শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন




জ্বালানি: গ্যাস সরবরাহ কমেছে বেড়েছে লোডশেডিং

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৫২ am
CNG stations CNG station fuel strike fuel trader traders Filing stations Filing station Petrol Octane Pump Price পেট্রোল অকটেন পাম্প Fuel energy জ্বালানি তেল Fuel Oil oil পরিবহন TRANSPORT STRIKE bus halt বাস ধর্মঘট dhaka তল্লাশিচৌকি ঢাকা বিএনপির গাবতলী ঢাকামুখী বাস যানবাহন তল্লাশি পুলিশ ঢাকা প্রবেশমুখ
file pic

এলএনজি কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই দেশে গ্যাস সরবরাহ আবার কমতে শুরু করেছে। গত পাঁচ দিনে আমদানি করা এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় সাত কোটি ঘনফুট। এতে আগে থেকেই চলা গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি।

শিল্পের সংকট সামলাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেল ও কয়লার ঘাটতি যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। বেড়েছে গরম। ফল হিসেবে গত কয়েক দিনে লোডশেডিং বেড়েই চলছে।

মূলত এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি লোডশেডিংও চলছে। বৃষ্টিতে বিদ্যুতের চাহিদা কমলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়, আবার গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বেড়ে যায়। এতদিন মূলত ঢাকার বাইরের গ্রাহকদের ওপরই এর চাপ ছিল। তবে ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকায়ও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। রাজধানীর কোনো এলাকায় দিনে একবার, সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা লোডশেডিং করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট দুপুর ২টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১৬১ কোটি ৬০ লাখ এবং এলএনজি ৭৬ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। পরদিন ২৬ আগস্ট দুপুর ১২টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে মোট ২৪১ কোটি এবং এলএনজি ৭৯ কোটি ঘনফুটে ওঠে। এর পর থেকেই আবার কমতে থাকে সরবরাহ। ২৭ আগস্ট বিকেল ৪টায় মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২৩৫ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি ৭৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে।

২৮ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় মোট গ্যাস সরবরাহ আরও কমে দাঁড়ায় ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ ছিল ১৬১ কোটি ৬০ লাখ এবং এলএনজি ৭২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ, ২৬ আগস্টের চেয়ে দুই দিনে মোট সরবরাহ কমেছে সাত কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। এলএনজি সরবরাহ কমেছে ছয় কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা সরকারি হিসাবে ৩৮০ কোটি ঘনফুট। খাত-সংশ্লিষ্টদের হিসাবে প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ কোটি ঘনফুট।

গ্যাস সরবরাহ আরও কমতে পারে
গ্যাস সরবরাহ কমার মধ্যেই সামনে প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। উচ্চমূল্য ও সরবরাহকারীদের কম সাড়ায় চাহিদা অনুযায়ী কার্গো সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে আগামী কয়েক দিনের দুটি কার্গোর সরবরাহ নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। ফলে বর্তমান সরবরাহ ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব কার্গো সময়মতো না এলে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে সংকট তীব্র হতে পারে।

মহেশখালীর সামিট ও এক্সিলারেটের দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ করা হয়। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। ঠিক হওয়ার পর কার্গো সংকটে টার্মিনালটি কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর ২২ আগস্ট একটি কার্গো আসায় পুনরায় সরবরাহ শুরু হয়।
আগস্টে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনার উদ্যোগ নেওয়া কয়েকটি কার্গো সময়মতো না আসায় গ্যাস সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হয়। গতকাল শুক্রবার এবং আগামী সোমবার দুটি কার্গো আসার শিডিউল ছিল; কিন্তু সেগুলো আসছে না। দরপত্রের মাধ্যমে কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও উচ্চমূল্য এবং সরবরাহকারীদের কম সাড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে গ্যাস সরবরাহ আরও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিল্পে উৎপাদন কমছে
গ্যাসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিল্পে। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যায়। কোথাও দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাচ্ছে, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টার বেশি কারখানা চালানো যাচ্ছে না।

গাজীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলে স্বাভাবিক সময়ে দিনে ১৭০ টন সুতা উৎপাদন হলেও গ্যাস-সংকটে তা নেমে এসেছে প্রায় ৩০ শতাংশে। এক মাসে কারখানাটির ক্ষতি হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। নরসিংদীর একটি বস্ত্রকল গ্যাসের অভাবে টানা ২২ দিন বন্ধ ছিল। নারায়ণগঞ্জের একটি ডাইং কারখানায় গত ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬৬০টি বস্ত্রকল জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০০ পোশাক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
শিল্পমালিকদের শঙ্কা, দীর্ঘদিন গ্যাসের চাপ কম থাকলে উৎপাদন ও রপ্তানি দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতা হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হবে।

সিএনজিতে ভোগান্তি
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনেও স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। কোথাও গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খাতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।

বাড়ছে লোডশেডিং
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও তা কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাশ্রয় হওয়া প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস শিল্পে দেওয়ার কথা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাস কম পাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের পাশাপাশি তেল ও কয়লার সংকটও চাপ বাড়াচ্ছে। ঘাটতি সামাল দিতে তেলচালিত কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা হলেও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বল্পতায় সব কেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহে ঘাটতি ছিল।
কয়লাভিত্তিক আট কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট হলেও বৃহস্পতিবার উৎপাদন হয়েছে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কম। পায়রার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে, মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে এবং বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিট ত্রুটির কারণে বন্ধ। কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আদানির কেন্দ্রও ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে। দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করছে।

বৃহস্পতিবার গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকটে ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে লোডশেডিংয়ের ধারাবাহিকতাও ঊর্ধ্বমুখী। ২৪ আগস্ট দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল এক হাজার ১৯৩ মেগাওয়াট। ২৫ আগস্ট বিকেল ৩টায় তা বেড়ে দুই হাজার ২৫৯ মেগাওয়াট হয়। ২৬ আগস্ট রাত ১২টায় ঘাটতি ছিল দুই হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। রাতেও ঘাটতি ছিল তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। রাত ১টায় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৭১ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল তিন হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় তিন হাজার ৯০ মেগাওয়াট ঘাটতি ছিল। গতকাল ভোর ৪টায় দুই হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট এবং সকাল ৬টায়ও লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট। গতকাল বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৪৮৩ মেগাওয়াট।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD