শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ০৫:৪৮ অপরাহ্ন




হাওরে বিপর্যয়, চাপে পড়তে পারে খাদ্য নিরাপত্তা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬ ১২:২৮ pm
ফসলের মাঠ ফসল মাঠ Climate Change Conference COP27 সম্মেলন Conference জলবায়ু climate cop কপ জলবায়ু Boro paddy farmers ইরিগেশন Irrigation Rice ধান আমন ধান কৃষক agri সেচ মৌসুম ডিজেল climate jamuna flood Water level Of Jamuna jamuna-river প্লাবন flood flood Disaster Flood Safety adb Flood Flooding overflow water rain snow coastal storms storm surges dangerous floodwaters floodwater বন্যা কবলিত পানি প্রবাহ প্রবাহিত পানি জোয়ার ভাটা কৃষি জোয়ার-ভাটা দুর্যোগ বন্যা বন্যার্ত পানি বন্যা-Kurigram ফসল Flash floods threaten haor crops in Netrokona, farmers fear heavy losses Flash flood haor crops Netrokona farmer
file pic

দেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি আসে শুধু বোরো মৌসুমে। এর মধ্যে সাতটি হাওর জেলা দেয় প্রায় ২০ শতাংশ। কিন্তু এবার দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকাগুলোতে চলছে কৃষকদের বোবাকান্না। কারণ, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বিস্তীর্ণ জমির আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার ৭৩ হেক্টর এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, ৮০ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে। এই ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন অঞ্চলে। এতে জাতীয় সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারাবছরের জন্যই সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা রয়েছে। চালের দাম বেড়ে যেতে পারে। তাই দাম স্থিতিশীল রাখতে এখন থেকেই পরিকল্পনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

আড়াই লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত
গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সাতটি হাওর জেলায় প্রায় এক হাজার ১১০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ কৃষক। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, হাওর অঞ্চলের মোট কৃষিজমির ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫০ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধানের উৎপাদন হারানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে ।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খান বলেন, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, হাওর অঞ্চলের প্রায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পুরো হাওর অঞ্চলের প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকা প্রতিবছরই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বলেন, আগাম সতর্কতা ও দ্রুত ধান কাটার কারণে এবার তুলনামূলক বেশি ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে।

সামান্য ক্ষতিতেও বড় প্রভাব পড়তে পারে
বোরো ধানের চারা ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে রোপণ করা হয়। এপ্রিল থেকে জুনে কাটা হয় পাকা ধান। মোট চাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে এই এক মৌসুম থেকেই। এর মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার হাওরে উৎপাদন হয় প্রায় ২০ শতাংশ। উৎপাদনের এই ঘনত্বের কারণে হাওরাঞ্চলে সামান্য ক্ষতি হলেও জাতীয় সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলে।

ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বোরো উৎপাদনও বেড়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে বোরো উৎপাদন ছিল দুই কোটি এক লাখ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় দুই কোটি ১৩ লাখ টনে। আর চলতি মৌসুমে সরকার দুই কোটি ২৪ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

সাত জেলার হাওরাঞ্চলের কৃষিজমির বিশাল অংশ এখন পানির নিচে। কোথাও ধান কাটার সুযোগই পাননি কৃষকরা। কোথাও কাটা হচ্ছে আধাপাকা ধান। কোথাও পানির নিচে থেকে ধান পচে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের গড় হিসাব বলছে, প্রতি হেক্টরে প্রায় ৪ দশমিক ৪৭ টন চাল উৎপাদন হওয়ার কথা। সেই হিসাবে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুই লাখ টনের মতো উৎপাদন কমে যেতে পারে। আর যদি ৮০ হাজার হেক্টরের হিসাব ধরা হয়, তাহলে ঘাটতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠসেবা বিভাগের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানিয়েছেন, সারাদেশে প্রায় সাড়ে ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করা হলেও হাওরাঞ্চলে উৎপাদনের ঘনত্ব বেশি। এ কারণে ক্ষতির প্রভাবও তুলনামূলক বেশি। গত মৌসুমে দেশের মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলা থেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আরও দুই সপ্তাহ পর পরিষ্কার বোঝা যাবে ঠিক কী পরিমাণ ধান বাঁচানো গেল, আর কতটুকু নষ্ট হলো। সেই হিসাব অনুযায়ী সরবরাহ কমে গেলে ধান-চালের দাম বাড়তে শুরু করবে।
গত অর্থবছরে দেশে প্রায় দুই কোটি ১৩ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল। আর চলতি মৌসুমে সরকার দুই কোটি ২৪ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু হাওরের এই ধাক্কা সেই হিসাবকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এর আগে, ২০১৭ সালের মার্চ-এপ্রিলের অকাল বন্যায় নষ্ট হয় প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান। ওই বছর চালের দর রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। পাঁচ বছর পর আঘাত হানে আগাম ঢল। যাতে ক্ষতির মুখে পড়ে সাত হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ধান। এতে চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে চালের চাহিদা ধরা হয়েছে তিন কোটি ৮০ থেকে তিন কোটি ৮৫ লাখ টন। বিপরীতে উৎপাদন হতে পারে প্রায় তিন কোটি ৭৭ লাখ টন। পরের বছরে চাহিদা বেড়ে দাঁড়াতে পারে তিন কোটি ৯১ লাখ টনে, ফলে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান আরও বাড়বে। এক দশকের বেশি সময় ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি থাকলেও চলতি অর্থবছরেই দেশকে ১২ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছে।

