রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১১ অপরাহ্ন




জানুয়ারির ১৩০৬ টাকার এলপিজি অক্টোবরে হলো ১৮৩৭ টাকা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:০৮ pm
Cylinder Liquefied petroleum gas LPG এলপিজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস সিলিন্ডার
file pic

চলতি বছরের ১০ মাসে দেশের বাজারে বোতলজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম চারবার কমে বেড়েছে পাঁচবার। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সর্বনিম্ন ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। সর্বোচ্চ ওঠে ১ হাজার ৯৪০ টাকা পর্যন্ত।

১০ মাসে সর্বনিম্ন ও দামের সর্বোচ্চ ব্যবধান ছিল ৬৩৪ টাকা। জানুয়ারির তুলনায় অক্টোবরে দাম বাড়তি ৫৩১ টাকা বা প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র দেখা যায়।

বিইআরসির তথ্য বলছে, বছরের শুরুর মাস জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা ৫০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা হয়। মার্চে কিছুটা কমে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এরপর এপ্রিল থেকে বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়। ওই মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭২৮ টাকা।

মে মাসে দাম আরও ২১২ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা হয়, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নির্ধারিত দাম। অর্থাৎ, জানুয়ারির তুলনায় মে মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম বেড়েছিল ৬৩৪ টাকা বা প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

তবে মে মাসের পর থেকে টানা কয়েক মাসে দাম কমতে থাকে। জুনে ৫৫ টাকা কমে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৮৫ টাকা। জুলাইয়ে বড় ধরনের পতন হয়ে দাম ৩৫৭ টাকা কমে ১ হাজার ৫২৮ টাকায় নেমে আসে। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এরপর অক্টোবর মাসে আবার এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হলো। চলতি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরের দাম ২৫২ টাকা বেশি এবং জুলাইয়ের সবশেষ বড় দরপতনের পর মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৩০৯ টাকা।

মাসভিত্তিক দামের চিত্র
দাম ওঠা-নামার হিসাব বলছে, বছরের প্রথম তিন মাসে এলপিজির দাম মোটামুটি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকার মধ্যে ছিল। কিন্তু এপ্রিল ও মে মাসে টানা দুই দফা বড় মূল্যবৃদ্ধিতে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। মাত্র দুই মাসে জানুয়ারির তুলনায় দাম ৬৩৪ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।

এরপর জুন ও জুলাইয়ে দাম কমলেও আগস্ট থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে অক্টোবরের ২৫২ টাকা বৃদ্ধির কারণে বছরের শুরুতে যে তুলনামূলক কম দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছিল, তার সঙ্গে বর্তমান দামের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

চলতি বছরের এলপিজি দামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত ওঠা-নামা। মে মাসে ১ হাজার ৯৪০ টাকা থেকে জুলাইয়ে দাম নেমে আসে ১ হাজার ৫২৮ টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র দুই মাসে ৪১২ টাকা বা প্রায় ২১ দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়।

কিন্তু জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। আগস্ট ও অক্টোবরে দুই দফা বৃদ্ধির ফলে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫২৮ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ তিন মাসে দাম বেড়েছে ৩০৯ টাকা বা প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ।

এলপিজির বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়ির রান্নার খরচে। বিশেষ করে যেসব পরিবার পাইপলাইনের গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না পাওয়ায় নিয়মিত বোতলজাত এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক ব্যয়ে এর প্রভাব আরও বেশি। আবার সরকার নির্ধারিত যে দাম, সে দামে প্রায় কখনোই বাজারে এলপিজি মেলে না। গ্রাহককে এক-দুইশ টাকা বেশি দিয়েই কিনতে হয়। রোববার (৪ অক্টোবর) দাম বাড়ানোর আগ পর্যন্ত বাজারে ১২ কেজির এলপিজি কোথাও কোথাও ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা যায়। এই দামেও বাজারে মিলছিল না গ্যাস।

জানুয়ারির তুলনায় এখন বাড়তি ৫৩১ টাকা
অক্টোবরে ১২ কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। জানুয়ারিতে এই দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। অর্থাৎ, ১০ মাসে দাম বেড়েছে ৫৩১ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ।

চলতি বছরের সর্বোচ্চ দাম মে মাসের ১ হাজার ৯৪০ টাকা। সেই দামের তুলনায় অক্টোবরে দাম ১০৩ টাকা কম। তবে জুলাইয়ের সর্বনিম্ন ১ হাজার ৫২৮ টাকার তুলনায় অক্টোবরের দাম ৩০৯ টাকা বেশি। অর্থাৎ, বছরের শুরুতে এলপিজির দাম তুলনামূলক কম থাকলেও এপ্রিল-মে মাসে বড় উল্লম্ফন, জুন-জুলাইয়ে পতন এবং আগস্ট-অক্টোবরে আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার মধ্য দিয়ে ভোক্তাদের জন্য দামের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এমন অবস্থায় এলপিজি ব্যবহারকারী ভোক্তাদের প্রশ্ন- আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের দাম, সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সৌদি সিপি), পরিবহন ব্যয় ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করা হলেও বাজারে সেই দামের বাস্তব প্রতিফলন কতটা হচ্ছে? একই সঙ্গে নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারে প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যও ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বেশ কিছুদিন ধরে সারাদেশে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে এলপিজি। গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থাকলেও ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।

কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণা বিইআরসির
তবে এবার কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। রোববার সকালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা গতকাল শনিবারও অফিস করেছি। ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। তারা সেপ্টেম্বরে কী পরিমাণ এলপিজি বিক্রি করেছে জানতে চেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মিনিস্ট্রি কাজ করছে। জেলা পর্যায় পর্যন্ত তদারকি করা হচ্ছে। আজ নতুন দাম ঘোষণার পর আরও কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।’

জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে: ক্যাব
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘পুরোপুরি একটা জোচ্চুরি চলছে। আজকের ২৫২ টাকা দাম বাড়ানোর জন্য গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মার্কেট অস্থির করে রাখা হয়েছে। বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে দামটা বাড়ালো। এখন কোন যুক্তিতে এই দাম বাড়ানো হলো। ফ্রেইট (জাহাজ ভাড়া) কি বেড়েছে! পুরো অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দাম বাড়ানো হলো।’

ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘সরকার ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে, ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো লুটপাট শুরু করে দিয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে এক হাজার টাকা বেশি দিলে সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ কি বেড়েছে? বাড়েনি। তাহলে এসব গোডাউনের কয়টা সিলগালা করা হয়েছে, কতজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে? সরকার যদি এগুলো নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, জনগণের যদি এভাবে পকেট কাটা যায় তাহলে সরকার জনবান্ধব কি না সে প্রশ্ন থেকে যাবে।’ জাগো নিউজ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD