যমুনা নদীর নৌ রুট উন্নয়নে সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। সরকারের নেওয়া শত বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় যমুনা নদী শাসন করে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত নৌরুট উন্নয়ন করা হবে। ফলে সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে ভারতীয় সীমান্ত দৈখাওয়া অংশে জেটি স্থাপন ও বার্জ চলাচলের জন্য নাব্য ঠিক রাখা হবে। এজন্য ‘যমুনা রিভার সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট-১ (নেভিগেশনাল চ্যানেল ডেভেলপমেন্ট)’ নামের একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনেতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক উঠছে আজ। এটিসহ আজ মোট ৮২টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, যমুনা নদী সংক্রান্ত প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২০ কোটি ৪০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ১০২ কোটি ৯৪ লাখ এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে ৫১৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরামর্শক খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১০১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে পরামর্শক সেবার জন্য ধরা হয়েছে ৩৬ কোটি ২৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা এবং এইডস টু নেভিগেশনাল ইনক্লুডিং এক্সপার্ট কনসালট্যান্সি সার্ভিসের জন্য ধরা হয়েছে ৬৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম সোমবার বলেন, এটা ডেল্টা প্ল্যানের প্রকল্প। এমন প্রকল্পের প্রয়োজন আছে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ নিতে গেলে পরামর্শক লাগবেই। এ বিষয়ে বলার কিছু নেই।
সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের শেষ একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) বৈঠক হতে পারে আজ। এতে চলতি অর্থবছরের রেকর্ড ৮২টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে নিয়মিত অনুমোদন জন্য থাকছে ৪৪টি, ব্যয় ছাড়া শুধু মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য ছয়টি এবং অবগতির জন্য অর্থাৎ ৫০ কোটি টাকার নিচে এবং পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন দেওয়া ৩২টি প্রকল্প।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তুষ্টির জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এর আগে সর্বশেষ একনেকে প্রায় ২৫টির মতো প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটার তুষ্টির প্রকল্প নিলে পরবর্তীতে আর্থিক ও পরিকল্পনা শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পরে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন রোববার বলেন, তাড়াহুড়া করে শুধু অনুমোদনের চিন্তা মাথায় রেখে যদি এসব প্রকল্প নেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তীতে জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যদি ঠিকমতো না হয়, তাহলে নকশাসহ অন্যান্য পরিকল্পনাও ঠিকমতো হবে না। এতে বাস্তবায়ন পর্যায় গিয়ে দেখা যাবে প্রকল্প প্রস্তুত নয়। তখন আবার সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি, ব্যয় ও অপচয় বৃদ্ধির আশঙ্কা আছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প হাতে নিলে সেটি অবশ্যই ভালো ফল দেবে না। এক্ষেত্রে সংসদ-সদস্যরা হয়তো ভোটারদের বলতে পারবেন, আমরা প্রকল্প নিয়েছি। কিন্তু পরবর্তীতে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হতে পার।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, অনেক দিন ধরে নিয়মিত একনেক বৈঠক হয় না। ফলে এসব প্রকল্প জমে ছিল। তাই এত একসঙ্গে মনে হচ্ছে। তবে এটাও ঠিক যে, এ সরকার একটি জীবন্ত সরকার। তাই উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রকল্পের অনুমোদন দিতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি শেষ একনেক কি না এখনও বলা যাচ্ছে না। কারণ এখনও হাতে সময় আছে। আগামী ৪-৫ নভেম্বর আরও একটা বৈঠক করা যায় কি না সেই প্রচেষ্টা থাকবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় একনেকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। এতে যেসব প্রকল্প উঠতে যাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩টি প্রকল্প রয়েছে ভৌত অবকাঠামো বিভাগের। এর পরই আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের ২৩টি প্রকল্প। এছাড়া কৃষি-পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের ১৮টি এবং শিল্প ও শক্তি বিভাগের নয়টি প্রকল্প রয়েছে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ছোট ছোট প্রকল্প অনুমোদনে বিশেষ মনোযোগ ছিল পরিকল্পনা মন্ত্রাণালয়ের। এসব ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের নিচে হওয়ায় অনুমোদন দেন পরিকল্পনামন্ত্রী নিজেই। এমন ৩২টি প্রকল্প অবগতির জন্য উপস্থাপন হবে এবারের বৈঠকে। এর মধ্যে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের প্রকল্প রয়েছে ১৬টি, কৃষি-পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের আটটি, ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সাতটি এবং শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রকল্প রয়েছে একটি।
একনেকে উঠতে যাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-মতলব উত্তর-গজারিয়া সড়কে মেঘনা-ধনাগোদা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট এবং যমুনা রিভার সাসটেইনেবল ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট-১ (নেভিগেশন চ্যানেল ডেভেলপমেন্ট)। এছাড়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজ রেল পথে রূপান্তর। ইনার সার্কুলার রিং রোডের বেড়িবাঁধ রায়ের বাজার স্লুইস গেট থেকে লোহার ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়ন। ভাঙ্গা-যশোর-বেনাপোল মহাসড়ককে ৪ লেনে উন্নীতকরণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর। রহমতগঞ্জ-বাবুগঞ্জ-মুলাদি-হিজলা মহাসড়কে আড়িয়ালখাঁ নদীর ওপর মীরগঞ্জ সেতু নির্মাণ এবং দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন প্রকল্প। এর বাইরে আরও আছে পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলাধীন তালবাড়িয়া এবং কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের কোমরকান্দি এলাকা রক্ষা প্রকল্প। রংপুর বিভাগ কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)। নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও মাগুরা জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জয়পুরহাট জেলার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে তালিকায়।