মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৮:২৯ পূর্বাহ্ন




মরক্কোর ফুটবলের পেছনের গল্প

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২২ ৮:১০ pm
Morocco Rabat মরক্কো রাবাত FIFA football World Cup Qatar কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল Stadium FIFA football World Cup Qatar কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল স্টেডিয়াম
file pic

২০০৭ সালে কিং মোহামেদ দ্য সিক্সথ ফুটবল একাডেমি কাজ শুরু করে মরক্কোর সালে শহরে। যেটার জন্য ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড (দেড় শ কোটি টাকা প্রায়) অর্থায়ন করা হয় রাজার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। একাডেমির উদ্দেশ্য ছিল ১২ থেকে ১৮ বছরের খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করা ও পরিচর্যা করা।

মরক্কোর ফুটবল ঐতিহ্য নতুন নয়। ১৯৭৬ সালের আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের শিরোপা জিতেছে দলটি। রয়েছে দুটো আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। আর বিশ্বকাপে ১৯৮৬ সালে নকআউটে পৌঁছে দেশজুড়ে উন্মাদনার জন্ম দেয় উত্তর আফ্রিকার দলটি।

৩৬ বছর পর মরক্কোর বর্তমান প্রজন্ম ছাড়িয়ে গেছে আগের সব সাফল্যকে। আশরাফ হাকিমি, ইউসেফ এল-নেসিরি ও হাকিম জিয়েশরা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে প্রমাণ করেছে তারা বিশ্বের সেরা ৪ দলের একটি।

‘অ্যাটলাস লায়নস’ খ্যাত দলটির এই সাফল্য শুধু আফ্রিকাকেই নয় উদ্বেলিত করেছে পুরো আরব বিশ্বকে। নিরপেক্ষ দর্শকরা জয়ধ্বনি দিচ্ছেন মরক্কানদের হয়ে।

মরক্কোর সাফল্য নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভি কথা বলেছে দলটির সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ওসিয়ান রবার্টসের সঙ্গে। রবার্টসের মতে, মরক্কোর সাফল্য যাত্রার কেবল শুরু।

তিনি বলেন, ‘এই প্রজন্ম সাফল্যের তালিকার শীর্ষে পৌঁছে যাবে। মরক্কোর ফুটবল ইতিহাসে তারা এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। পরের প্রজন্মকে তারা অনুপ্রেরণা জোগাবে।’

ইউরোপে জন্ম নেয়া খেলোয়াড় যাদের পূর্বপুরুষ মরক্কোর তাদের বেশ বড় একটা ভূমিকা রয়েছে দলের এই সাফল্যে। তবে দলটির শিকড় রয়েছে মরক্কোতেই।

২০০৭ সালে কিং মোহামেদ দ্য সিক্সথ ফুটবল একাডেমি কাজ শুরু করে মরক্কোর সালে শহরে। যেটার জন্য ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড (দেড় শ কোটি টাকা প্রায়) অর্থায়ন করা হয় রাজার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। একাডেমির উদ্দেশ্য ছিল ১২ থেকে ১৮ বছরের খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করা ও পরিচর্যা করা।

রবার্টসের মতে, এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা একাডেমি। মরক্কোর যে দলটি পর্তুগালকে কোয়ার্টার ফাইনালে হারিয়েছে সেখানে একাডেমির ৩ জন খেলোয়াড় ছিলেন। ইউসেফ এল-নেসিরি, এজেদিন ওনাহি ও নায়েফ আকরাদ।

সালের একাডেমিতে ফিফা স্ট্যান্ডার্ডের ৮টি মাঠ, রেস্তোরাঁ, ইনডোর ভেন্যু ও অন্যান্য সর্বাধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে খেলোয়াড়দের জন্য।

ব্যালনেওথেরাপি পুল বা রিকভারি পুল, ফিজিওথেরাপি সেল ও গোলকিপারদের জন্য রয়েছে আলাদা অনুশীলনের জায়গা। ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দন্ত চিকিৎসক রয়েছেন খেলোয়াড়দের পরিচর্যায়। একই সঙ্গে ৬০ খেলোয়াড়ের জন্য ১১টি শ্রেণিকক্ষ-সংবলিত একটি বোর্ডিং স্কুলও রয়েছে।

রবার্টসের মতে, মরক্কো ফুটবল দল তার ইতিহাসের সেরা সময় পার করছে।

তিনি যোগ করেন, ‘মরক্কোর সবাই ফুটবল খেলে। স্কুল, বিচ কিংবা খোলা মাঠ সবখানেই ফুটবল খেলা চলে। এখানে ফুটবল প্রতিভার কমতি নেই। ওখানে আমার কাজ করার অন্যতম কারণ ছিল এটা। ওদের যে প্রতিভা রয়েছে তাতে আমার সবসময় মনে হয়েছে তাদের বিশ্বের সেরা ২০ দলের মধ্যে থাকা উচিত। আমাকে যদি কেউ দুই-তিন বছর আগে জিজ্ঞেস করত যে মরক্কো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলবে কি না, আমি সেটা বিশ্বাস করতাম না।’

সালের এই একাডেমির ভূমিকা ২০১৮ বিশ্বকাপে দেখা গিয়েছিল প্রথম। একাডেমির খেলোয়াড় রেদা তাগনাউতি ও হামজা মেনদিল সেবার স্কোয়াডে ছিলেন।

মরক্কোর ফুটবল বিশ্লেষক বেনজামিন হাজি বলেন, ‘২০১৩ সালে প্রথম ব্যাচ তৈরি হবার পর ২০১৮ সালে একাডেমির তিনজন খেলোয়াড় বিশ্বকাপের স্কোয়াডে ছিলেন। বিষয়টা দুর্দান্ত। গত গ্রীষ্মে একাডেমির সাতজন খেলোয়াড় স্প্যানিশ ও ফ্রেঞ্চ লিগে জিরোনা, এসপানিওল ও রেঁনের মতো ক্লাবে সুযোগ পেয়েছেন।’

একাডেমি নিয়ে বেশ কিছু স্থানীয় ক্লাবের আপত্তিও রয়েছে বলে জানান হাজিজি। তাদের দাবি যুবদলগুলোতে ক্লাবের চেয়ে একাডেমির খেলোয়াড়দের প্রাধান্য দেয় জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন।

তবে, অভিযোগটি সঠিক নয়। রয়্যাল মরক্কান ফুটবল ফেডারেশন (এফএমআরএফ) বিভিন্ন দেশের লিগে খেলা খেলোয়াড়দের দিকে নজর রাখে। মরক্কোর এবারের ২৬ জনের বিশ্বকাপ দলে ১৪ জন খেলোয়াড় দেশের বাইরে জন্মেছেন।

ফেডারেশন নেদারল্যান্ডস, স্পেন, ওয়েলস ও ইংল্যান্ডের একাডেমিতে স্কাউট রেখেছে। দলের সেরা খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করেছেন তারা। হাকিম জিয়েশ, সোফিয়ান আমরাবাত (নেদারল্যান্ডস), আশরাফ হাকিমি (স্পেন), রোমাইন সাইস ও সোফিয়ান বুফালের (ফ্রান্স) মতো খেলোয়াড়রা এই স্কাউটিং সিস্টেমেরই ফসল।

রবার্টস ওয়েলসের স্কাউটিং টিমের অংশ ছিলেন। তিনি যোগ করেন, ‘ওয়েলসের অনেক খেলোয়াড় ইংল্যান্ডের একাডেমিতে বেড়ে উঠছেন। মরক্কোর সুবিধা হলো তাদের খেলোয়াড়সংখ্যা। শুধু স্পেনেই মরক্কোর চার শর বেশি তরুণ খেলোয়াড় রয়েছেন। মরক্কোর স্কাউটিংয়ের ঘরোয়া ও ইউরোপীয় দুটি বিভাগ রয়েছে। হাকিমি যখন ১২-১২ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমিতে ছিলেন তখনই তারা তাকে চিহ্নিত করেছে।

‘কিশোর বয়সে খেলোয়াড়রা জাতীয় যুবদলের সঙ্গে যুক্ত হন। তাদের আন্তর্জাতিক মানে উন্নত করা হয় ও মরক্কো ফুটবল পরিবারের একটা অংশ হিসেবে বরণ করে নেয়া হয়।’

ফুটবলের উন্নয়নে দেশটির শাসকদের বড় ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে টানা তিন ম্যাচ হেরে বিদায় নেয়ার পর, ফেডারেশনের বড় কর্তাদের বরখাস্ত করেন কিং হাসান দ্য সেকেন্ড।

খেলার মাঠেই শুধু নয় রাজনীতির মাঠেও মরক্কোর জয় সুফল বয়ে এনেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহামেদ মরক্কোর বিশ্বকাপ সাফল্যের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহামেদ আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন। এমন সময়ে তার দেশের সাফল্যকে পুরো আফ্রিকা নিজেদের সাফল্য মনে করছে। মোহামেদ ফিলিস্তিনেরও সমর্থক। মরক্কোর বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় ফিলিস্তিনের পতাকাও উড়িয়েছেন ম্যাচ শেষে।

এক কথায় মরক্কো ফুটবলের চেহারা পাল্টে গেছে। নারী দল বিপুল পরিমাণ তহবিল পেয়েছে ও আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নস লিগে দুর্দান্ত খেলেছেন দেশটির নারী ফুটবলাররা। রবার্টসের মতে, মরক্কো দলটি আফ্রিকার চেয়ে ইউরোপের দলগুলোর বিপক্ষে ভালো খেলবে।

তাদের ডিফেন্সও দারুণ। বিশ্বকাপে কানাডার বিপক্ষে মাত্র একটি আত্মঘাতী গোল ঢুকেছে তাদের জালে। রবার্টস মনে করেন দেশটির ফুটবল আমূল পাল্টে গেছে।

তিনি যোগ করেন, ‘তাদের এখন একটা লক্ষ্য রয়েছে। তারা অদম্য স্পিরিট নিয়ে খেলে ও দেশের জন্য তারা গর্বিত। মরক্কো এখন সবার দ্বিতীয় প্রিয় দল। তারা আন্ডারডগ, আবেগপ্রবণ ও উজ্জীবিত।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD