হাওরে ফসল ডুবে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ডুবে যাওয়া পচা ধান তুলে বিপদে পড়েছেন কেউ কেউ। না পারছেন ফেলতে, না পারছেন চারা ওঠা ধান শুকাতে।
সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বর্গাচাষীরা। চুক্তি অনুযায়ী মালিককে ধান দেওয়া, আবাদের জন্য নেওয়া ঋণের টাকা পরিশোধ করা, সারা বছর সংসার নিয়ে বেঁচে থাকার চিন্তায় পড়েছেন তারা। হাওরজুড়ে এমন বিপর্যয় দেখা দিলেও কৃষি বিভাগ বলছে, ৫০ হাজার টন ধানের ক্ষতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে দেখার হাওরের গুয়াছুড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, কনকনে বাতাসের মধ্যেই পানিতে ধান কাটছেন শ্রমিক। তাদের সকলেরই মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত পলিথিনে মোড়ানো। একটু দূরে দাঁড়ানো কৃষক রইছ মিয়ার চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার চাপ। শ্রমিকদের দেখিয়ে দিচ্ছিলেন কোমর সমান পানিতে ধানের ছড়া ভেসে থাকা জমি।
তিনি বলেন, দেড় লাখ টাকা ঋণ করে এবার আবাদ করেছি। দুশ্চিন্তা এখন তিন ধরনের। চুক্তি অনুযায়ী মালিকের ধান দেওয়া, আবাদের খরচের ঋণ মেটানো এবং সারা বছর খেয়ে বেঁচে থাকা।
বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক কমর আলী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘কেমনে চলমু পুরুত্তাইনরে লইয়া।’
হাওরে এমন অবস্থায় কৃষি বিভাগ বলছে, বুধবার বিকেল পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতি হয়েছে। এই হিসেবে ৫০ হাজার টন ধানে ক্ষতি ২০০ কোটি টাকারও কম।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, উজানের পানিতে নদীর পানি বেড়েছে। হাওরের এই পানি কমতে এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
গত চার দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে থেকে আসা ঢলে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের বিভিন্ন হাওরের পাকা ধান ডুবে গেছে। ফলে হাওরজুড়ে কৃষকদের মধ্যে হাহাকার দেখা গেছে।
নলুয়ার হাওরের দাসনোওয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরন দাস জানান, তিনি ১৬ কেদার জমি আবাদ করেছিলেন। মাত্র এক কেদার জমির ফসল তুলতে পেরেছেন। গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে গেছে। কৃষি শ্রমিক সংকট থাকায় তিনি অনেক চেষ্টা করেও ফসল ঘরে আনতে পারেননি।
তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেল। বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার। ধারদেনা করে জমি আবাদ করেছিলাম। এখন সারাবছর কীভাবে চলব?’
কথা হয় সাবেক চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রনধির দাস নান্টুর সঙ্গে। তিনি জানান, নলুয়ার হাওরের অধিকাংশ জমির ফসল তুলতে পারেননি কৃষকরা। শুরুতেই জলাবদ্ধতা, শ্রমিক সংকট ভুগতে হয়। গত দুই দিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলের সব জমি তলিয়ে গেছে। ধারণা কমপক্ষে দেড়-দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
নলুয়ার হাওরের কৃষক এখলাছ মিয়া, মধু মিয়া, গৌরাঙ্গ দাস, হরিন্দ্র দাস বৃষ্টিতে তাদের ফসল তলিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, পানি নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা না থাকায় ভারী বৃষ্টিতে ফসল ডুবে গেছে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ এবার মরণফাঁদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
এ দিকে অতিবৃষ্টিতে জগন্নাথপুরের মইয়া ও পিংলার হাওরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে আধা-পাকা ধান ডুবে যাচ্ছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, নলুয়ার হাওরের ৫০ ভাগ জমির ধান কাটা শেষ। জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে বহু কৃষক ধান তুলতে বেগ পাচ্ছেন। এরই মধ্যে টানা বৃষ্টিতে ফসলের কিছু ক্ষতি করছে। তবে এখনই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বলা যাচ্ছে না। নৌকা দিয়ে ধান তোলার চেষ্টা চলছে। এ বছর জগন্নাথপুর উপজেলায় ২০ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।