শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন




রাজউকের অনুমতি ছাড়া নির্মাণ ৯৫% ভবন

আউটলুকবাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৮ মে, ২০২৩ ৬:৩৮ pm
Rajdhani Unnayan Kartripakkha RAJUK রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক
file pic

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকায় প্রতিবছর প্রায় ৯৫ হাজার ভবন নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে বছরে গড়ে ৪ হাজারের বেশি ভবন নির্মাণে নকশার অনুমোদন নেয়া হয়। আর ৯০ হাজারের বেশি ভবনই অনুমোদনহীনভাবে নির্মাণ করা হয়। অর্থাৎ ৯৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ ভবনই অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়। যারা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদনের শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে, তাদের জরিমানার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক। গত ৩ মে রাজউক ভবনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অনুমোদনহীন ও বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত ভবন মালিকদের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ঢাকা মহানগর এলাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ড্যাপের আওতাধীন এলাকায় অবৈধ ভবন, নির্মাণ বিধিমালা অমান্য করে ভবন নির্মাণকারীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় ও অবৈধ ভবন অপসারণ প্রক্রিয়া কী হবে, তা নির্ধারণ করতে রাজউক চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি এ-সংক্রান্ত একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করবে। বিষয়টি নিয়ে গত ৩ মে রাজউকের সভাকক্ষে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিয়ার সভাপতিত্বে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ঢাকা মহানগরীয় এলাকার যেসব ভবন পুরোনো আছে সেগুলোর অ্যাসেসমেন্ট করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অ্যাসেসমেন্টের সময় ভবনের ভূমিকম্প ঝুঁকি, অগ্নিঝুঁকি, সেট-ব্যাকসহ অন্য বিষয়গুলো দেখা হবে। অ্যাসেসমেন্টে যেসব ভবন সঠিক পাওয়া যাবে, সেগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হবে। আর যেগুলো ত্রুটি-বিচ্যুতি ও বিধিমালা অমান্য করে নির্মাণের তথ্য পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বৈঠকে বিদ্যমান ভবনের অ্যাসেসমেন্ট ও নতুন ভবনের স্ট্রাকচারাল নকশার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আর এসব কাজ করতে হলে একটি নীতিমালা দরকার, এখন সেই নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি কাজ করছে।

রাজউকের তথ্যমতে, ঢাকা মহানগর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২-২০৩৫-এর প্রজ্ঞাপন গত বছরের ২৩ আগস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। রাজউক প্রণীত ড্যাপে ১৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প এলাকাসহ কৃষি, জলাশয়, বনাঞ্চল, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, স্কুল-কলেজ নির্মাণ, যোগাযোগ, বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এর মধ্যে অনুমোদনহীন ইমারত ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও রয়েছে।

ড্যাপের প্রতিবেদনে অনুমোদনহীন ইমারত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ড্যাপ ২০২২-৩৫-এর আওতায় ভৌত জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৬ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে স্থাপনার সংখ্যা বেড়েছে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর ৯৫ হাজার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে নকশা অনুমোদনের হার ৪ হাজার ১৭৫টি। অর্থাৎ গড়ে ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভবন রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি ৯৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ড্যাপের আওতাভুক্ত এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে হলে রাজউকের অনুমোদন নিতে হয়। ড্যাপের আওতাধীন এলাকায় ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন রয়েছে। যার অধিকাংশ ইমারত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদনের শর্ত অমান্য করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আইন না মানা, জনসচেতনতা অভাব ও কর্তৃপক্ষের নিয়োজিত প্রকৌশলী-স্থপতিদের মনিটরিংয়ের অভাব।

প্রণীত ড্যাপে ভবন নির্মাণে তিন ধরনের অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে—অনেক ভবন নির্মাণে নকশার অনুমোদন নেওয়া হয়নি, কিন্তু ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও বিএনবিসি কোর্ড মেনে নির্মাণ হয়েছে। দ্বিতীয়টি—অনেক ভবন নির্মাণে কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, কিন্তু নির্মাণকালে অনুমোদনের শর্তের ব্যত্যয় করা হয়েছে। আর তৃতীয়টি হচ্ছে—অনেক ভবন নির্মাণে অনুমোদন নেওয়া হয়নি, আবার নির্মাণকালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ব্যত্যয় করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রথম অনিয়মের বিষয়ে বলা হয়েছে—প্রথমে এ শ্রেণির ভবন অ্যাসেসমেন্ট করে চিহ্নিত করতে হবে। তাদের ইমারত নির্মাণ অনুমোদন নিতে যে পরিমাণ ফিস জমা দিতে হতো তার ১০ গুণ কর্তৃপক্ষ বরাবর জমা দিয়ে অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় অনিয়মের বিষয়ে বলা হয়েছে—যেসব ভবন ইমারত কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন নিলেও অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ করে নির্মাণ করেছে সেসব ভবনের উচ্চতা, সেট ব্যাক লঙ্ঘনের ওপর ভিত্তি করে জরিমানা করা হবে। এই জরিমানার আদায়ের মাধ্যমে ভবনের বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। অবৈধভাবে ভবন নির্মাণকে নিরুৎসাহিত করতে জরিমানা আরোপ করা হবে।

আর তৃতীয় অনিয়মের বিষয়ে বলা হয়—যেসব ভবন নির্মাণে কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি, আবার ইমারত বিধিমালা না মেনে নির্মাণ করা হয়েছে, সেসব ভবন চিহ্নিত করে অনুমোদন নিতে যে পরিমাণ ফি প্রয়োজন তার ১০ গুণ জরিমানা করা হবে। এরপর সেট-ব্যাক ও উচ্চতার ভিত্তিতে জরিমানা আরোপ করা হবে।

প্রতিবেদনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনিয়মকারী প্রতিটি বাড়ি মালিককে জরিমানা আদায়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। কোনো বাড়ি মালিক যদি আরোপিত জরিমানা দিতে না চায়, তাহলে কর্তৃপক্ষ সেসব অবৈধ ঘরবাড়ি বা ইমারতের লঙ্ঘিত অংশ ভেঙে ফেলতে পারবে। যতদিন পর্যন্ত ইমরাতের ব্যত্যয়কৃত অংশ অপসারিত না হয় ততদিন পর্যন্ত নির্ধারিত পরিমাণ জরিমানা প্রতি মাসে কর্তৃপক্ষ বরাবর জমা দিতে হবে। তবে কাঁচা বা একতলা ভবনের জন্য জরিমানা আরোপ হবে না। কোনো বাড়ি মালিক যদি ৬ মাসের মধ্যে নিজে ইমারতের অবৈধ অংশ অপসারণ করে তাহলে তার ক্ষেত্রেও জরিমানা প্রযোজ্য হবে না। জরিমানার পরিমাণ কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেছেন, প্রণীত ড্যাপ ২০২২-৩৫-এর এ প্রস্তাবনাটি পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য খুবই ভালো প্রস্তাব। এটি বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশ্বের অনেক দেশে নির্মাণ বিধিমালা অমান্য করে ভবন নির্মাণ করলে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিককে বিপুল পরিমাণ জরিমানা দিতে হয়। আমাদের দেশে যারা নির্মাণ বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে, তাদের এ পরিমাণ জরিমানা করা দরকার, যা দেখে অন্য কোনো মালিক বিধিমালা অমান্য করে ভবন নির্মাণে আগ্রহ না দেখায়।

রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম বলেছেন, একটি ভবন পরীক্ষার মাধ্যমে দেখতে হবে তার মধ্যে রড, সিমেন্ট ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ঠিক আছে কি না। যদি সব ঠিক থাকে তাহলে অনুমোদন দেওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের এখন যেসব ভবন আছে তার অ্যাসেসমেন্ট করতে যে পরিমাণ দক্ষ জনবল ও যন্ত্রপাতি দরকার, সেটি নেই




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD