স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়ে ভোটার ও তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ ও উপায়) নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার চালানোর ওপর বিধিনিষেধ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কারও পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। তবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে। এসব বিধান যুক্ত করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে ইসি। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের ১২তম সভায় এসব প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়। এসব সংশোধনী ইসির নথিতে অনুমোদন করবে বলে মঙ্গলবারের সভায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনাররা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। ওই সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনে সংশোধনী আনার সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে এমপিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের পদে থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারা, দ্বৈত নাগরিক, ঋণ এবং বিল খেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী যুক্ত করা, পদে থেকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার বিধানসহ কয়েকটি সংশোধনী সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। ইসি জানিয়েছে, এসব সুপারিশ শিগগিরই সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে নির্বাচন ভবনে মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এ সভা চলে। সভায় চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির সিনিয়র সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। এতে নির্দিষ্ট এজেন্ডার বাইরে জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা নিয়ে আলোচনা হয়। নাগরিকরা ১৫ বছর পরপর এনআইডি নবায়ন করতে পারবেন বলে জানিয়েছে কমিশন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তর সিটি করপোরেশন, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং জেলা পরিষদের আইনগুলোতে কমিশনের বিবেচনায় যেসব জায়গায় কিছু কিছু স্ট্রিমলাইন করা দরকার বলে মনে হয়েছে, আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আইনের কিছু প্রস্তাবনা বা সুপারিশ করছি। চূড়ান্ত করার দায়িত্ব তো স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংসদের।
জানা গেছে, কমিশন সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন ও আচরণ বিধিমালার খসড়া উপস্থাপন করা হয়। আচরণ বিধিমালার সংশোধনীতে ভোটার ও তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে এসব নম্বর সংগ্রহ করা যাবে না। এজন্য ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালার বিধি ১৮ তে সংশোধনী আনা হচ্ছে। কেউ এ বিধি লঙ্ঘন করলে তার ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ এনেছিল বিএনপি। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়া আচরণ বিধিতে এসব নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করেন।
এছাড়া বিধি ১৮ তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে নির্বাচনি প্রচার করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে; যা আগে ছিল না। এতে বলা হয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত না করে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে মাঠ ব্যবহার করা যাবে। আর বিধি ২২-এর বড় ধরনের সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি/সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারবেন না। কমিশনের বিবেচনায় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নির্বাচন চলাকালে ওই এলাকায় অবস্থান করতে পারবেন না।’ এতে আরও বলা হয়েছে, ‘প্রার্থী ছাড়া কোনো স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেয়র বা প্রশাসক অথবা কোনো স্থানীয় সরকার পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাক্তি নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।’ অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাদের সমপদমর্যাদার কোনো ব্যক্তি, সংসদ-সদস্য, সিটি করপোরেশনের মেয়র বা মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বুঝানো হয়েছে।
আচরণ বিধিমালার ১৩ নম্বরে নির্বাচনি প্রচারে হেলিকপ্টার বা আকাশযান ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। বর্তমানে রাজনৈতিক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারেন। নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতে যাওয়ায় এখানে সংশোধনী আনা হচ্ছে।
আইনে সংশোধনী : সভায় সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের আইন সংশোধনে সুপারিশ চূড়ান্ত করে ইসি। যেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত, দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করবে ইসি। আখতার আহমেদ বলেন, এই আইনগুলোর ভেতরে আমাদের কমিশনের বিবেচনায় যেসব জায়গায় সংশোধন করা দরকার, আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। সব আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করার সুপারিশ করেছি। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, সব আইনে এটা (সশস্ত্র বাহিনী) যুক্ত করা উচিত।
ঋণখেলাপির বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে দুটো ক্ষেত্রের একটা হচ্ছে বন্ধকদাতা এবং জামিনদার। ব্যক্তিগতভাবে বন্ধকদাতা তিনি তো আছেনই। কিন্তু জামিনদারকে ঋণখেলাপি হিসাবে অযোগ্য করার একটা প্রস্তাবনায় আমরা নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছি। এর পাশাপাশি বিল খেলাপি; যেমন-বিদ্যুৎ বিল, ভূমিকর, ওয়াসাসহ এ ধরনের যেসব সেবা প্রদানকারী সংস্থায় যদি কোনো বিল খেলাপি থাকে সেটি অযোগ্য হিসাবে বিবেচিত হবে। সেটা ব্যক্তিগত হতে পারে বা প্রাতিষ্ঠানিকও হতে পারে। লাভজনক পদে থেকেও নির্বাচন করা যাবে না।
দ্বৈত নাগরিকদের বিষয়ে ইসির সচিব জানান, কমিশন মনে করে তাদেরও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সংবিধানে বাধা আছে। তিনি বলেন, আইন সংশোধনের বিষয়গুলো আমরা শিগগিরই স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব হিসাবে পাঠাব। তারা উপযুক্ত মনে করলে ব্যবস্থা নেবেন। এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আমরা আইন চূড়ান্ত করার এখতিয়ার রাখি না, আইনের কিছু প্রস্তাবনা বা সুপারিশ করছি। চূড়ান্ত করার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংসদের।
আইন সংশোধনের কাজ সরকারের হওয়া সত্ত্বেও এ দায়িত্ব ইসি কেন নিচ্ছে জানতে চাইলে-আখতার আহমেদ বলেন, সুপারিশ যে রাখতেই হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা মনে করেছি সুপারিশ করা যায়। সেজন্য সুপারিশ পাঠাব। রাখা বা না রাখা যার এখতিয়ার, তিনি করবেন। এতে সরকার চাপে পড়বে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, সরকার চাপে পড়বে কিনা সেই সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।
এনআইডি সেবা : কমিশন সভায় এনআইডি সংশোধনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ভোটার এলাকা স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে আখতার আহমেদ বলেন, ভোটার এলাকা স্থানান্তরে অনলাইনে আবেদন করা যাবে। স্থানান্তরের একটা সংশোধনী ফি দিতে হবে, যার পরিমাণ নতুন করে নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমানে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সিদের এনআইডির জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যাতে ১৮ বছর হলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকাভুক্ত হয়ে যান। আখতার আহমেদ বলেন, এ তথ্য সংগ্রহের পর্যায়টা কোন বয়স পর্যন্ত নামানো যায়, সেটা নিয়ে আরও কিছু পর্যালোচনার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া পাবলিক পরীক্ষার সনদের অর্থাৎ এসএসসি, জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষার জন্ম তারিখের ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে নাগরিকের বয়স সংশোধন করা যাবে বলেও জানান ইসি সচিব।
(যুগান্তর)