বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়ায় হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে। বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে নতুন অটোমেশন ভর্তি চালু হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। সরকারি মেডিকেল কলেজের মতো এ বছর প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে অটোমেশন চালু করায় বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। এতে তারা হতাশ ও সংক্ষুব্ধ। নতুন নীতির কারণে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চট্টগ্রাম শহরের ভর্তিচ্ছু একজন শিক্ষার্থী। তার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হবেন। কিন্তু দূরবর্তী জেলার একটি সরকারি মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় মেয়েকে নিজ এলাকার কোনো প্রাইভেট মেডিকেলে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তার বাবা। কিন্তু নতুন অটোমেশন পদ্ধতি চালুর কারণে তাদের এই সিদ্ধান্ত আর কাজে আসছে না। অধিদপ্তর মোবাইল বার্তার মাধ্যমে দূরের একটি জেলার মেডিকেল কলেজে ভর্তির তথ্য জানায়। অতিরিক্ত খরচ ও আবাসনের বিষয় চিন্তা করে ওই শিক্ষার্থী আর মেডিকেলে ভর্তি হতে পারেননি।
ওই অভিভাবক জানান, বিষয়টি আগে জানতে পারলে তার মেয়ে সরকারি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ হাতছাড়া করতো না। কিন্তু এখন তার মেডিকেলে পড়ার স্বপ্নই শেষ হয়ে গেছে।
বিএমডিসি’র দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী হুট করে চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের বলি হয়েছে ওই শিক্ষার্থীর মতো আরও অনেকে। এমন পরিস্থিতি এবার অনেক কলেজে এখনো অনেক সিট খালি পড়ে আছে। এমন কী বিনা খরচের সিট পূরণ হয়নি কোথাও কোথাও।
সূত্র মতে, নতুন ভর্তি পদ্ধতির কারণে অসচ্ছল ও মেধাবীদের ৮১ আসন এখন শূন্য। এবার উত্তীর্ণ হওয়া ৪৯ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৬ হাজার ৬০০ জন মেডিকেলে পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এরমধ্যে ১ হাজার ৬০০ অসচ্ছল ও মেধাবী। ডেন্টালের অবস্থা আরও ভয়াবহ, যেখানে ১৫০০ সিটের বিপরীতে মাত্র ৫০০ জন আবেদন করেছে।
উল্লেখ্য, আগে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো বাছাই করে পছন্দের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতো। চলতি বছর এই সুযোগ রহিত করে নতুন অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়। এবার প্রথমে শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য পাঁচটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পছন্দক্রম রাখা হয়। পরে এই নিয়ম বদলে ফেলে ছাত্রদের জন্য ৬০টি এবং ছাত্রীদের জন্য ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের তালিকা করা হয়।
নতুন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী আবেদনের পর একটি নির্দিষ্ট মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে তাকে জানানো হয়। ওই কলেজে ভর্তি হতে চাইলে ১০০ টাকা দিয়ে ভর্তির নিশ্চয়ন করতে বলা হয়। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী পছন্দের প্রতিষ্ঠান পাননি। পছন্দের ব্যাপারটি আর্থিক সংগতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধায় আগে সে অনুযায়ী কলেজ নির্ধারণ করার সুযোগ ছিল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের যে কলেজে সুযোগ দেয়া হয়েছে বা পছন্দের তালিকায় যে মেডিকেল কলেজের নাম আছে, সেখানকার শিক্ষা ব্যয় শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের সামর্থ্যে নেই এমন অনেকে ভর্তি হতে পারেন নি।
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ১০ই মার্চ। ফলাফল প্রকাশিত হয় ১২ই মার্চ। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি শেষে বেসরকারিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারি- বেসরকারি সব মেডিকেল কলেজে ক্লাস শুরু হয়েছে ২৪শে জুলাই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি বেশ কিছু মেডিকেল কলেজেই আসন পূরণ হয়নি। ভর্তি কার্যক্রমও শেষ হয়নি। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা দায়ী করছেন বিএমডিসি’র অদূরদর্শী নিতিমালাকে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এসোসিয়েশনের সদস্য ও সাবেক সভাপতি ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, গত ২৫ বছরে এই প্রথম বিএমডিসির অদূরদর্শি ও হুট করে চাপিয়ে দেয়া নতুন অটোমেশন পদ্ধতির ফলে ৭৩১ আসন এখনো পূর্ণ হয়নি। নতুন এই ভর্তি পদ্ধতি যে চরম ভ্রান্ত ও নৈরাজ্যকর তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
সূত্র জানায়, এবছর ৩০০’র অধিক মেডিকেল শিক্ষার্থী বিএমডিসি’র অনুমোদন নিয়ে বিদেশে পড়তে গেছে। ভর্তিতে বিশৃঙ্খলা না হলে এই শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ হয়তো দেশের মেডিকেলেই ভর্তি হতো।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে বলা হয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে এবারই প্রথম অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বিষয়টি অনেকের কাছে নতুন। এ জন্য কিছু সমস্যা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সমস্যাগুলো থাকবে না।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকানুযায়ী ভর্তি হলেও পরে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে অন্য মেডিকেলে চলে গেছেন। এতে ওই আসন আবার শূন্য হয়ে গেছে। প্রথমত আসন সংখ্যার বিপরীতে শিক্ষার্থী কম দেয়া, পরে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে আরও আসন খালি হওয়ায় বেশির ভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজেরই আসন পূরণ হয়নি। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে শিক্ষা কার্যক্রমেও।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ এসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মুবিন খান বলেন, অটোমেশন প্রক্রিয়ায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। এটি সমাধানে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করছি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ) ডা. মুজতাহিদ মুহাম্মদ হোসেন বলেন, অটোমেশন প্রক্রিয়া বেসরকারি মেডিকেল কলেজে নতুন হলেও সরকারি কলেজে এভাবেই মেধার ভিত্তিতে ভর্তি হয়ে আসছে। সুতরাং এবছর বেসরকারি মেডিকেল কলেজেও তাদের পছন্দমতো মেধার ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে। আগে পেছনের সিরিয়াল থেকে টাকা দিয়ে ভর্তি হতে পারলেও এবার সেটা হচ্ছে না। তিনি জানান, বুধবার (গতকাল) ঐচ্ছিক মাইগ্রেশনের ভর্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।