ছাত্র-জনতার অসাধারণ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ অর্জিত নব স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করা বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই দাবিটি বিবেচনার জন্য ২০১০ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পেশ করা হলেও এর বাস্তবায়নে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
বিশ্বের বহু জাতি মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম করেছে কিংবা এখনো করছে। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে বাংলার দামাল ছেলেদের অসাধারণ সংগ্রাম ও সাফল্য অনন্য এবং জ্যোতির্ময়। ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সাড়ে ৪ হাজারেরও অধিক মাতৃভাষাকে সম্মানিত করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সাথে। সবাই স্মরণ করে থাকে আমাদের মহান শহীদদের আত্মদানের আত্মত্যাগের কথা। বাংলাভাষীদের জন্য এটি অত্যন্ত গৌরবের বিষয়।
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ঘটনা ছিল ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ। এই দিনটি ছিল আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক, যা বিশ্ববাসীর নিকট স্বীকৃত ও সমৃদ্ধ। এই মহান দিনটি বিশ্ববাসীর জন্যও স্মরণীয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রস্তাব অনুযায়ী বিশ্বের ১৮৮টি দেশ সর্বসম্মতিক্রমে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইউনেস্কো গৃহীত সিদ্ধান্তে বলা হয়, “১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে সমগ্র বিশ্বে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে”।
পবিত্র কুরআনে মাতৃভাষার গুরুত্বের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “আমি প্রত্যেক রাসুলকে তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য; আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎ পথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। (সূরা ইব্রাহীম: আয়াত: ৪)
যদি কোনো বাণীর উদ্দেশ্য হয় স্পষ্টভাবে প্রচার করা। তবে তা সেই ভাষাতেই প্রচার করতে হবে যে ভাষায় সে এলাকার মানুষ কথা বলে। তাদের মাধ্যমে যাতে তা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তার জন্য ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি ভাষা শুধুমাত্র বর্ণমালা, লিপি বা শব্দের সমষ্টি প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত পরিচয়ের বাহক। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে দেখতে গেলে একটি যুগ, একটি জাতি একটি নির্দিষ্ট ছাঁচের মাঝে আবদ্ধ। আল্লাহর বাণী, যা বিশ্ব চরাচরে যেকোনো ছাঁচে যেকোনোভাবে প্রকাশ পেতে পারে। এটা সমগ্র মানবজাতির জন্য সমানভাবে প্রয়োজন ও প্রযোজ্য। এই প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে পবিত্র কুরআনের এই বাণী সবচেয়ে সরল ও অতুলনীয়।
সংস্কৃতির বাহন হলো ভাষা। প্রত্যেক সমাজের উত্তরাধিকার সংরক্ষণ ও প্রেরণের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো ভাষা। প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষাই তার নিজস্ব সংস্কৃতির বাহন। যেকোনো যোগাযোগের এবং নিজেকে প্রকাশের প্রকৃষ্ট উপায় হলো তার নিজস্ব মাতৃভাষা। এটি সময় সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারের মূল স্তম্ভ। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার কিংবা মাতৃভাষায় লেখার অধিকার হস্তান্তরযোগ্য নয়। শান্তিময় সংস্কৃতির বিকাশ ও আমাদের জীবনযাত্রাকে সমৃদ্ধ করার জন্য মাতৃভাষার বিকাশ অপরিহার্য।
বাংলা একটি ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ ভাষা। বাংলা ভাষা প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন। অহমিয়া, ত্রিপুরা ও অন্যান্য ভাষাতেও বাংলা বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভাষাতত্ত্ববিদরা মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলা হচ্ছে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মায়ানমারের আকিয়াবে বাংলা ভাষার প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় ভাষা হচ্ছে বাংলা।
একটি জাতির স্বাধীনতা বা তার স্বাধীন সত্তা তার নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে যেমন বিশ্বের দরবারে প্রকৃত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে, তেমনি একটি পরাধীন জাতিকে তার ভাষার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে প্রেরণা যোগায়। তার ভাষা, সাহিত্যচর্চা তাকে দেয় তার স্বাধীন সত্তার প্রথম চেতনা এবং উপলব্ধি। মানুষের গভীরে ভাষার আবেগ তার লুপ্তপ্রায় ব্যক্তি সত্তাকে উজ্জীবিত ও জাগ্রত করে তা তাকে প্রকৃত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে তীব্র আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে। সেই মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্তির মধ্যে স্বাধীনতার চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে থাকে। আর এই স্বাধীনতার চেতনার প্রকাশ ঘটে স্বাধীনতা সংগ্রামে। সকল মানবগোষ্ঠী ও জাতির ক্ষেত্রে এই একই সাধারণ নীতি কাজ করে আসছে।
জাতিসংঘে বর্তমানে ৬টি ভাষা প্রচলিত আছে- চীনা, ইংরেজি, ফরাসি, রাশিয়ান, স্প্যানিশ ও আরবি। বাংলা ভাষায় বর্তমানে বিশ্বের ৩০ কোটিরও অধিক লোক কথা বলে। যেকোনো বিচারে বাংলা ভাষা জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের যোগ্য। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইতঃপূর্বে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনে বাংলাদেশের দ্বিতীয় দফা সদস্য পদ লাভ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের অকুন্ঠ আস্থার বহিঃপ্রকাশ। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা এর মধ্য দিয়ে সে আস্থা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এ জন্য প্রথমে জাতিসংঘ সনদ সংশোধন করতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর অসাধারণ পরিচিতি ও প্রভাব এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। জাতিসংঘে নতুন একটি ভাষা সংযোজনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। এ অর্থের যোগানের জন্য বাংলাদেশের বার্ষিক আর্থিক বাজেটে পৃথক বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, বাংলা ভাষায় দক্ষ অনুবাদক ও ভাষাবিদদের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং বাংলা ভাষায় উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে, এ বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানাই। এই লক্ষ্যে ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য হতে পারে: “জাতিসংঘের ভাষা হোক বাংলা”।
বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য সর্বপ্রথম দাবি উত্থাপন করেন এই লেখক। তিনি এই স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে ২০০০ সালে ‘মাতৃভাষা-Mother Tongue’ নামে একটি দ্বিভাষিক ম্যাগাজিন সম্পাদনাও প্রকাশ করেন। ২০০০ সালে তিনি তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব-এর নিকট অনুরোধ জানালে তা সরকারিভাবে বিষয়টি উত্থাপনের পরামর্শ দেয়া হয়। এ বিষয়ে তিনি সরকারের প্রতি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান। ২০১০ সালে এ প্রেক্ষিতে তদানীন্তন সরকার প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ঘোষণার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
২০০০ সালে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য মীর লুৎফুল কবীর সা’দীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ২০১০ সালে প্রেসক্লাবের দ্বিবার্ষিক সাধারণ সভায় সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং এ ব্যাপারে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের লক্ষ্যে লেখক যে আন্দোলনের সূচনা করেন তা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাভাষী মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু কমিটি গঠিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, লেখক একুশে ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কোর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিশেষ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দানের জন্য যে দাবি উত্থাপন করেছিলেন তা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র লেখককে জানান যে, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবছর বাংলাদেশ সরকারকে জাতিসংঘে ৪০০ কোটি টাকা অনুদান দিতে হবে। এত টাকা কোথা থেকে আসবে? বাংলাদেশ এখন আর কোনো স্বল্পোন্নত দেশ নয়; বরং মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হয়েছে। এক রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের নব্য ধনীদের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশের বাৎসরিক বাজেট সাড়ে ৭ লাখ কোটি টাকারও অধিক। কাজেই জাতিসংঘে ৪০০ কোটি টাকা প্রদানের জন্য বাজেটে একটি খাত অন্তর্ভুক্ত করতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ইকোনোমিস্ট’ বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে ‘কান্ট্রি অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাংলা ভাষার প্রচারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, এখনই বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট পদস্থ কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করলে তিনি অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেন ও ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। এ দাবি পূরণ হলে কেবল জাতিসংঘ নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের মর্যাদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে ও চাকরির বিশাল বাজার সৃষ্টি হবে। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এ বিষয়ে ইতিবাচক ফলাফল লাভে অত্যন্ত আশাবাদী। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার উদ্যোগ ইনশাআল্লাহ সফল হবেই।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুরণন ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্ববাসীর মাঝে। বিশ্বের সব মাতৃভাষাই হোক গ্রহণীয়, আদরণীয় ও সমৃদ্ধ। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হবে বাংলা- এটাই এখন দেশবাসীর ও বাংলাভাষীদের একান্ত প্রত্যাশা।
লেখক: মীর লুৎফুল কবীর সা’দী, প্রধান সম্পাদক, আউটলুক বাংলা ডটকম; ফেলো, টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি ট্রাস্ট, ইউকে, জাতীয় প্রেসক্লাব ও ইআরএফ-এর স্থায়ী সদস্য।