বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:২১ অপরাহ্ন




সাত দিনের নামই দেব-দেবী চন্দ্র-সূর্য-গ্রহের নামে কেন?

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৮ মার্চ, ২০২৫ ৫:২১ pm
মহাবিশ্ব sky গ্রহাণু Moon Chandra Grahan Sutak timing lunar eclipse চন্দ্র গ্রহণ চন্দ্রগ্রহণ cop কপ গ্রহাণু nasa নাসা satellite space orbit surface solar moon planet কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ গ্রহাণু
file pic/ বিবিসি

সপ্তাহকে সাত দিনে ভাগ করার এমন ধারণাটি প্রায় ৪০০০ বছর পুরোনো। মূলত প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে এসেছে এটি। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সংখ্যাতত্ত্বে পারদর্শী ছিলেন ব্যাবিলনীয়রা। তারা লক্ষ্য করেছিলেন সূর্য, চাঁদ এবং দৃশ্যমান পাঁচটি গ্রহ (বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি) মোট সাতটি মহাজাগতিক বস্তু অনেকটা খালি চোখেই দেখা যায় এবং এসব মানুষের দৃষ্টিসীমায় রয়েছে।

তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, এই সাতটি বস্তু সাত দেব-দেবীর প্রতিরূপ। তাই তারা এক সপ্তাহকে সাত দিনে ভাগ করেন এবং প্রতিটি দিন বা বারের নাম এই দেবতাদের নামে রাখে।

ব্যাবিলনীয় এই সপ্তাহব্যবস্থা পরে গ্রিক ও রোমান সভ্যতার মানুষের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে রোমানরা এটি গ্রহণ করেন এবং নিজেদের দেবতাদের নাম অনুযায়ী সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ করেন। রোমানদের মাধ্যমেই এটি প্রথমে ইউরোপ ও পরে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

ইংরেজি সপ্তাহের দিনের নামকরণ: ইংরেজি ভাষায় সপ্তাহের দিনের নাম এসেছে নরডিক (স্ক্যান্ডিনেভিয়ান) এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন (প্রাচীন ইংরেজ) দেবতাদের থেকে। রোমান দেবতাদের নাম স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেবতাদের নামে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
শনিবার বা সেটারডে-এর নাম দেয়া হয়েছে রোমান দেবতা সেটার্ন-এর নামে। সেটার্নসের দিনকে (Saturn’s Day) বলা হয় সেটারডে (শনিবার)।

সূর্য দেবতা নামে এসেছে সানডে। সান’স ডে (Sun’s Day)-কে বলা হয় সানডে বা রোববার।

চন্দ্র দেবতার সম্মানে এসেছে মানডে। মুন’স ডে (Moon’s Day)-কে সংক্ষেপে বলা হয় মানডে বা সোমবার।

নরডিক দেবতা টায়ার (Tyr)-কে বিশ্বাস করা হয় মঙ্গল গ্রহের ত্রাণকর্তা। তাই সেই দেবতার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা জানাতে নামকরণ করা হয়েছে মঙ্গলবারের।

টুয়ি’স ডে (Tiw’s Day) কে বলা হয় টুয়িসডে (Tuesday) কে বলা হয় মঙ্গলবার।

নরডিক দেবতা ওডেনকে (Woden/ Odin) বুধ গ্রহের অধিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। তাই ওডেন’স ডে (Woden’s Day) কে বলা হয়ে থাকে ওয়েনেসডে (ওয়েডনেসডে) বা বুধবার।

নরডিক বজ্রদেবতা থোর (Thor) কে বিশ্বাস করা হয় বৃহস্পতি গ্রহের অধিকর্তা ও ত্রাণকর্তা হিসেবে। তাই থোর’স ডে (Thor’s Day) কে বলা হয় থার্সডে বা বৃহস্পতিবার।

নরডিক দেবী ফ্রিগ (Frigg) কে বিশ্বাস করা হয় ভেনাস বা শুক্র গ্রহের অধিকারিনী হিসেবে। তাই ফ্রিগ’স ডে (Frigg’s Day) কে বলা হয় ফ্রাইডে বা শুক্রবার।

বাংলা ও অন্যান্য ভাষায় সপ্তাহের নামকরণ: সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলাসহ অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় বারের নাম এসেছে, যেখানে প্রতিটি দিনের নাম নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহসহ দেবতার নাম অনুসারে রাখা হয়েছে:

প্রাচীন ব্যাবিলনীয় এই ধারণা বিভিন্ন সভ্যতায় ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি খ্রিস্টান, ইহুদি, ইসলাম ও হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে আরও প্রতিষ্ঠিত হয়। বাইবেল ও কুরআনেও সাত দিনবিশিষ্ট সপ্তাহের উল্লেখ আছে, বিশেষ করে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যায়।

আরবি ভাষায় সাত দিনের নাম যেভাবে এসেছে: আরবি ভাষায় সপ্তাহের সাত দিনের নাম মূলত সংখ্যা ও ধর্মীয় প্রভাবের ভিত্তিতে চালু হয়। ব্যাবিলনীয়, গ্রিক বা রোমানদের মতো আরবরা প্রাথমিকভাবে দেব-দেবীর নাম অনুসারে সাত দিনের নামকরণ করেনি। বরং ইসলাম আসার আগেই আরবি ভাষায় দিনগুলোর নাম সংখ্যা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার আরবিতে সপ্তাহের প্রথম থেকে পঞ্চম বার আরবি সংখ্যা এক থেকে পাঁচ অনুসারে করা হয়েছে। রোববারকে সপ্তাহের প্রথম দিন ধরা হয়েছে আল-আহাদ (এক) নাম দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের নাম রাখা হয়েছে আল ইতনায়িন (দুই), তৃতীয় দিন মঙ্গলবারে নাম থালাথা বা তিন। চতুর্থ দিনের নাম আরাবা এবং পঞ্চম দিনের নাম খামচা (পাঁচ) রাখা হয়েছে। জুমার দিনের নামকরণ করা হয়েছে জমায়েত বা সম্মিলনের দিন। আর শনিবারের নাম রাখা হয়েছে আস-সাবাথ বা বিশ্রামের দিন হিসেবে। এটি ইহুদিদের বিশ্রামের দিন সাবাথ-এর সঙ্গে মিল রেখে রাখা হয়েছে।

আরবি ভাষায় গ্রহ বা দেবতার নামে দিনের নাম রাখা হয়নি কারণ ব্যাবিলনীয় ও রোমানদের মতো আরবদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল ভিন্ন। তারা সংখ্যা ও ধর্মীয় গুরুত্ব অনুযায়ী দিনের নাম ঠিক করেছেন। ইসলামের প্রসারেরও নামগুলো অপরিবর্তিত থাকে, তবে শুক্রবার (জুমা) বিশেষ মর্যাদা পায়। আরব অঞ্চলে গ্রহ-ভিত্তিক নামকরণ জনপ্রিয় হয়নি, কারণ তারা নিজেদের সংখ্যাগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

পৃথিবীর নামে কোন বার নেই কেন?

সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণের ঐতিহাসিক ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে মেনে নিতে হয় যে আর্থ-ডে (‘পৃথিবী বার’ ) নামে কোনো দিন নেই।

সপ্তাহের সাত দিনের ধারণা এসেছে মূলত ব্যাবিলনীয়দের কাছ থেকে যারা দৃশ্যমান সাতটি মহাকশীয় বস্তুকে (সূর্য, চন্দ্র, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি) দেবতাস্বরূপ মেনে তাদের নামে দিনের নামকরণ করেছিল। পরবর্তীতে রোমান ও ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে এমন নামকরণ প্রচলিত হয়ে পড়ে।

কয়েক হাজার আগে, পৃথিবী ছাড়া অন্য সব গ্রহ-নক্ষত্রই আকাশে দৃশ্যমান এবং মানুষ তা বিভিন্ন মাত্রায় দেখতে পেতেন। তবে পৃথিবী যে তেমনই একটি মহাজাগতিক বস্তু তা তারা বুঝতে পারেনি। প্রাচীন যুগে মানুষ মনে করত পৃথিবী স্থির বা মহাজগতের ভিত্তি বা ভূমি। আর সূর্য-চাঁদসহ অন্য ৫টি গ্রহই পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। তাই সেই সব গ্রহকে দেবতা হিসেবে কল্পনা করলেও পৃথিবীকে ‘গ্রহ’ হিসেবে বুঝতে পারেনি। পরে কপারনিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক (সূর্যকেন্দ্রিক) মডেল আসার পর মানবজাতি জানতে পারে পৃথিবীও একটি গ্রহ। কিন্তু তখন পর্যন্ত সপ্তাহের দিনগুলোর নাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

নামকরণের মূলভিত্তিই ছিল দৃশ্যমান গ্রহ-নক্ষত্র। কিন্তু পৃথিবী আমাদের অবস্থানস্থল হওয়ায় এটি আকাশে আলাদাভাবে দৃশ্যমান ছিল না। তাই প্রাচীন সভ্যতার মানুষেরা এটিকে সপ্তাহের দিনের নামের জন্য বিবেচনাই করেননি।

প্রাচীন মানুষের কাছে অন্যান্য গ্রহ বা নক্ষত্র ছিল রহস্যময় এবং প্রকাণ্ড শক্তির উৎস। এদেরকে আকাশে উজ্জ্বল আলোর বিন্দু হিসেবে দেখা যেত, যা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

কিছু সংস্কৃতিতে পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত বার পাওয়া যায়, যেমন জাপানি ও কোরিয়ান ভাষায় রোববারকে কখনো কখনো ‘মাটি/পৃথিবী-বার’ (দোয়োউবি) বলা হয়, তবে এটি মূলত শনির নাম থেকেই এসেছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রধান ভাষায় পৃথিবীর নামে নির্দিষ্ট কোনো বার নেই। দীর্ঘ চার হাজার বছর ধরে আমরা অযৌক্তিকভাবে দেয়া বারের নাম ব্যবহার করে আসছি।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD