বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদকে ঘিরে একের পর এক নাটক চলছিল অনেকদিন ধরেই। এ দীর্ঘ নাটকের সর্বশেষ অধ্যায়ে যোগ হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে তার শর্তসাপেক্ষে কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার ঘটনা।
পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর এ মুক্তি প্রক্রিয়া দেশের কূটনৈতিক ও আইনাঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে, জামিনের কারণে সুচতুর বেনজীরকে দেশে ফেরাতে নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। তিনি একাধিক দেশের নাগরিক উল্লেখ করে কোনো কোনো সূত্র বলছে, জামিনের শর্ত হিসাবে একটি পাসপোর্ট আদালতে জমা দিলেও তার আরও পাসপোর্ট আছে। সেগুলো ব্যবহার করে তিনি ইউরোপের যে কোনো দেশে চলে যেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে সতর্ক বাংলাদেশ সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেনজীরকে ফেরাতে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দুবাইয়ে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুবাইয়ের একটি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের শুনানির পর ২৭ জুলাই বেনজীর আহমেদের জামিন মঞ্জুর হয়। পরে আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন। আদালত তাকে মুক্তি দিলেও কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকবে এবং আদালতের সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না।
এ তথ্য পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর পারস্পরিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছে। তবে দুবাই কর্তৃপক্ষ বা ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে-জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাবেক এ পুলিশপ্রধানকে দেশে এনে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে বেশকিছু আইনি, কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা বা প্রতিবন্ধকতা আছে। এক্ষেত্র প্রথমত, বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় কোনো আনুষ্ঠানিক বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ফলে প্রচলিত ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় আসামিকে হস্তান্তর করার আইনি বাধ্যবাধকতা ইউএই সরকারের নেই। এ ধরনের ক্ষেত্রে মামলা বা প্রত্যর্পণের আবেদনটি দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক কূটনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নীতির ওপর নির্ভর করে।
দ্বিতীয়ত, দুবাইয়ের আইন অনুযায়ী যে কোনো গ্রেফতার ব্যক্তির জামিন পাওয়ার আইনি অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথিপত্রের বিপরীতে বেনজীর আহমেদের নিয়োগ করা আইনজীবীরা আদালতে জোরালো আইনি লড়াই পরিচালনা করছেন। প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত রায় আসার আগ পর্যন্ত আসামি যেন আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে মুক্ত বাতাসে থাকতে পারেন, সে সুযোগটি তারা কাজে লাগাচ্ছেন।
তৃতীয়ত, অন্য কোনো দেশে পলায়নের ঝুঁকি রয়েছে। আদালতের নির্দেশে পাসপোর্ট জব্দ এবং আমিরাত ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রভাবশালী ও অর্থশালী ব্যক্তিরা প্রায়ই জালিয়াতি বা বিকল্প উপায়ে ভ্রমণের চেষ্টা করে থাকেন। যদি তিনি আমিরাতের নজরদারি এড়িয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, তবে তাকে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত দুরূহ হবে। বেনজীর আহমেদ দীর্ঘদিন পুলিশের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার বিভিন্ন সংযোগ থাকায়, তাকে রক্ষায় বা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে প্রভাবশালী একটি পক্ষ নেপথ্যে আইনি ও কূটনৈতিক লবিং চালিয়ে যাওয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়।
রোববার বিকালে রাজশাহীতে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বেনজীর আহমেদের জামিন আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ওই আদেশ বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকার দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান (ল ফার্ম) নিয়োগ করেছে। তিনি বলেন, বেনজীর দুবাই আদালত থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন, এটি আমরা শুনেছি। এ বিষয়ে দুবাইয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে পারব। বাংলাদেশ থেকে নিয়োগ ল ফার্ম এ নিয়ে কাজ করছে।
এদিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যক্রম শুরু করেছে। প্রক্রিয়াটি নিয়ে আলোচনা চলছে। দুবাইয়ে বেনজীরের জামিন বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য আমার কাছে নেই। বিষয়টি সম্পর্কে আপডেট না জেনে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যাবে।’
একই দিনে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠান শেষে বেনজীর ইস্যুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আশাবাদী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, আরব আমিরাতে বেনজীর আহমেদের জামিন পাওয়া দেশটির আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। একই সঙ্গে বেনজীরকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে দেশটির সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। শামা ওবায়েদ বলেন, দেশটির পক্ষ থেকে বেনজীরের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য চাওয়া হয়েছিল। সেগুলো সরবরাহ করা হয়েছে। আশা করছি শিগ্গিরই অভিযুক্ত আসামি বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালেই ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগেই দেশ ছাড়েন তিনি। দেশ ছাড়ার আগে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচারসহ একাধিক অভিযোগে তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়। পরে ওই নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ বেনজীরকে গ্রেফতার করে।
আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ১২ জুন ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি জানায়। এরপর ১৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গ্রেফতারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠাতে হবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করে বাংলাদেশ সরকার আবেদন পাঠায়। এর প্রায় এক মাস পর বেনজীরকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি জানিয়ে আরও কিছু তথ্য ও আইনি ব্যাখ্যা চেয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দেয় দুবাই পুলিশ। এ নথি আদান-প্রদানের মধ্যেই বেনজীর জামিনে মুক্তির খবর দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলো।
(যুগান্তর)