আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বর্তমান মূল্যে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হিসাবে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৯১১ ডলার, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ২ হাজার ৮১২ ডলার। পার্থক্য তুলনামূলক কম হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব বড় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতির আকারের বিচারে ভারত এখনও অনেক এগিয়ে। ২০২৫ সালের হিসাবে ভারতের অর্থনীতির আকার প্রায় ৩ হাজার ৯১৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের ৪৫৮ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড়। তবে মাথাপিছু আয়ের সূচকে ছোট অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু এই প্রবণতাকে ‘বিস্ময়কর’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও কিছু ভারতীয় বিশ্লেষকের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এটি বাংলাদেশের প্রকৃত অগ্রগতি, নাকি কেবল বিনিময় হারভিত্তিক পরিসংখ্যানের প্রতিফলন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ মুদ্রার বিনিময় হার। ২০১৮ সালের পর কয়েক বছর ডলারের হিসাবে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তবে ২০২৫ সালে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে সেই অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৮৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সময়েও বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। পরবর্তীতে প্রায় দেড় দশক ভারত এগিয়ে থাকলেও ২০১৮ সালে আবারও বাংলাদেশ শীর্ষে উঠে আসে।
তবে আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ভারত পুনরায় এগিয়ে যেতে পারে এবং অন্তত ২০৩১ সাল পর্যন্ত সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ডলার মূল্যে মাথাপিছু জিডিপি একটি পরিবর্তনশীল সূচক, যা বিনিময় হারের ওঠানামার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কোনও দেশের মুদ্রার মান কমে গেলে উৎপাদন অপরিবর্তিত থাকলেও ডলারে তার মূল্য কমে যায়।
অপরদিকে ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি)-ভিত্তিক হিসাব ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। এই পদ্ধতিতে দেশীয় মুদ্রার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়। সেখানে ভারত এখনও স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতের পিপিপি-ভিত্তিক মাথাপিছু আয় ছিল ১১ হাজার ৭৮৯ ডলার, যা বাংলাদেশের ১০ হাজার ২৭১ ডলারের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ সাল নাগাদ এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। তখন ভারতের পিপিপি-ভিত্তিক মাথাপিছু আয় দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৪৮৫ ডলার, বিপরীতে বাংলাদেশের হতে পারে ১৪ হাজার ৮৫৭ ডলার।
সার্বিকভাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলারভিত্তিক মাথাপিছু আয়ের এই সাময়িক অগ্রগতি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও তা এককভাবে জনগণের জীবনমানের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। এজন্য পিপিপি, আয়বৈষম্য ও জীবনযাত্রার মানসহ অন্যান্য সূচক সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।