দেশে প্রায় ১৩ লাখ টন চাল মজুত রয়েছে, যা স্বল্প মেয়াদে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা, ধান শুকানোর ব্যবস্থা, সরাসরি সংগ্রহ কার্যক্রমসহ ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হাওরের চাল দ্রুত বাজারে আসে এবং মৌসুমের শুরুতে সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। এই অংশে ঘাটতি মানে বাজারে প্রাথমিক চাপ সৃষ্টি হওয়া, যা পরে বড় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই বোরো থেকে আসে। উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। বাজারে চালের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষ চাল মজুত করতে শুরু করতে পারে, যা বাজারকে আরও অস্থির করে তুলবে।
তিনি আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেন, আগাম পরিকল্পনা না নিলে খাদ্য নিরাপত্তা আরও চাপে পড়তে পারে। আমন মৌসুমে উৎপাদন ভালো হলে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা, ফসল বহুমুখীকরণ এবং বিকল্প মৌসুমে প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ দেন।

কৃষকের ত্রিমুখী সংকট
হাওর অঞ্চলের কৃষকরা ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন। সেগুলো হলো– ধানের ক্ষয়ক্ষতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আর বাজারদর কমে যাওয়া। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পানিতে নেমে কাঁচা ধান কাটছেন। কিন্তু এতে লাভ কম, ক্ষতি বেশি। কারণ, এই ধান থেকে ভালো চাল পাওয়া কঠিন। শ্রমিক সংকট পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। যেখানে আগে একজন শ্রমিকের মজুরি ছিল ৫০০-৬০০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১২শ থেকে দুই হাজার টাকা। আগে দিনে তিন কাঠা জমির ধান কাটা যেত, এখন এক কাঠাও ঠিকমতো কাটা যাচ্ছে না। যান্ত্রিক হারভেস্টার ব্যবহারও সীমিত। যেগুলো চলছে সেগুলোর ভাড়া তিন থেকে চার গুণ হয়েছে। অন্যদিকে, বাজারে ভেজা ধানের দাম কমে গেছে। মণপ্রতি ৭০০-৮০০ টাকা থেকে নেমে ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ওপরে বইছে। আগামী কয়েক দিনে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এতে নতুন করে ৭৭ হাজার হেক্টরের বেশি ধানিজমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েস মনে করেন, জাতীয় পর্যায়ে বড় অস্থিরতা হয়তো হবে না, কিন্তু স্থানীয়ভাবে চাপ বাড়বে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে, যেখানে বোরোই প্রধান ফসল। এখানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নিজেদের চাহিদার জন্যও বাজারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা স্থানীয় বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। এই সংকট সামাল দিতে শুধু ত্রাণ বা সহায়তা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত কৌশল। নির্ধারিত ক্রয়মূল্যের মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, কৃষকরা যেন দুর্নীতি ‍ও হয়রানি ছাড়া তাদের ফসল বিক্রি করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ক্রয়) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি হবে না। ফলে বাজারে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। খাদ্য অধিদপ্তর শুকনো ধান সরাসরি সংগ্রহ করছে। পাশাপাশি মিল মালিকদের দ্রুত ধান কেনার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে, যেন সরকার সর্বোচ্চ সংগ্রহ নিশ্চিত করতে পারে এবং মিলগুলো সচল থাকে।

সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD