রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:০৭ অপরাহ্ন




নীতিমালা বাতিল

ওষুধ কোম্পানির আপত্তিতে ফিরলো পুরোনো নিয়ম

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬ ১:১৩ pm
ব্যবসা Model মডেল medical stores store dispensary drugstore ড্রাগস্টোর ডিসপেনসারি ফার্মেসি pharmacy Drug chemical Pharmaceutical medication diagnose cure treat Health Medicine ওষুধ ঔষধ রাসায়নিক চিকিৎসা
file pic

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতিমালা বাতিল করা হয়েছে। সরকারের এ পদক্ষেপের কারণে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি তিন দশক আগের নিয়মে ফিরেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, পুরোনো নিয়মে ফেরার কারণে সরকারি নজরদারি দুর্বল হলে ভোক্তাদের ব্যয় বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা আড়াই গুণ করে ২৯৭টির গেজেট প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১৯৯৪ সালের তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ। নতুন করে যুক্ত হয় আরও ১৮০টি। এর আগে গত ৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তালিকাটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই তালিকা বড় হওয়ার বিরোধিতা করে আসছিল বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি।

গত বছরের ১৩ আগস্ট বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিজ্ঞপ্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওষুধ খাতের নীতিকে ‘অস্বচ্ছ ও একপেশে’ আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণে গঠিত টাস্কফোর্স ও ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির (ডিসিসি) কারিগরি উপকমিটিতে ঔষধ শিল্প সমিতির প্রতিনিধি না রাখার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পরে গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে নীতিটি পর্যালোচনার জন্য জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করা হয়।

গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার গত ৮ জানুয়ারি এ দুটি নীতিমালা প্রস্তুত করে। তিন দশকের বেশি সময় পর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণে এটিই ছিল বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই ব্যক্তিকে বহন করতে হয়। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ওষুধ প্রস্তুতকারকদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তালিকাটি করেছিল।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সিইও মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধভাবে তালিকাটি প্রস্তুত করেছিল। তবে অনেকেই মনে করেন, এতে ওষুধের দাম বাড়বে। কিন্তু তাদের এই ধারণা সঠিক নয়। ওষুধের মূল্য বাড়ার সুযোগ নেই। আমরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসা করি।’ তিনি আরও বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে ওষুধ শিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তে অচলাবস্থা দূর হবে এবং বাজারে স্বস্তি ফিরবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উদ্যোগ দুটিকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে দেখছিলেন। তাদের মতে, বাংলাদেশে মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই ব্যক্তিকে বহন করতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা এবং দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়বে, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা তৈরি এবং ভোক্তার সুরক্ষা জোরদার হবে।

যে কারণে বাতিল
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিরাপদ, কার্যকর, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া হয়নি।

‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ বিধান অনুসরণ না করায় নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। এ দুটি ব্যবস্থার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। এর মধ্যে গত ২৯ জুন ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ হবে
২০২৬ সালের তালিকা বাতিল হলেও ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং এসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বহাল থাকছে। তবে সরকার জানিয়েছে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নতুন করে হালনাগাদ করা হবে। একই সঙ্গে এমনভাবে ওষুধের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।

স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আগের তালিকা পর্যালোচনা করে বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হবে। তালিকা আগের তুলনায় বাড়বে, নাকি কমবে, এখনই বলা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে নতুন একটি কমিটি করা হবে। ওই কমিটি প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের দাম বাড়ানো বা কমানোর প্রস্তাব দিতে পারবে। কিছুদিনের মধ্যে এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে।

৪৪ শতাংশ ব্যয় ওষুধে
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসায় জনপ্রতি ১০০ টাকা খরচের ৪৪ টাকাই যায় ওষুধের পেছনে। এটা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। বৈশ্বিক গড়ের ক্ষেত্রে এই হার ১৫ শতাংশ।

২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জাতীয় তালিকা রয়েছে। ওষুধ কেনা, সরকারি সরবরাহ, ব্যয় পরিশোধ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে এসব তালিকা নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। সংস্থাটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ হলো এমন, যা জনগণের অগ্রাধিকারভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন পূরণ করে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ, উপযুক্ত মাত্রা ও সাশ্রয়ী মূল্যে নিয়মিত পাওয়া যায়।

দাম নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে চাপ বাড়বে রোগীর
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদ বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকারের নজরদারি দুর্বল হলে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা গ্রহণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, সরকার হয়তো নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নতুন তালিকা প্রস্তুত করবে। কারণ তিন দশক আগে প্রস্তুত করা তালিকার অনেক ওষুধ এখন বাজারে নেই। আর দাম এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে রোগী ও ওষুধ প্রস্তুতকারী দুই পক্ষই লাভবান হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করা উচিত হয়নি। কোনো সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তা সংশোধন করা যেত। পুরো কাঠামো প্রত্যাহারের প্রয়োজন ছিল না। তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালের তালিকায় ফিরে যাওয়া বিশেষভাবে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কারণ, গত তিন দশকে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধ উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আক্তার হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক আদেশ পাওয়া যায়নি। বাতিল হওয়া সংস্কারগুলো কার্যকর হলে তা কতটা সফল হতো, সেটিও এখন বলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ব্যবস্থা কখনও কার্যকর হয়নি। কার্যকর হলে এর সুবিধা বা সমস্যা তুলনা করা যেত। কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় সেই তুলনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

পুরোনো তালিকার ওষুধ ভিন্ন নামে বাজারজাত
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯৪ সালের তালিকায় ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এসব ওষুধের ৫০ থেকে ৬০টি কোম্পানি উৎপাদন করে না। তিনি বলেন, অনেক কোম্পানি তালিকায় থাকা ওষুধ ভিন্ন নামে বাজারজাত করছে, যাতে নিজেদের মতো দাম নির্ধারণ করা যায়। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩০১টি অনুমোদিত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৫০ থেকে ২০০টি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রমে আছে। এ ছাড়া ২৮৫টি ইউনানি, ২০৬টি আয়ুর্বেদিক, ৭১টি হোমিওপ্যাথিক এবং ৩৮টি হারবাল ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

শুরু থেকেই আপত্তি ছিল শিল্প মালিকদের
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নতুন তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল ঔষধ শিল্প সমিতি। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি ছিল, তাদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হলে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে থাকা ওষুধ শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

গত ৩০ জুন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে নীতিটি পর্যালোচনার জন্য জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করা হয়। সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, বছরের পর বছর সীমিত হারে ওষুধের দাম সমন্বয় করায় কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমেছে। এতে নতুন ওষুধে বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হয়েছে এবং ছোট উৎপাদনকারীরা চাপের মুখে পড়েছেন।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব জাকির হোসেন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে ঔষধ শিল্পে স্থবিরতা বিরাজ করছিল। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ফলে অচলাবস্থা দূর হবে এবং বাজারে স্বস্তি ফিরবে। শিল্প মালিকরা আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। আশা করা যায়, আইনি জটিলতাও দূর হবে। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD