ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলছে। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না এডিস মশাবাহী রোগটির সংক্রমণ। তিন দিন ধরে হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৩৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ৫ জন। বুধবার ভর্তি হন ১ হাজার ২৪৬ জন।
ওইদিনও ৫ জন মারা যান। সবমিলিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭ হাজার ৩৮২ জন এবং মারা গেছেন ৯৩ জন। যা বিগত কয়েক বছরে একই সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এমন প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিএনপি সমর্থক চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)।
সংগঠনটি সারা দেশে সমন্বিত উদ্যোগে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রান্তদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ঢাকার দুই সিটির মেয়য়ের পদত্যাগ দাবি করে সংগঠনটি।
এদিকে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতিতে সরকারি সব হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু কর্নার এবং মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ওয়ার্ড চালুর নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
দেশজুড়ে ডেঙ্গু ভাইরাসের নাজুক পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ড্যাব। এ সময় ড্যাবের নেতারা বলেন, তিন দিন ধরে দেশের হাসপাতালগুলোতে হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর ঠাঁই মিলছে না। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। তৈরি হচ্ছে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। এমন বাস্তবতায় ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা দেওয়া উচিত।
ড্যাব সভাপতি ডা. হারুন আল রশিদ বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ঢাকার দুই মেয়রের পদত্যাগ করা উচিত। তারা যেভাবে জরিমানা করছেন, সেটি নিজের দায় অপরের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা। তবে ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সংগঠন হিসাবে ড্যাবের কিছু কর্মসূচি থাকবে।
ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. আবদুস সালাম বলেন, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাব থেকে অনেক বেশি। অন্যান্য সব বিষয়ের মতো ডেঙ্গু মহামারির সময়েও সরকার তথ্য নিয়ে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও ছোট-বড় অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও অনেক রোগী। যেসব ক্লিনিক বা হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তথ্য পাঠায় না, সেই রোগীদের হিসাব ডেঙ্গু পরিসংখ্যানে যুক্ত হয় না।
সংবাদ সম্মেলনে তারা আরও বলেন, ডেঙ্গুর দ্রুত সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিতে ঢাকা শহরে কয়েকটি ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা যেতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে তাদের পরামর্শে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এদিকে বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সরকারি সব হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সেগুলোতে পৃথক ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে। মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে দুটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ে সরকারি সব হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা ফি ১০০ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা শহরে ক্রমবর্ধমান ডেঙ্গু রোগীর সেবা নিশ্চিত করতে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালের ৮০০ শয্যা নিয়ে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতাল ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। জরুরি প্রয়োজনে স্বাস্থ্যসেবা পেতে ১৬২৬৩ হটলাইন সেবা চালু রয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ১২৩৯ জন, মৃত্যু ৫ : ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ২৩৯ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ডেঙ্গুতে পাঁচজন মারা গেছেন। নতুন ভর্তি রোগীর ৭৫৬ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ঢাকার বাইরে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৩৬১ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে সারা দেশে সর্বমোট ৪ হাজার ৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ৭০৮ জন এবং ঢাকার বাইরে সারা দেশে ১ হাজার ৩৬১ জন।