শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ন




দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশীর হাজার প্রপার্টি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৩ ১২:৩৮ pm
Dubai city emirate United Arab Emirates luxury shopping lively nightlife scene Burj Khalifa skyscraper filled skyline foot artificial islands offshore Atlantis Palm resort water marine-animal parks UAE ইউএই সংযুক্ত আরব আমিরাত মারহাবান বিখ্যাত বুর্জ খলিফা বুর্জ আল আরব দুবাই টাওয়ার ১৬০ তলাবিশিষ্ট আকাশচুম্বী দুবাই শহর সংযুক্ত আরব আমিরাত
file pic

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশ্যে-গোপনে বিপুল পরিমাণ মূলধন স্থানান্তরিত হচ্ছে দুবাইয়ে। এ অর্থ পুনর্বিনিয়োগে ফুলেফেঁপে উঠছে দুবাইয়ের আর্থিক, ভূসম্পত্তি, আবাসনসহ (রিয়েল এস্টেট) বিভিন্ন খাত।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের (সি৪এডিএস) সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি জানিয়েছে, বাংলাদেশে তথ্য গোপন করে দুবাইয়ে প্রপার্টি কিনেছেন ৪৫৯ বাংলাদেশী। ২০২০ সাল পর্যন্ত তাদের মালিকানায় সেখানে মোট ৯৭২টি প্রপার্টি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, কাগজে-কলমে যার মূল্য সাড়ে ৩১ কোটি ডলার। তবে প্রকৃতপক্ষে এসব সম্পত্তি কিনতে ক্রেতাদের ব্যয়ের পরিমাণ আরো অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুবাইয়ে বসবাসকারীসহ বিভিন্ন সূত্রের অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো তথ্য অনুযায়ী, ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির পরিসংখ্যানটি করা হয়েছে সি৪এডিএসের ২০২০ সালের তথ্য নিয়ে। এরপর গত দুই বছরে দুবাইয়ে বাংলাদেশীদের প্রপার্টি ক্রয়ের প্রবণতা আরো ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। এ সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি কিনেছে বাংলাদেশীরা, যার তথ্য তারা দেশে পুরোপুরি গোপন করে গেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে বাংলাদেশীদের গোপনে কেনা প্রপার্টির অর্থমূল্য এখন কম করে হলেও ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

বৈশ্বিক অর্থনীতির কভিডকালীন বিপত্তির মধ্যেও দেশটির রিয়েল এস্টেট খাতের বিদেশী প্রপার্টি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশীরা ছিল শীর্ষে। স্থানীয় ভূমি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কভিডকালে দুবাইয়ে বাংলাদেশী ধনীরাই প্রপার্টি কিনেছেন সবচেয়ে বেশি। এদিক থেকে নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, চীন ও জার্মানির মতো দেশগুলোর বাসিন্দাদের পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশীরা।

দেশের বিত্তবানদের কাছে দীর্ঘদিন দুবাইয়ের আকর্ষণ ছিল নিছক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ আকর্ষণ রূপ নিয়েছে প্রকাশ্য ও গোপন লগ্নির কেন্দ্র হিসেবে। আকর্ষণীয় মুনাফার খোঁজে রিয়েল এস্টেট ছাড়াও অন্যান্য ব্যবসায় নাম লেখাচ্ছেন তারা। দেশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই এখন দুবাইকে বেছে নিয়েছে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে।

২০২০ সালে করোনার মধ্যেই দেশের নির্মাণ খাতের ঠিকাদারির সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যবসায়ী দুবাই চলে যান। এর পর থেকে তিনি সেখানেই বসবাস করছেন। দেশের ব্যবসা থেকে উপার্জিত মুনাফা প্রতিনিয়ত দুবাইয়ে স্থানান্তর করছেন তিনি। এরই মধ্যে তিনি দুবাইয়ের আবাসন ও নির্মাণ খাতে বড় ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এখন যেকোনোভাবে হোক বিদেশ থেকে পুঁজির প্রবাহ বাড়াতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছে। এজন্য বিদেশী ধনীদের স্থানান্তরিত হতে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধাও দেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশও অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ও শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থা গড়তে না পারায় এখান থেকে দুবাইয়ে অর্থ পাচার বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির হিসাব অনুযায়ী, দুবাইয়ে মোট প্রপার্টির বাজার ব্যাপ্তি ৫৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ আছে বিদেশী মালিকানায়। তথ্য গোপনের কারণে এর মধ্যে ৭ শতাংশ প্রপার্টি মালিকের জাতীয়তা নিশ্চিত করা যায়নি। সার্বিকভাবে প্রপার্টি খাতের বিদেশী মালিকের হার চিহ্নিত ২৭ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে দুবাইয়ে বিদেশীদের মালিকানাধীন প্রপার্টির মূল্য অন্তত ১৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। দুবাইয়ের অফশোর প্রপার্টির বাজার ব্যাপ্তির দিক থেকে এখন লন্ডনের অফশোর প্রপার্টির বাজারের দ্বিগুণেরও বেশিতে দাঁড়িয়েছে। যদিও দুবাইয়ের মোট জনসংখ্যা লন্ডনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ থেকে বৈধ কোনো উপায়ে বৃহৎ বিনিয়োগে বিদেশে প্রপার্টি কেনার সুযোগ নেই। সে হিসেবে এখানে যে বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, ধরে নিতে হবে এর সিংহভাগই হয়েছে অবৈধভাবে পাচারের মাধ্যমে। এমনকি পুরোটাই পাচারের মাধ্যমে হয়েছে, এটি বললেও খুব একটা ভুল হবে না। দুবাই যে এখন বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের বড় গন্তব্য হয়ে উঠেছে, এ বিষয়ে আগেও অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তার পরেও এ প্রবণতা চালু থাকার দুটি কারণ। প্রথমত, দুবাই সরকারও সেখানে বিদেশ থেকে অর্থ নিয়ে আসাকে উৎসাহ দেয়। তারা নানাভাবে এর সুযোগ দেয়। অর্থের উৎস সম্পর্কেও জানতে চায় না। যেনতেনভাবে এলেও বিদেশী পুঁজিকে তারা উপভোগই করে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশেও এর প্রতিকার বা প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এখানকার কর্তৃপক্ষ খুব একটা উচ্চবাচ্য করে না। কারণ পাচারকারীরা ধনী ও প্রভাবশালী।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইউএই কর্তৃপক্ষ গোল্ডেন ভিসা সুবিধা চালু করার পর বাংলাদেশীদের দুবাইয়ে প্রপার্টি ক্রয়ের মাত্রা হু হু করে বাড়তে থাকে। বিত্তবান বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে ২০১৯ সালে এ ভিসা চালু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থসম্পত্তির মালিকানা থাকলেই এ ভিসার জন্য আবেদন করা যায়। শর্ত সহজীকরণের পাশাপাশি ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতাগুলোও দূর করা হয়েছে।

দেশের ধনীদের অনেকেই ইউএইর দেয়া এ সুযোগ লুফে নিয়েছেন। দেশের ব্যাংক পরিচালক, রাজনীতিবিদ, পোশাক ব্যবসায়ী, রেল ও সড়কের সামনের সারির ঠিকাদারসহ দেশের বড় ও মাঝারি অনেক পুঁজিপতিই এখন আমিরাতের গোল্ডেন ভিসাধারী। তাদের মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল অংকের পুঁজি পাচার হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে দেশের একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানিয়েছেন, দেশের ধনী পুঁজিপতিদের কাছে একসময় অর্থ পাচারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য সিঙ্গাপুর ও ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশ। এখন সে তালিকায় যুক্ত হয়েছে দুবাই। এক্ষেত্রে পাচারের প্রধান মাধ্যম এখন হুন্ডি। আবার বড় ব্যবসায়ীরা আমদানি-রফতানির আড়ালে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করেও টাকা পাচার করছেন।

