তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার, যা আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। মজুরি বাড়ানোর লক্ষ্যে গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডের ৬ষ্ঠ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই আমরা তৈরি পোশাক শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি ঘোষণা করছি। তাদের নূন্যতম মজুরি ৫৬ দশমিক ২৫ বাড়বে। ফলে পূর্বের ৮ হাজার টাকা থেকে নূন্যতম মজুরি বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা হবে। এছাড়া তাদের জন্য বছরে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট থাকবে। তাছাড়া বেতন কাঠামো ৭টি থেকে কমিয়ে ৫টি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে শ্রমিকদের জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাবনা দিয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাতের মালিকপক্ষ। মজুরি বোর্ডের সভায় এই প্রস্তাব তুলে ধরেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সিদ্দিকুর রহমান।
এতে শ্রমিকদের পক্ষে প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম রনি। সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ, নিরপেক্ষ সদস্য অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীন এবং শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য ও জাতীয় শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুলতান আহম্মদ।
এর আগের সভায় মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম রনি শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ২০ হাজার ৩৯৪ টাকার প্রস্তাব করেন। আর মজুরি বোর্ডে পোশাক কারখানার মালিকদের প্রতিনিধি সিদ্দিকুর রহমান ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেন। উভয়পক্ষ প্রস্তাবনায় তাদের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে মজুরি বৃদ্ধি গার্মেন্টস আন্দোলনের নেতার বলছেন, পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করতে হবে। শ্রমিকদের গ্রেপ্তার-হত্যা-মামলা-ছাঁটাই-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ, নিরপেক্ষ সদস্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দীন এবং শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য ও জাতীয় শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুলতান আহম্মদ।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আজকে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছি। তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
এ বিষয়ে শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, সভায় মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তবে বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রস্তাবটি নেননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে তার আলোকে প্রস্তাব দেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা করার দাবিতে গত সপ্তাহখানেক যাবত দেশের পোশাক শ্রমিকেরা আন্দোলন করে আসছেন। এ নিয়ে গত ৩০শে অক্টোবর আশুলিয়া, সাভার ও গাজীপুরের কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে পুলিশ ও তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত দুইজন নিহত এবং প্রায় ৪০ জন আহত হয়। এতে বেশকিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে চলতি সপ্তাহ থেকে বন্ধ কারখানাগুলো চালু হতে শুরু করে। পরে ঢাকার আশুলিয়ায় ৩টি কারখানা ভাঙচুর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধরের অভিযোগে আশুলিয়া থানায় পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ। মামলাগুলোতে উসকানি ও ভাঙচুরের অভিযোগে শ্রমিক সহ দেড় হাজার ব্যক্তিকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়।
তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য বাস্তবসম্মত নিম্নতম মজুরি কাঠামো প্রস্তাবনার জন্য শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো হচ্ছে-
১. গার্মেন্টস শ্রমিকদের মাসিক মূল মজুরি সর্বমোট মাসিক মজুরির ন্যূনতম ৬১ শতাংশ করা।
২. গার্মেন্টস শ্রমিকদের পদ ও শ্রেণিবিন্যাসে গ্রেডিং সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে পূর্বের ৭টি গ্রেডের পরিবর্তে ৫টি গ্রেডে ভাগ করা।
৩. মূল মজুরির ওপর ১০ শতাংশ হারে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে।
৪. পর পর দুটি গ্রেডের মধ্যে নূন্যতম মজুরির পার্থক্য ১০ শতাংশ করতে হবে।
৫. নতুন শ্রমিকদের জন্য তিন মাস শিক্ষানবিশকাল হিসেবে বিবেচিত হবে।
৬. সোয়েটার কারখানা বা পিস রেটে কর্মরত শ্রমিককে প্রোডাকশন না থাকলে বিগত ৩ মাসের মজুরির গড়/৩নং গ্রেডের বেসিক মজুরি পরিশোধ, কাজের আগে রেটের ফয়সালা করা।
৭. যে কোনো সম্প্রদায়ের শ্রমিক ও কর্মচারীরা স্ব স্ব সম্প্রদায়ের প্রধান দুটি উৎসবে প্রতিটিতে ৬ মাসের অধিক চাকরির ক্ষেত্রে এক মাসের মূল মজুরি হারে ২টি উৎসব ভাতা ও ৬ মাসের অনধিক চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিটিতে ১৫ দিনের মজুরি হারে ২টি উৎসব ভাতা প্রাপ্ত হবেন। শ্রমিকের উৎসব ভাতা ১ মাসের মূল মজুরির কম হবে না।
৮. স্বীয় পদে/গ্রেডে চাকরির সর্বোচ্চ ২ বছরের মধ্যে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।
৯. পোশাক কারখানায় গ্র্যাচুইটি সিস্টেম প্রচলন করতে হবে। তবে অন্তর্র্বতীকাল হিসেবে ১০ বছরের অধিক সময় কর্মরত শ্রমিকদের জন্য সমান হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। চাকুরি অবসরের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য প্রাপ্ত গ্র্যাচুইটি দিতে হবে।
১০. মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতনে ৬ মাস দিতে হবে।
১১. শ্রমিকদের পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা দিতে হবে।
১২. নতুন মজুরি নির্ধারণের পর যাতে স্থানীয় পর্যায়ে বাড়ি ভাড়া না বাড়ে, তা তদারকি করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন এবং মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি করে পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
১৩. গার্মেন্টস শ্রমিকদের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে (সরকারের ভর্তুকিমূলক পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা)।