আইন পরিবর্তন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বানানো হয়েছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিপিসিকে আর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে যেতে হচ্ছে না। অর্থাৎ লুটপাটের তথ্য লুকাতে গণশুনানি তুলে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সংলাপে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম এসব কথা বলেন।
সংলাপের বিষয় ছিল ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা : ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রস্তাবিত পদক্ষেপ’। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন।
এছাড়াও বক্তব্য দেন বুয়েটের অধ্যাপক প্রফেসর ইজাজ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমাম, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন প্রমুখ। বক্তারা মনে করেন, লোডশেডিং আগামী মাস বা বছর অব্যাহত থাকবে, যা পরিবার এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাদের মতে, এবারের বাজেটে জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানিতে রাতারাতি আইন বদলে গেল। দাম বাড়াতে বিপিসিকে আর বিইআরসিতে আসা লাগল না। বিপিসি নিজেই এখন ব্যবসায়ী। তারা ফার্নেস অয়েল এবং জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করে। অর্থাৎ ব্যবসায়ী নিজেই তার পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। এ খাতে একনায়কতন্ত্র ও মনোপলি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। তারা যে দাম নির্ধারণ করেছে, সেটাই আমাদের মানতে হবে। এত বড় অবিচার কোনো দেশে আছে বলে জানা নেই।
তিনি বলেন, আইন পরিবর্তন করে গণশুনানি তুলে দেওয়া হলো। এর ফলে কোথায় কত হাজার কোটি টাকা চুরি হয়েছে, কীভাবে লুটপাট হয়েছে, তা আর বলা যাবে না। ২০২২ সালে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় দেখা গেল জ্বালানি উন্নয়ন ফান্ডের ৬৫ শতাংশ ব্যয় হয়নি। ৩৫ শতাংশ জ্বালানি কোথায়-কীভাবে ব্যয় করেছে, সেটা কেউ বলতে পারছে না।
শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল, বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলে আমরা টাকা দিয়ে যাচ্ছি। এগুলো না দিলে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম কমত। আমাদের টাকার ওপর সুদ নেওয়া হচ্ছে। এভাবে আমরা ঠকছি। তিনি বলেন, ট্রান্সমিশন ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে ১৪ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর আগে আইন করে বিদ্যুৎ খাত, জ্বালানি খাত হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। আমরা স্ট্যাবলাইজ ফান্ড করার কথা বলেছি। কিন্তু সেসব কথা শুনেনি। এখন ৮ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গত এক বছরে লোডশেডিং বেড়েছে। সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। কোথাও ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। তিনি বলেন, আপনারা হয়তো আজ, কাল দেখবেন না। আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেখবেন না। কিন্তু আমাদের অনুমান হচ্ছে এই লোডশেডিং সহজে যাবে না।
বাংলাদেশে আরও বেশকিছু সময় থাকবে বলে আমাদের আশঙ্কা। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রায় বন্ধ থাকছে। আইপিপিগুলোর (বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র) কাছে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো পাওনা রয়েছে। জ্বালানি আমদানি করার জন্য যে পরিমাণ অর্থ এবং এর জন্য যে এলসি খোলা দরকার, সেটি খোলা যাচ্ছে না। আর জ্বালানি ব্যয় মেটাতেই বিপুল পরিমাণ ঋণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একদিকে বিপিসি, পিডিবি বা বিপিডিবি লস করছে; অন্যদিকে তাদের সম্পদ বাড়ছে। আবার লসের অজুহাত দিয়ে ট্যারিফ বাড়িয়ে দিয়ে বাড়তি অর্থ নিচ্ছে। আবার সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিচ্ছে। আমাদের কাছে এই হিসাবটা গোলমেলে মনে হয়েছে। জ্বালানি খাত সমন্বয়ে আইএমএফ-এর শর্তগুলো আমাদের কাছে অপর্যাপ্ত মনে হয়েছে। বিদ্যুৎ খাত এখন যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেখান থেকে সরকারের সরে আসা জরুরি বলে আমরা মনে করছি।