পুঁজি পাচারের অভিযোগ থাকলেও ইউএই সরকার গোল্ডেন ভিসার আওতায় আসা বিদেশীদের দেয়া সুযোগ-সুবিধার পরিমাণ বিভিন্ন সময়ে বাড়িয়েছে। এ ভিসাধারীদের দেয়া হচ্ছে পরিবারসহ ১০ বছরের রেসিডেন্সিয়াল সুবিধা। ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া বেশ সহজ। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও তাদের দেয়া হয় বিশেষ সুবিধা। সহজ করা হয়েছে ব্যবসা চালানোর অনুমতির প্রক্রিয়া। আগে গোল্ডেন কার্ডধারীদের টানা ছয় মাসের বেশি ইউএইর বাইরে অবস্থান করার সুযোগ ছিল না। গত অক্টোবরে এতেও সংশোধন এনে নিয়ম করা হয়, গোল্ডেন ভিসাধারীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশটির বাইরে অবস্থান করতে পারবেন।

দুবাইয়ে অবস্থানরত কোনো কোনো ব্যবসায়ীও বাংলাদেশের ধনীক শ্রেণীর ব্যক্তিদের সেখানে টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছেন। এমন এক বাংলাদেশী ব্যবসায়ীর কথা জানা গেছে, যিনি সত্তরের দশকে শ্রমিক ভিসায় দুবাই গিয়েছিলেন। সেখানে এখন রীতিমতো নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। দেশের ব্যাংক, পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান কিছু বিনিয়োগ রয়েছে তার।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশ থেকে দুবাইয়ে বাংলাদেশী বড় ব্যবসায়ীদের সম্পদ পাচারের ক্ষেত্রে ওই ব্যবসায়ী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখছেন। কে কোন খাতে বিনিয়োগ করবেন, সেটিও নির্ধারণ করে দিচ্ছেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার মূল নেটওয়ার্কও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ওই ব্যবসায়ীর তত্ত্বাবধানে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের বড় কয়েকজন ব্যবসায়ীকে দুবাইয়ে এপার্টমেন্ট, বাড়ি, হোটেল, মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি কিনে দিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করা হয়। সে রেমিট্যান্স সংগ্রহের পর তা দেশে না পাঠিয়ে দুবাইয়ে স্থানান্তর হওয়া বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের দিচ্ছেন ওই ব্যবসায়ী। তিনি ও দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের একাংশ এখানে সে টাকা পরিশোধ করছেন হুন্ডির এজেন্টদের। হুন্ডির এ নেটওয়ার্কের প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যক্তিরা প্রবাসীদের পরিবারকে তাদের দেয়া টাকা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এভাবেই দুবাইকে কেন্দ্র করে দেশ থেকে অর্থ পাচারের শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ইউএইসহ মাধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈধ পথে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসার পেছনে এ নেটওয়ার্কের বড় ভূমিকা রয়েছে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এ খাতের ব্যবসায়ীরা এখন দুবাইয়ে লিঁয়াজো অফিস খুলছেন। গত দশক পর্যন্তও এ ধরনের লিঁয়াজো অফিসের ঠিকানা হতো প্রধানত হংকং। এর ধারাবাহিকতায়ও অনেকে প্রপার্টি কিনছেন। দেশের পোশাক খাতের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী সেখানে অফিস খুলেছে।

বিজিএমইএ সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধার্থে বিশেষ করে ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা আগে লিঁয়াজো অফিস খুলতেন হংকংয়ে। এখন এর নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে দুবাই। সেটিও করা হচ্ছে ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে। আমার জানা মতে অনেকেই লিয়াজোঁ অফিস চালু করেছেন। এ ধারাবাহিকতায় প্রপার্টিও করতে পারেন কেউ কেউ। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কারো সম্পর্কে কোনো তথ্য আমার জানা নেই। [বণিক বার্তা]




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD