দেশের ব্যাংকিং খাতের সিংহভাগ ঋণই এখন অল্পসংখ্যক বড় গ্রাহকের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র চার হাজার ৮৯৯ গ্রাহকের (যাদের ঋণ ৫০ কোটি টাকার বেশি) কাছে রয়েছে পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। এটি দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিটি হিসাবের বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বড় ঋণগ্রহীতা ও নির্দিষ্ট কিছু শিল্পগোষ্ঠীর কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের মার্চে তিন হাজার ৭০৪ জন বড় গ্রাহকের হাতে ঋণের পরিমাণ ছিল চার লাখ ৩১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ২৭ দশমিক ছয় শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে বড় গ্রাহকদের ঋণের অংশ বেড়েছে আরো প্রায় পাঁচ শতাংশ।
বড় ঋণে ঝুঁকি বাড়ছে, শিথিল হচ্ছে নিয়ম
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অল্প কিছু মানুষের হাতে ঋণের বড় অংশ থাকা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত। কারণ, এই বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে তার ধাক্কা সরাসরি কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন, তারল্য ও মুনাফার ওপর পড়বে। এই ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বজুড়ে বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ‘এক্সপোজার সীমা’ নির্ধারণ এবং ঋণ বিতরণে বৈচিত্র্যের ওপর জোর দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর জন্য বৃহৎ ঋণের সীমা বেঁধে দেওয়া থাকলেও, অনেকেই তা মানছেন না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম ভেঙে অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠী সীমার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার তাগাদা দিয়েও এই গ্রুপগুলোর ঋণ সীমার মধ্যে আনতে পারেনি। উল্টো সম্প্রতি বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর জন্য বৃহৎ ঋণের এই সীমা আরো শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া তাদের জন্য আরো সহজ হবে।
নতুন নিয়মে, এখন থেকে একটি ব্যাংক তাদের মোট মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ সরাসরি (ফান্ডেড) ঋণ দিতে পারবে একজন গ্রাহককে, যা আগে ছিল ১৫ শতাংশ। তবে সরাসরি ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে মোট ঋণ কোনোভাবেই ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই নির্দেশনা কার্যকর থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যাংকের মূলধন ১০ হাজার কোটি টাকা হলে, একটি গ্রুপকে এখন সরাসরি আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া যাবে, যা আগে ছিল এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে মোট হিসাবধারী বা গ্রাহক ছিলেন এক কোটি ৫৯ লাখ ৮২ জন।
বঞ্চিত ৯৪ শতাংশ ক্ষুদ্র গ্রাহক, কমছে ছোট ঋণ
বড়রা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পেলেও দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কুটিরশিল্প, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট ঋণগ্রহীতার ৬৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ বা এক কোটিরও বেশি গ্রাহকের ঋণ এক লাখ টাকার নিচে। এই বিশাল সংখ্যার গ্রাহক সবাই মিলে ঋণ পেয়েছেন মাত্র ২৮ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। এছাড়া ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া গ্রাহকের সংখ্যা এক কোটি ৪৯ লাখ ৭৮ হাজার ৯৪৫, যা মোট হিসাবের ৯৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অথচ তারা সবাই মিলে মোট ঋণ পেয়েছেন মাত্র ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ।
বড় ঋণ বাড়লেও ছোটদের কমছে
ব্যাংকগুলো বড়দের ঋণ বাড়ালেও ছোটদের ঋণ উল্টো কমিয়ে দিয়েছে। গত এক বছরে শীর্ষ চার হাজার ৮৯৯ জন বড় গ্রাহক নতুন করে আরো ১৩ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন। বিপরীতে বাকি এক কোটি ৫৯ লাখের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকের সম্মিলিত ঋণ উল্টো সাত হাজার ১৮১ কোটি টাকা কমে গেছে।
ঋণের সিংহভাগ শীর্ষ ১০ করপোরেট গ্রুপের দখলে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের মাত্র ২৬ হাজার ৫৯৭ জন বা মোট ঋণগ্রহীতার মাত্র শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশের হাতে রয়েছে ১০ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা, যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৮২ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের শীর্ষ ১০টি করপোরেট গ্রুপই মূলত এই ঋণের সিংহভাগ ভোগ করছে। এই গ্রুপগুলো হলো—এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও নাবিল গ্রুপ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
ঋণের এই বিপজ্জনক অবস্থা কেন্দ্রীভূত সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সরকারি ব্যাংকগুলোতে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট তিন লাখ ৫১ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে মাত্র এক হাজার ১১২ জন গ্রাহকের হাতেই রয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় অর্ধেকই মাত্র এক হাজার গ্রাহকের পকেটে।
খেলাপি ঋণের পাহাড় ও মূলধন সংকট
ঋণ বিতরণের এই ভারসাম্যহীনতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর। ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড পাঁচ দশমিক ৮৮ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫’ অনুযায়ী, ব্যাপক খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতির কারণে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের ‘ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধনের অনুপাত’ (সিআরএআর) নেমে ঋণাত্মক দুই শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক ও নিয়মতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী এটি ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকার কথা ছিল। amardesh