদস্য এলিজা জামান ও সাবেক সহসভাপতি নজরুল ইসলাম খান। লাঙ্গলের (এরশাদ) মনোনয়ন চাইছেন জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান, সদস্য সচিব বশির আহম্মেদ হাওলাদার ও সদস্য অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম। জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দার, জামায়াতের শামিম সাঈদী এবং ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মাসুম বিল্লাহও প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-স্বরূপকাঠী) : জাতীয় সংসদের এই একটি আসনে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল জেপির (মঞ্জু)। জীবনে কোনো নির্বাচনে পরাজিত না হওয়া সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এই আসনের এমপি। এখানেও রয়েছে মহাজোটের আসন ভাগাভাগির জটিলতা। সর্বশেষ নির্বাচনগুলোতে মহাজোটের শরিক দল হিসাবে এখানে ছাড় পেয়েছে জেপি (মঞ্জু)। তবে এবার আসন ছাড়তে নারাজ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এর পেছনে নানা যুক্তিও রয়েছে তাদের। ভান্ডারিয়া পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফাইজুর রশিদ খসরু বলেন, এটা ঠিক যে একটা সময় এখানে এমপি মঞ্জুর শক্তিশালী অবস্থান ছিল। কিন্তু সেসব এখন অতীত। ৩ উপজেলায় মাত্র ২ জন জনপ্রতিনিধি রয়েছেন তার। বাকি সবাই আওয়ামী লীগের। ভান্ডারিয়া পৌর নির্বাচনে নৌকার চেয়ে অর্ধেকেরও কম ভোট পেয়ে হেরেছেন জেপির (মঞ্জু) প্রার্থী। দলে দলে আওয়ামী লীগে আসছেন জেপির নেতাকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কেন নিজেরা খেটে অন্য দলের লোককে এমপি বানাব? এই আসনে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে মাঠে আছেন পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ। নৌকার প্রার্থী চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টানা প্রায় ১ যুগ স্বরূপকাঠী উপজেলা এই নির্বাচনি এলাকায় ছিল না। ফলে সেখানে কর্মী-সমর্থক সংগঠন বলতে কিছুই নেই জেপির (মঞ্জু)। কাউখালীতে ৩ হাজারের বেশি নেতাকর্মী নিয়ে দল ত্যাগ করেছেন জেপির উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সাঈদ মনু মিয়া। ভান্ডারিয়া পৌর নির্বাচনে গো-হারা হেরেছেন তাদের মেয়র প্রার্থী। এরপরও মহাজোট থেকে মনোনয়ন নেওয়ার চেষ্টা মানে হলে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে ভোটের খেয়া পার হওয়া। সেজন্যেই জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের দাবি, এ আসনে নৌকার প্রার্থী দেওয়া হোক। তিনি (মঞ্জু) যদি অপরাজিত নেতাই হন তাহলে মহাজোটের কাছে আসন চাইছেন কেন? নৌকার সঙ্গে লড়াই করে জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিন। আওয়ামী লীগ নেতার এই দাবি প্রসঙ্গে জেপির (মঞ্জু) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ভান্ডারিয়া উপজেলার কার্যকরী সভাপতি মাহিবুল হোসেন মাহিম বলেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর প্রতিদ্বন্দ্বী শুধু তিনি নিজেই। জীবনে কোনো নির্বাচনে হারেননি বলেই তাকে এই আসনটি ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। ভোটের লড়াইয়ে নামলেই বোঝা যাবে কার জনপ্রিয়তা কত। এখানে আওয়ামী লীগের আরও যারা মনোনয়ন চাইছেন তারা হলেন সাবেক এমপি অধ্যক্ষ শাহ আলম, সাবেক ছাত্র নেতা ইসাহাক আলী খান পান্না এবং মুইদুল ইসলাম মুহিত। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে আসনটি জোটের শরিক লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মেস্তাফিজুর রহমান ইরানকে দিয়েছিল বিএনপি। এবার তাকেই দেওয়া হলে কী করবেন জানতে চাইলে দলের ভান্ডারিয়া উপজেলা আহ্বায়ক আহম্মেদ সোহেল সুমন মঞ্জুর বলেন, তখনকার আর এখনকার পরিস্থিতি এক নয়। বিএনপি এখানে এখন অনেক শক্তিশালী। দাবি অনুযায়ী নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দল নির্বাচনে গেলে আমরা দলের কাছে বিএনপির প্রার্থী চাইব। সুমন মঞ্জুর ছাড়াও এখানে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন-জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শিল্পপতি ফখরুল আলম, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আহসান ও ওয়াহিদুজ্জামান এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনজীবি নেতা নূরুল ইমান বাবুল। এছাড়া জাতীয় পার্টির (এরশাদ) খলিলুর রহমান, শহীদুল ইসলাম সোহেল ও নজরুল ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও শহিদুল ইসলাম কবির এখানে প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) : আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দলকে আসন দেওয়া সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে এ আসনেও। বর্তমান এমপি রুস্তুম আলী ফরাজী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির (এরশাদ) অনুসারী। সর্বশেষ নির্বাচনে আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। যদিও দলীয় কর্মসূচি পালন কিংবা জাতীয় পার্টিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে কখনোই খুব একটা সক্রিয় নন এই বর্ষীয়ান নেতা। রাজনৈতিক জীবনে এ পর্যন্ত ৪ বার এমপি হয়েছেন ফরাজী। এর মধ্যে দুবার বিএনপি, একবার স্বতন্ত্র এবং বর্তমানে জাতীয় পার্টির সমর্থনে এমপি তিনি। মাঝে একবার আওয়ামী লীগে যাওয়ার চেষ্টার গুঞ্জনও উঠেছিল এই এমপির বিরুদ্ধে। মহাজোটে থাকলে এবারও তিনি শরিক দল জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হবেন এমন আলোচনা রয়েছে স্থানীয় মহলে। তবে তাকে এখানে মনোনয়ন না দেওয়ার দাবি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র রফিউদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস বলেন, এটি ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের আসন। এখানে এমপি ছিলেন জাতির পিতার হাতে গড়া বাকশালের মহিউদ্দিন আহম্মেদ। জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি, এখানে আবারও নৌকার প্রার্থী দেওয়া হোক। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এখানে ভোটের মাঠে সক্রিয় আছেন আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা। তারা হলেন পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক জেলা চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহারাজ, সাবেক পৌর মেয়র রফিউদ্দিন আহম্মেদ ফেরদৌস, সাবেক এমপি ডা. আনোয়ার হোসেন, বিএমএ নেতা ডা. নজরুল ইসলাম, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য তাজউদ্দিন আহম্মেদ এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমান। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় আছেন-উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রুহুল আমীন দুলাল, পৌর বিএনপি নেতা কেএম হুমায়ুন কবির, শামিম মৃধা ও মামুন আহম্মেদ। এছাড়া জাতীয় পার্টির (এরশাদ) মুকুল আহম্মেদ বাদশা, শরিফুল ইসলাম রবি ও নুরুজ্জামান লিটন এবং ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা সগির হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে।