কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ ৩২ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান, ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম আহমেদ খান, তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এনবিআরের অধীন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল বা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
দ্রুত মামলা করার নির্দেশ দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের ১৪টি কর অঞ্চল ও ঢাকার বৃহৎ করদাতা ইউনিটকে (এলটিইউ) এ-সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সিআইসির অডিট ও তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট করদাতাদের আয়কর ফাঁকির সত্যতা পাওয়া গেছে। এনবিআরের অনুমোদনক্রমে এসব করদাতার বিরুদ্ধে কর ফাঁকি-সংক্রান্ত বিষয়ে দ্রুত ফৌজদারি মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তালিকাভুক্ত উল্লেখযোগ্য করদাতাদের মধ্যে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন মুহাম্মদ হারুন অর রশীদ, জাহাঙ্গীর আলম, সৈয়দা আরজুমান বানু ও আরিফা জেসমিন; যাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সাংবাদিকের মধ্যে রয়েছেন ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমদ।
উল্লিখিত এই ৯ জন ব্যক্তিকে পলিটিক্যাল এক্সপোজড পারসন (পিইপি) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পিইপি বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি সরকার, রাষ্ট্র বা সংস্থায় অত্যন্ত উচ্চপদস্থ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা অন্য পদে নিয়োজিত আছেন বা ছিলেন। কর ফাঁকি, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং বা ঘুষের মতো অপরাধের ঝুঁকি এড়াতে এ ধরনের ব্যক্তিদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়।
কর ফাঁকি দেওয়ার কারণে সাতজনের বিরুদ্ধে আয়কর আইনের ৩১২ ও ৩১৩ ধারায় মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন– নজরুল ইসলাম মজুমদার, মো. নূরুল আবছার, মো. জিয়াউর রহমান, মো. নূরুল আলম, নাসিরউদ্দীন মো. সেলিম, মোস্তাক মিয়া ও বিদারুল ইসলাম।
এনবিআরের সাবেক এক সদস্য বলেন, আয়কর আইনের ৩১২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির কর ফাঁকি শনাক্ত হলে তাঁকে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। তবে কারাদণ্ড কোনোমতে ছয় মাসের কম হবে না। এ ছাড়া ৩১৩ ধারা অনুযায়ী, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে কর ফাঁকি দিলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খানের পাশপাশি তাঁর পরিবারের সদস্য আনজুমান আজিজ খান, আয়েশা আজিজ খন্দকার, আজিজা আজিজ খান ও আদিবা আজিজ খানের বিরুদ্ধেও মামলা করতে বলা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন মোহাম্মাদ লতিফ খান, মোহাম্মাদ ফরিদ খান, জাফর উদ্দিন খান, মো. ফয়সাল করিম খান, সালমান ফজলুর রহমান, এ এস এফ রহমান, মেজর (অব.) সাইফুল আলম, ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম আহমেদ খান, মো. শাহরিয়ার আলম ও শামীম আরা জাহান।
সূত্র জানায়, কর ফাঁকির দায়ে বিভিন্ন কর অঞ্চলের এসব করদাতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের উদ্দেশ্যে তাদের নথি সুপারিশের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য ও নথি অনুযায়ী ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ বিভিন্ন কর অঞ্চলের একাধিক সার্কেলের অধীনে থাকা এসব করদাতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুপারিশকৃত তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম ও টিআইএন নম্বর উল্লেখ রয়েছে। কর ফাঁকি-সংক্রান্ত বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। সমকাল