ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে জোরালো তৎপরতা শুরু করার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হলে ব্যাংকের তহবিলের খরচ কমবে। তখন ঋণের সুদের হারও কিছুটা হলেও কমবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে আসন্ন গণভোটের বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ নির্দেশনা দিয়েছে।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এসব বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদেরকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে সভায় চার ডেপুটি গভর্নর ও সব বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ক্ষুদ্রঋণ ও ডিজিটাল ঋণ বিতরণে আরও সতর্কতা অবলম্বন, স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রসার বৃদ্ধি করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে বলা হয় আসন্ন গণভোট উপলক্ষ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্যে ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখায় দুটি করে ব্যানার টাঙানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকে যেসব গ্রাহক আসেন তকাদেরকেও কথার ছলে গণভোটে অংশগ্রহণের বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিষয়টি ব্যাংকগুলোকে জানিয়েছে। গণভোটের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে এনজিওগুলোর মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম চালানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোকেও এ ধরনের কর্মসূচিতে নানাভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৈঠকে বলা হয়, ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কমে ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আর একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাদ দিলে একই সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে। এর আগে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আরও কমানোর জন্য জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে ঋণের সুদের হার কিছুটা হলেও কমাতে হবে। খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হলে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনার খরচ কমে যাবে। তখন ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার কিছুটা হলেও কমাতে পারবে। ইতিমধ্যে সরকারি খাতের ট্রেজারি বিলের সুদের হার ২ শতাংশের মতো কমেছে। আগামীতে আরও কিছুটা কমতে পারে। কারণ সরকার এখন ঋণের জন্য ভিন্ন দুয়ার খুলেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ পড়বে না। এছাড়া ব্যাংকে তারল্যও বেড়েছে।
সভায় মাইক্রো লোন ও ডিজিটাল ন্যানো লোন কার্যক্রম নতুন করে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরুর নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ঋণ যেন কোনোভাবেই খারাপ গ্রাহকের হাতে না পড়ে এবং ভবিষ্যতে খেলাপির ঝুঁকি তৈরি না হয়, সে জন্য শুরু থেকেই সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সভায় স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রতিটি ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপককে প্রতি বছর কমপক্ষে দুটি করে স্কুল পরিদর্শন বাধ্যতামূলকভাবে করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাদেরকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে ব্যাংকে আমানতের ঘাটতি কমে যাবে। কারণ শিক্ষার্থীরা সঞ্চয়ী হবে।
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঊর্ধ্বমুখী ধারায় রয়েছে। সামনে রমজান ও কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক গতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে, বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্যে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ সময় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের বাড়তি ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সভায় বলা হয়, কেউ যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে চায়, সে ক্ষেত্রে দ্রুত সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর কাজ চলছে। একই সঙ্গে কেউ যদি দেশের বাইরে অফিস খুলতে চান, সেক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন দেওয়া হবে স্বল্প সময়ের মধ্যে। এ খাতে ব্যাংকগুলোকেও কাজের গতি দ্রুত করতে বলা হয়েছে।
সুদের হার প্রসঙ্গে সভায় জানানো হয়, মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না কমায় এ মুহূর্তে সুদের হার কমানোর সুযোগ নেই। তবে কীভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, সে বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে।
বৈঠক শেষে এবিবির চেয়ারম্যান মাসরুর আরিফিন বলেন, গণভোটে জনসচেতনতা বাড়াতে ব্যাংক শাখাগুলোতে ব্যানার টাঙানো হবে এবং স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা রয়েছে, বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং বিনিয়োগ ও অফিস খোলার অনুমোদন সহজ করা হবে। মূল্যস্ফীতি না কমায় এ মুহূর্তে সুদের হার কমানোর সুযোগ নেই, তবে বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।
(যুগান্তর)