স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে বাণিজ্য সুরক্ষার সমীকরণ আরো পরিবর্তিত হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক-সুবিধা সংকুচিত হওয়ার এই ক্রান্তিকালে দেশি শিল্প খাতকে বিদেশি পণ্যের অন্যায্য প্রতিযোগিতা ও তীব্র প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে এখন থেকেই নেওয়া হচ্ছে বিশেষ প্রস্তুতি। এ লক্ষ্যে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মূলত বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতেই এ নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণকে টেকসই ও কার্যকর করতে জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
তাদের মতে, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও, এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কাঠামোগত সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনায় ১২টি অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম রাখা হয়েছে। এই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা জোরদার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বৃদ্ধি।
জানা গেছে, এলডিসি তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। এ সময়সীমা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আবেদন করে। সিডিপি বাংলাদেশের প্রস্তুতিমূলক সময় বাড়ানো উপযুক্ত হবে বলে মত দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করার শর্ত রয়েছে। ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) সিডিপির সিদ্ধান্ত নোট করেছে এবং ২৪ নভেম্বরের আগে এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। ফলে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতির পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কার ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) জন্য বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) প্রস্তুত করা ‘বাণিজ্য প্রতিরক্ষা পদ্ধতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরো কঠিন হবে। এ বাস্তবতায় আমদানির ক্ষেত্রে দেশি শিল্পকে রক্ষায় অ্যান্টি ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি বলে জানিয়েছে প্রতিবেদনটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা। শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ায় বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে। অন্যায্য আমদানির কারণে বাড়বে দেশি শিল্পের ঝুঁকি। তাই বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ব্যবহারে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অ্যান্টি ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড—এই তিনটি ব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার মধ্যে আইন, তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ, বাজার পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মামলা পরিচালনা এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। কোনো পণ্য বিদেশি বাজারে তার স্বাভাবিক মূল্য বা ‘নরমাল ভ্যালু’র তুলনায় কম দামে রপ্তানি করা হলে, প্রযোজ্য আইন ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি অনুযায়ী তা ডাম্পিং হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ডাম্পিংয়ের কারণে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা যায়। আবার কোনো দেশের সরকার রপ্তানিকারকদের বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যায্য সুবিধা দিলে এবং এর ফলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে নির্দিষ্ট শর্তে কাউন্টারভেইলিং ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অন্যদিকে কোনো পণ্যের আমদানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে দেশীয় শিল্পের গুরুতর ক্ষতি বা ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি করলে সাময়িক সুরক্ষার জন্য সেফগার্ড ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা সাধারণ সংরক্ষণবাদী নীতি নয়; বরং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এটি বৈধ প্রতিকার, যার মাধ্যমে কোনো দেশ ডাম্পিং, ভর্তুকি বা আমদানি বৃদ্ধিজনিত ক্ষতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
বিটিটিসির প্রতিবেদনে সরকার, শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার পাশাপাশি জাতীয় বাণিজ্য প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাণিজ্য সুরক্ষা সহায়তা কেন্দ্র, যৌথ বাণিজ্য সুরক্ষা সেল, তথ্য বিনিময়ের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি একাডেমিক কনসোর্টিয়াম গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ, পাটপণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক ও কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান তৈরি করছে। তবে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বিদ্যমান শুল্ক-সুবিধা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত বা সংকুচিত হতে পারে। ফলে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হবে। এ অবস্থায় শুধু নতুন বাজার খোঁজা বা রপ্তানি বাড়ানোর কৌশল যথেষ্ট হবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম মেনে দেশি শিল্পকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
বিটিটিসির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দেশে বাণিজ্য সুরক্ষা তদন্তের আইনি ভিত্তি থাকলেও কার্যকর প্রয়োগের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য যাচাই, আন্তর্জাতিক শুনানিতে অংশ নেওয়া এবং ডব্লিউটিওর বিধান মেনে তদন্ত পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে পৃথক বাণিজ্য প্রতিকার আইন, বিশেষায়িত সেল, দক্ষ জনবল এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) তাদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য-সুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। বিশেষ করে এলডিসি-নির্দিষ্ট বাজার সুবিধা হারালে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর চাপ বাড়তে পারে। আঙ্কটাডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাণিজ্য-সুবিধা কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য চুক্তি এবং দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করার সক্ষমতা বাড়ানোও এই প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রয়েছে। এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে। তবে সেই আশায় বলে থাকলে হবে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। রপ্তানি পণ্য ও রপ্তানির বাজার বহুমুখী করতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে, তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই উত্তরণকে টেকসই করা। তিনি বলেন, এলডিসি সুবিধা থেকে বেরিয়ে গেলে রপ্তানি, ওষুধ শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তাই প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করেই উত্তরণে এগোনো উচিত। আমার দেশ