শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১২ অপরাহ্ন




মধ্যস্থতার ভূমিকায় কাতার

বন্দর থেকে ভোক্তা, নিত্যপণ্যের কেজিতে বাড়ে প্রায় ৫০ টাকা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ১০:১৫ am
LC এলসি container exports বন্দর আমদানি বাণিজ্য import trade trade Export Promotion Bureau EPB Export Market বাণিজ্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি export
file pic

বন্দর থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে একাধিক ধাপে। আমদানিকারক, বড় পাইকার, ছোট পাইকার এবং স্থানীয় ট্রেডিং হয়ে পণ্য যাচ্ছে খুচরা দোকানে। প্রতিটি হাত বদলে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি দাম। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে কোনো কোনো নিত্যপণ্যের কেজিতে ৪০-৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বন্দর, কাস্টমস, ডিপো, পরিবহন, গুদাম, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খরচের কথা বললেও ভোক্তা অধিকারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দামের এই ব্যবধান অস্বাভাবিক। বাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা ইচ্ছামতো মুনাফা করছেন। এতে দিনদিন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজার।

আন্তর্জাতিক বাজারের সবশেষ তথ্য তালিকা (কনসোলিডেটেড প্রাইসিং লেজার) অনুযায়ী, বাংলাদেশের আমদানিকারকরা বিভিন্ন দেশের ৯টি ভোগ্যপণ্য আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ছয়টি পণ্য সরাসরি চীন থেকে আমদানি করা হয়। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। বাংলাদেশে ভারতের সরু ডালের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

তালিকার তথ্যানুযায়ী, ভারতের বাজারে মসুর ডালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমান ডলারের হিসাবে প্রতি কেজি ১২৩ টাকা। এই দামের সঙ্গে পণ্যের মূল্য ও জাহাজ খরচ যুক্ত করে হিসাব করা হয়েছে। ডালটি দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়। অর্থাৎ বন্দর থেকে পাইকারি বাজারে আসতেই ডালের দাম বাড়ছে ২৫ টাকা। খুচরা বাজারে দাম আরো বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। জায়গা ও দোকানভেদে কোথাও কোথাও আরো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের দামের পার্থক্য প্রায় ৫০ টাকা। দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি।

একই ভাবে ছোলা, আদা, পেঁয়াজ, রসুনের দামেও আন্তর্জাতিক উৎস দামের সঙ্গে বিশাল পার্থক্য দেখা গেছে। চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে আদা ১৬০ টাকা এবং চীন থেকে আমদানি করা রসুন ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ছোলার ডাল ১২০, মটর ডাল ৮৫, মটর ৭৫ এবং মুগডাল ২০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

আমদানিকারকরা জানান, পণ্যের মূল্য ও জাহাজ ভাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিত্যপণ্য বাজারে নিতে টনপ্রতি প্রায় ৪,০০০ টাকা খরচ হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের দামও স্থির নয়। ডলারের মূল্য এবং চাহিদা অনুযায়ী বুকিংয়ের ওপর পণ্যের দাম ওঠানামা করে। অনেক পণ্য সীমান্ত দিয়ে আনতে হয়। তখন ১৩ টন পণ্য পরিবহনে ৩৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়, যা কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা।

বিভিন্ন ধরনের ডাল ও ছোলা আমদানি করেন মুক্তা স্টোরের স্বত্বাধিকারী মৃদুল কান্তি দাশ। তিনি বলেন, বন্দর থেকে পাইকার পর্যন্ত প্রতি কেজি পণ্য নিতে চার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে বন্দর, কাস্টমস, ইন্স্যুরেন্স ও পরিবহন খরচ রয়েছে। বুকিং রেট ও ডলারের দামের ওপরও পণ্যের মূল্য ওঠানামা করে। অনেক সময় বুকিং করা পণ্য দেরিতে আসায় বাজারে চাহিদা কমে যায়। তখন এটা আমাদের রেখে দিতে হয়। পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লোকসান গুনতে হয়। ব্যবসা সবসময় খাতা-কলমের হিসাব অনুযায়ী চলে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পাইকারি বিক্রেতারা জানান, আমদানিকারকদের কাছ থেকেই তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। বিদেশ থেকে আনা কাঁচা ডাল দেশের মিলে ভাঙানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিদ্যুৎ ও শ্রমিক খরচ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন এবং বিভিন্ন পয়েন্টে টোল ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়েছে।

খাতুনগঞ্জের শেখ মার্কেটে বিভিন্ন ধরনের ডাল ও ছোলা কমিশনে বিক্রি করে মেসার্স ডিএস ট্রেডিং। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রেতা রনি জানান, তারা কমিশনে পণ্য বিক্রি করেন। বেশি পণ্য বিক্রি করতে পারলে আমদানিকারকদের সঙ্গে লেনদেন বাড়ে। দাম বাড়ানো-কমানোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। পণ্যের দাম ভালো থাকলে একাধিক হাতবদল হয়, যাকে স্থানীয় ট্রেডিং বলা হয়। এতে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, তবে তা সবসময় হয় না।

চট্টগ্রামের ষোলশহরের মুদি দোকানি মোহাম্মদ আলম বলেন, পাইকারি আড়ত থেকে বস্তাপ্রতি ডাল কিনে বিক্রি করি। প্রতি বস্তায় পরিবহন খরচ, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতনসহ বিভিন্ন কারণে কিছুটা বাড়িয়ে বিক্রি করতে হয়। আর্দ্রতার কারণে অনেক সময় ডাল শুকিয়ে ওজন কমে, যা খুচরা মূল্যে সমন্বয় করতে হয়।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার কখনো স্থির থাকে না। কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে। বৈশ্বিক বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কারণে দাম পরিবর্তন হয়। এখানে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।

বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মধ্যে এই ব্যবধান কমাতে সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যবেক্ষণ ও বাজার তদারকি আরো জোরদার করা প্রয়োজন।

ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

ভোক্তা অধিকারসংশ্লিষ্টরা জানান, খাতুনগঞ্জে আমদানিকারক থেকে বড় পাইকার ও ছোট পাইকারের হাতে অন্তত দুই থেকে তিন দফা পণ্য হাতবদল হয়। ফলে একই পণ্যে একাধিকবার মুনাফা যুক্ত হয়। বন্দরে পণ্যের নির্দিষ্ট ‘ল্যান্ডেড কস্ট’ থাকলেও খাতুনগঞ্জে এসে এর সঙ্গে পরিবহন, গুদাম, ব্যাংকঋণ, ব্যবসায়িক খরচ ও মুনাফা যুক্ত হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর সময় আবার পরিবহন ও ব্যবসায়িক মুনাফা যোগ হয়। ভৌগোলিকম্যাপ ও গাইড অন্বেষণ করা

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, আমদানিকারকদের পণ্যভেদে খরচ নির্দিষ্ট আছে। এর বাইরে খরচ দেখানোর সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজার ও ভোক্তাপর্যায়ের দামের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, তা অস্বাভাবিক। খরচ ও মুনাফা যোগ করার পরও দাম আরো কম হওয়ার কথা। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও পরিবহন সংকটের কারণে বিভিন্ন রুটে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। তবে পরিবহন খরচ যতটা বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের কেজিপ্রতি দাম তার চেয়ে বেশি বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন খরচের অজুহাতে পণ্যের দাম কতটা বাড়ানো হচ্ছে, সেটিও আলাদাভাবে হিসাব করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সেলিম উদ্দিন বলেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশ এমনিতেই চাপে রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে নিত্যপণ্যের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে। এতে ভোক্তাদের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো উচিত।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD