মালয়েশিয়ার ঠিক করে দেওয়া রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠিয়ে ২০০৯ থেকে ১৫ বছরে তিনবার দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। কুয়ালালামপুরে থাকা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিতদের পছন্দের এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে গিয়ে প্রতিবারই নির্ধারিত ব্যয়ের কয়েক গুণ অর্থ আদায়, প্রতিশ্রুত চাকরি ও বেতন না দেওয়া এবং নিপীড়নের হাজারো ঘটনা সামনে আসে।
এজেন্সি বাছাই করে দেওয়ার পদ্ধতি নেপাল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেও বাংলাদেশ বিস্তারিত জানতে চিঠি দিয়েছে মালয়েশিয়াকে। গত শুক্রবার বাংলাদেশের ২৫ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়ে তালিকা প্রকাশ করে মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস। একই দিনে নেপালেরও ২৫ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করা হয়।
পরের দিন নেপালের শ্রমমন্ত্রী দেশটিতে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ডেকে আপত্তি জানান। ‘সিন্ডিকেট’ না করে দেশটির সব এজেন্সির জন্য আগের মতো কর্মী পাঠানোর সুযোগ রাখার বিষয়ে বলা হয়। দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা সিন্ডিকেট গুঞ্জনে নজর রাখছে।
বারবার একই পদ্ধতি, একই পরিণতি
২০০৯ সালে প্রথম দফায় বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এরপর ২০১৬ সালের শেষে বাজার আবার খোলে। সেবার ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয় মালয়েশিয়া। সেগুলো সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পায়। ২০১৭ ও ২০১৮– এই দুই বছরে এই এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৯ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যান।
জিটুজি প্লাস নামে এই পদ্ধতিতে কর্মীপ্রতি ৩৭ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেছিল দুই দেশ। কিন্তু নেওয়া হয়েছিল তিন লাখ টাকা। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এই পদ্ধতি বন্ধ করে মালয়েশিয়া। বন্ধ হয় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশ চুক্তি করে। এতে আবার সুযোগ রাখা হয় বাংলাদেশের কোন কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে। তখন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সব এজেন্সির জন্য কর্মী পাঠানোর সুযোগ উন্মুক্ত রাখার ওপর জোর দেয়নি; বরং তারা এজেন্সি নির্ধারণের দায়িত্ব দেয় মালয়েশিয়াকে। ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানালেও তৎকালীন সরকার এ পদ্ধতিকেই সমর্থন করে।
মালয়েশিয়া কর্মী পাঠাতে ২৫ এজেন্সিকে বাছাই করে। এগুলোর অধিকাংশের মালিক ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেবারও সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল সব এজেন্সিই ধাপে ধাপে কর্মী পাঠানোর কাজ পাবে।
২০২২ সালের ২ জুন তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছিলেন, ‘সমঝোতা অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্ট নির্বাচন করার অধিকার কিন্তু মালয়েশিয়ার। যেহেতু তারা লোক নেবে, সেহেতু অধিকার তাদের। এই যে ২৫, ৫০, ১০০ সংখ্যা আপনারা বলেন, এই সংখ্যা সমঝোতায় নেই, আমাদের আজকের আলোচনায় কোথাও নেই। রিক্রুটিং এজেন্টরা যারা ব্যবসা করতে চায়, তারা নিজেরাই নিজের ব্যবসা খুঁজবে।’
সরকারি এজেন্সি বোয়েসেলসহ পরে আরও ৭৬ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। সেই সময়ের দুর্নীতির মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদ।
২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৯০ জন কর্মী এই পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া যান। কর্মীপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা।
মালয়েশিয়ায় শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা ইউনিয়নের জরিপ অনুযায়ী কর্মীপ্রতি নেওয়া হয়েছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। প্রায় ১৭ হাজার কর্মী এ কারণে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। মালয়েশিয়া যেতে টাকা দিয়ে রাখা লাখের বেশি কর্মী একই বছরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে বিমানবন্দরে ভিড় করেছিলেন। তাদের আহাজারি তখন আলোচিত ঘটনা ছিল। শেষের দিকে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের বিমান ভাড়া ৩০ হাজার টাকা বেড়ে তিন লাখ টাকা হয়েছিল।
আগের তিনবারের এ অভিজ্ঞতার পরও আগের পদ্ধতিতেই যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগের মন্ত্রীদের মতো বর্তমান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও আশাবাদী। তাঁর আশা, ধাপে ধাপে সব এজেন্সি কর্মী পাঠানোর কাজ পাবে। গত শনিবার তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়ার দেওয়া শর্ত পূরণ করা ৪২৩টির এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়েছিল। এই তালিকা থেকে বাদ যাবে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সি, যাদের লাইসেন্স প্রত্যাহার হয়েছে আগেরবার সিন্ডিকেট করায়। বাকি ৩৭৪টির মধ্যে ২৫টিকে তালিকায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ চায় বাকি ৩৪৯টিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
গতকাল রোববার মন্ত্রী এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়াকে দেওয়া চিঠির জবাবের অপেক্ষায় আছেন তিনি।
বাজার খুললেই সিন্ডিকেট সক্রিয়
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবাসীকল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দুই দফা দেশটিতে যান। তবে কুয়ালালামপুরের শর্ত ছিল ২০২১ সালের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী তারা এজেন্সি বাছাই করবে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন তিন দফা মালয়েশিয়া গিয়েছেন। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যান। তাঁর সফরে আলোচনা হয়েছিল দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ঠিক হবে কীভাবে কর্মী নিয়োগ হবে, যা এখনও হয়নি। গত মাসে মন্ত্রী এবং উপদেষ্টার সফরে জানানো হয়, আগস্টের শেষ সপ্তাহে শ্রমবাজার খুলবে। এর মধ্যে মন্ত্রী গত শনিবার জানান, নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো নিয়মে কর্মী যাবে।
জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় থাকা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রকদের শর্তে রাজি না হলে শ্রমবাজার খোলা কঠিন। মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগে সরকার অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী দাতো আমিনুল ইসলাম বিন আবদুর নূর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ার নাগরিক। তিনিসহ প্রতিষ্ঠানটির আট কর্মকর্তা ২০২২ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে।
জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আমিন নূর সিন্ডিকেটের মূল হোতা। বাংলাদেশে তাঁর হয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন। সিআইডির তদন্তে তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে সরকার বা মন্ত্রী পরিবর্তন হলে ঢাকায় স্বপনের সহযোগী পরিবর্তন হয়। আগের দুবার আওয়ামী লীগ নেতাদের এজেন্সি কাজ পেয়েছিল। এবার বিএনপি নেতাদের সংশ্লিষ্ট অখ্যাত এজেন্সি কাজ পেয়েছে।
গত মাসে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী, রুহুল আমিন স্বপন নিয়ন্ত্রণ করেন বাংলাদেশে কোন এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার বেস্টিনেট কর্মী পাঠানোর কাজ দেবে। যদিও রুহুল আমিন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে গত মাসে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ক্যাথারসিসের লাইসেন্স বাতিল করেছে।
অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর চেয়ারপারসন ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, এখান তো লুকোচুরির কিছুই নেই। সবাই জানে, আমিন নূর মূল হোতা। তাঁর সহযোগী রুহুল আমিন স্বপন। তারা মালয়েশিয়ার উচ্চ পর্যায়ে, রাজপরিবারকে পর্যন্ত এই সিন্ডিকেটে শামিল করেছে। সবাই দুর্নীতির ভাগিদার। ফলে কেউ তাদের কিছু করতে পারে না। কর্মী পাঠাতে তাদের সিন্ডিকেট মেনে নেয়।
অতীতে শুধু বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগে এজেন্সি বাছাই হলেও এবার মালয়েশিয়া ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া, ফিলিপিন্সসহ আট দেশের ক্ষেত্রে এজেন্সি নির্ধারণ করা হয়েছে। তাসনিম সিদ্দিকী বলেছেন, এটি বাংলাদেশের সামনে সুযোগ। যদি এই দেশগুলো মিলে মালয়েশিয়াকে বলতে পারে, ‘এভাবে কর্মী পাঠব না’– তা একটি বড় চাপ হবে। তবে বাংলাদেশকে তা চাইতে হবে। এখানে যারা সিন্ডিকেটের সমর্থন আছে, তাদের উপেক্ষা করতে হবে।
নতুন চুক্তি না হওয়ায় অন্তত ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরোনো পদ্ধতিতে কর্মী যাবে। মালয়েশিয়া থেকে কোনো কর্মীর চাহিদাপত্র চূড়ান্ত হলে তা এফডব্লিউসিএমএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনুমোদিত এজেন্সির মধ্যে বণ্টন করা হয়। এর মাধ্যমে ভিসা কেনাবেচা, সিন্ডিকেটের চাঁদা নেওয়া হয়। এ পদ্ধতি বহাল থাকায় আগের দুর্নীতির সুযোগও থাকছে।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি পুরোনো পদ্ধতিতে ২৫ এজেন্সির কর্মী পাঠানোর খবরে প্রতিবাদ এবং উদ্বেগ জানিয়েছে। দল দুটি পৃথক বিবৃতিতে বলেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে আগের মতো দুর্নীতি না হয়। কোন প্রক্রিয়ায় এজেন্সি বাছাই করা হয়েছে, তা জানাতে হবে। তাদের অভিযোগ বর্তমান সরকারের একটি অংশ এই সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সমকাল