রহস্যময় সংগঠনের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে মানুষকে বিমানযোগে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ার মুখোশ উন্মোচন করেছেন এক ফিলিস্তিনি। এতে ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি, যিনি সম্প্রতি এই অবৈধ পথেই গাজা ছাড়তে বাধ্য হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিচয় গোপন রাখা ওই ব্যক্তি সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই অপারেশনটি ‘আল-মাজদ ইউরোপ’ নামে একটি গোপন সংগঠন পরিচালনা করছে, এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে এর ‘ঘনিষ্ঠ সমন্বয়’ রয়েছে।
ওই ব্যক্তি জানান, তাকে ও তার পরিবারকে প্রথমে দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত কেরেম শালোম (করেম আবু সালেম) ক্রসিং দিয়ে ইসরায়েলি সেনারা বাসযোগে রামন বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। সেখানে কোনো পাসপোর্টে সিল দেয়নি ইসরায়েল, কারণ তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় না।
সেখানে থেকে রোমানিয়ার পতাকাবাহী একটি উড়োজাহাজ তাদের কেনিয়ায় নিয়ে যায়, যা ছিল ট্রানজিট পয়েন্ট। তার দাবি-কেনিয়ার সঙ্গেও আল-মাজদ ইউরোপ-এর সমন্বয় রয়েছে।
তিনি বলেন, বিমানযাত্রীদের কারওই গন্তব্য জানা ছিল না। গাজার ভেতর অন্তত তিনজন এবং ইসরায়েলঘনিষ্ঠ ফিলিস্তিনি নাগরিকসহ আরও কয়েকজন বাইরে থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।
প্রথমে অনলাইনে নিবন্ধন, পরে জন্মনিবন্ধন, এরপর নগদ অর্থ জমার নির্দেশ দেয়া হয়। ওই ব্যক্তি জানান, তিনি নিজে এবং পরিবারের দুই সদস্যের জন্য মোট ছয় হাজার ডলার পরিশোধ করেছেন। অর্থ জমা দিতে হয় ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে নয়।
এর আগে জুন মাসে একটি দল গাজা থেকে ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানো হয়। আগস্টে আরেকদলকে অজ্ঞাত স্থানে নেয়ার প্রস্তুতি চললেও পরে বিলম্ব হয়।গত শুক্রবার দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানো ১৫৩ জন ফিলিস্তিনির মধ্যে প্রত্যেকে ১,৫০০ থেকে ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করেছেন। তাদের সঙ্গে কেবল একটি ফোন, কিছু নগদ অর্থ এবং একটি ব্যাকপ্যাক নিতে দেয়া হয়।
আল-মাজদ ইউরোপ-এর পরিচয় নিয়ে বহু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংগঠনটি দাবি করে ২০১০ সালে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাদের ওয়েবসাইট নিবন্ধিত হয়েছে চলতি বছর। সেখানে সংগঠনের প্রতিনিধিদের যে ছবি দেয়া আছে-এর অনেকগুলোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। কোনো নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের ঠিকানা নেই। কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ এলাকা-যা নিয়ন্ত্রিত এলাকা।
আরেক ফিলিস্তিনি, যিনি নিজেকে ওমর হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, জানান-তার কাছে জন্মসনদ ও পাসপোর্ট চাইলে তিনি তথ্য পাঠান। বলা হয় প্রথমে ২,৫০০ ডলার ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে। পরে তাকে জানানো হয়-একক যাত্রী নেয়া হয় না; ফলে তার আবেদন বাতিল হয়ে যায়।
গাজার মধ্যাঞ্চলের আজ–জাওয়াইদা থেকে আল–জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খৌদারি জানান, গাজায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে ওঠায় অনেক মানুষ এমন অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন। দুই বছরের যুদ্ধ ও ভয়াবহ অভিযান গাজার জীবনকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের ভয় আরও বেড়েছে,’ তিনি বলেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে-তারা গাজার ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়তে’ সহায়তা করছে এবং আল-মাজদ ইউরোপ’এর মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে মানুষ বের হতে পারছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এই নীতির উদ্দেশ্য, গাজা থেকে মানুষকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেয়া।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর চলতি বছরের মার্চে ইসরায়েল এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিশেষ একটি ইউনিটও গঠন করে।