সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা পরিণত হয়েছে ভারতের অন্যতম আলোচিত সরকারবিরোধী আন্দোলনে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এখন রাজপথ থেকে আন্দোলন নিয়ে গেছে সংসদ ভবনের দোরগোড়ায়। তাদের কর্মসূচিকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, যা মোদী সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতে সরকারবিরোধী আন্দোলন নতুন নয়। কৃষক আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অতীতেও বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। তবে এবারের আন্দোলনের বিশেষত্ব হলো—এটি শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে। তরুণ শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের প্রতি এখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাচ্ছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে জাতীয় আন্দোলন
প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু করে সিজেপি। ধীরে ধীরে এই কর্মসূচি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে এতে যোগ দেন লাদাখের প্রকৌশলী ও শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী সোনম ওয়াংচুক। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তিনি অনশন শুরু করেন। অনশন দীর্ঘায়িত হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আদালতের নির্দেশে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তবে ওয়াংচুককে আন্দোলনস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাকে জোর করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। যদিও দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে ছাত্র আন্দোলন
ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়ার পর আন্দোলন আরও জোরালো করার ঘোষণা দেয় সিজেপি। তারা সংসদ চলো কর্মসূচি ঘোষণা করে। সোমবার হাজারো শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষ সংসদ ভবনের দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যান।
বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসায়। কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সেবাও সীমিত করা হয়। তবুও বিপুলসংখ্যক মানুষ সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছে যান।
পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। সরকারি হিসাবে, সংঘর্ষে ১১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।
পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীরা নিরাপত্তা বলয় ভেঙে সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করেছেন। অন্যদিকে সিজেপির অভিযোগ, পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে এবং বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে. আংমোকেও ধাক্কাধাক্কির শিকার হতে হয়েছে।
বিরোধীদের সমর্থন
সিজেপির আন্দোলনের প্রতি বিরোধী দলগুলোর সমর্থনও দিন দিন বাড়ছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, কর্মসংস্থানের সংকটের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোই তরুণদের একমাত্র ভরসা ছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁস সেই বিশ্বাসকে নষ্ট করেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ছে এবং এর ফলে তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবও পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, সাধারণ পোশাকে থাকা কর্মকর্তারাও আন্দোলনকারীদের মারধর করেছেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন আম আদমি পার্টির (আপ) জাতীয় আহ্বায়ক ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সরাসরি আক্রমণ করে তিনি বলেছেন, এই দেশ মোদীর বাবার নয়, এটি ১৪০ কোটি ভারতীয়ের।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এক সংবাদ সম্মেলনে কেজরিওয়াল দাবি করেন, আগের দিনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দিল্লি পুলিশ। তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেজরিওয়াল বলেন, মোদীজি, মানুষকে ভয় দেখানো বন্ধ করুন। এই দেশের মানুষ স্বৈরাচারকে কীভাবে জবাব দিতে হয়, তা ইতিহাসে বহুবার দেখিয়েছে। আবারও প্রয়োজন হলে তার ব্যতিক্রম হবে না।
সরকারের সঙ্গে বৈঠক
টানা প্রায় তিন সপ্তাহের আন্দোলনের পর কেন্দ্রীয় সরকার প্রথমবারের মতো সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তবে বৈঠকের পর সিজেপি জানায়, সরকার তাদের বক্তব্য শুনলেও কোনো দাবিই মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেয়নি।
এদিকে বিজেপির সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেন।
সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর প্রকাশের পরই সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। এরই মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে আন্দোলনকারীরা
মোদীর বাসভবন ঘিরে বিক্ষোভ ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
সবশেষ খবর অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে নয়াদিল্লির ৭, লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে পৌঁছান রাহুল গান্ধী। তার সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী ও ওয়ানাডের সংসদ সদস্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং দলের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা। সেখানে তারা সড়কে বসে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকার মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংকে ঘটনাস্থলে পাঠায়। তিনি সেখানে গিয়ে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেন। একই সময়ে পুলিশ কংগ্রেস নেতাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ করার আহ্বান জানায়। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘিরে নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, আগের দিন তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তার জবাব চাইতেই তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এসেছেন। দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার দায়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত বলেও দাবি করেন তিনি।
সংঘর্ষের পরও মঙ্গলবার শত শত আন্দোলনকারী দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান। সিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
কীভাবে শুরু সিজেপির?
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ গঠনের আহ্বান জানান।
পরে একটি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ এবং ব্যঙ্গধর্মী ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে উদ্যোগটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে দলটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটিরও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
সামনে কী?
আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের বিচার করা। একই সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেও তারা অনড়।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে তরুণদের ক্ষোভ, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবির বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। তাই আগামী দিনে এই আন্দোলন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: দ্য হিন্দু, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, গার্ডিয়ান