চলতি এপ্রিল মাসের শুরু থেকে গরম বাড়ছে। বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরু থেকে বয়ে চলা মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ ঢাকাসহ অন্তত ২০ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। শহরে অনেকটা স্বস্তি থাকলেও গ্রামে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা বলা হলেও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মতে, লোডশেডিং চার হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মপরিকল্পনা এবং জ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে না। কারণ ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি দামও বেড়েছে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বাড়ছে। রয়েছে অর্থ সংকট। ফলে সামনের দিনগুলোতে জ্বালানির স্বল্পতায় বিদ্যুতের চাহিদা এবং উৎপাদনের মধ্যে ফারাক বৃদ্ধি পাবে। ফলে লোডশেডিও বাড়বে। গ্রামের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও লোডশেডিং বাড়াতে হবে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে বলেন, বৈষম্য দূর করতে শহরেও লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি সংসদকে জানান, বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা কাগজে-কলমে অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেটির গরমিল রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই, এই উত্তপ্ত গরমে অনেককেই বিদ্যুৎ সমস্যায় নাজেহাল হতে হয়েছে। এই সমস্যা এক দিনের নয়। এই পুঞ্জীভূত সমস্যার দায় কোনোভাবেই বর্তমান নির্বাচিত সরকার কিংবা কারও নয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনার দায় সবাইকে নিতে হচ্ছে।’
যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও কয়লা আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে মে মাসের শুরুতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় পাওয়ার গ্রিড অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট, লোডশেডিং হয়েছে দুই হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে সন্ধ্যার পর।
পিজিসিবির এক কর্মকর্তা জানান, উৎপাদন মূলত বিতরণ কোম্পানিগুলোর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ঠিক করে। পিডিবির চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
দেশে বর্তমানে ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র আটটি। এ ছাড়া উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টি কেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র দুটি।
এবারের গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পিডিবি প্রক্ষেপণ করেছে। বর্তমানে গড়ে চাহিদা ১৫ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এই চাহিদার বিপরীতে গড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল, কয়লা, এলএনজি আমদানিতে কিছুটা সংকট তৈরি হলেও বাংলাদেশে আর্থিক সংকট বিদ্যুৎ ঘাটতির বড় কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করছে সরকার। তবে সে ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে আমদানির চেয়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। শুধু এলএনজি আমদানিতে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত চার হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ হয়েছে। এ অর্থবছরের বরাদ্দ ৪২ হাজার কোটি টাকায় ভর্তুকি মেটবে না। জুন পর্যন্ত আরও ১৯ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
পিডিবি গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা করেছে তাতে দেখা যায়, ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি ও সরবরাহ করতে হলে সরকারের যে পরিমাণ অর্থসংস্থান করতে হবে, সেখানে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হবে। ফলে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা ছোট করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল জ্বালানির কারণে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কম চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য কিছু গ্যাসভিত্তিক এবং সক্ষমতার পুরোটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাওয়া।
এ বিষয়ে গতকাল বিদ্যুৎ বিভাগের সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অনেক, কিন্তু গ্যাস ও জ্বালানি স্বল্পতার কারণে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাস ব্যবহার করে পাঁচ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে বুধবার। যদিও উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট।
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের দরকার। যদি ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা হয়, তাহলে সাত হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯২ কোটি ঘনফুট। আর অর্থ সাশ্রয় করতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল কম ব্যবহার করা হয়।
উম্মে রেহানা বলেন, শিল্পাঞ্চল বেড়েছে, গরম বেড়েছে। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদাটা অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট অনেক বেশি। তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ভারতে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ। তবে এটি ২৬ এপ্রিল উৎপাদনে ফিরতে পারে। এ ছাড়া বাঁশখালীতে এস আলমের এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিটে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। ২৮ এপ্রিল থেকে এর উৎপাদনও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে এক হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়তে পারে বলে তিনি জানান।
এই কর্মকর্তা বলেন, এখানে অনেক কারিগরি ইস্যু আছে। কারিগরি কারণে অনেক সময় অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এগুলো মেনে নিতে হবে।
এদিকে গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয় করার নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, যাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। ঢাকায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে।
২১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুই হাজার ৬৭ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। তবে এ ভর্তুকি টাকা শুধু বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এক খাতের বা কেন্দ্রের ভর্তুকি অন্য খাতে স্থানান্তর করা যাবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এমনিতেই আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিশাল ভর্তুকির বোঝা ঘাড়ে। সেখানে অর্থ মন্ত্রণালয় বরাদ্দকৃত অর্থ পায়রা, রামপাল ও পটুয়াখালী তিনটি বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না– এমন শর্ত দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না থাকায় দুই কেন্দ্রের ভর্তুকি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। কয়লাভিত্তিক পটুয়াখালীর (আরপিসিএল-নরিনকো) এক হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিআর-পাওয়ার জেন ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভর্তুকি চাওয়া হলেও তা অনুমোদন করেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। এসব শর্ত উৎপাদন ব্যবস্থায় সংকট তৈরি করবে।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটিতে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের চারটি কোল মিলের মধ্যে দুটি ভেঙে যাওয়ায় বুধবার রাত থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, পাথর মিশ্রিত কয়লা ব্যবহারের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বর্তমানে মেরামতকাজ চলছে এবং দুই-তিন দিনের মধ্যে উৎপাদন আবার শুরু হতে পারে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রে তিনটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিট ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে বন্ধ। আর ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার তৃতীয় ইউনিট গত বছরের নভেম্বর থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অচল। ফলে একমাত্র চালু থাকা প্রথম ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো কেন্দ্রটি এখন উৎপাদনহীন অবস্থায় রয়েছে। তৃতীয় ইউনিট আগামী ১৫ মের মধ্যে চালুর আশা করা হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। যশোরের অভয়নগরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে প্রায় ৩৭-৩৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ২৫-২৬ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা ৪৮-৪৯ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ৩১-৩৫ মেগাওয়াটে সীমাবদ্ধ। ফলে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
একই চিত্র মাগুরায়ও। সেখানে ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮-৯ মেগাওয়াট। ফলে প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন ঘাটতি কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সমকাল