হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সচিব কেটি জাকারিয়া ক্যালিফোর্নিয়ার বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এমনকি নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় না দেওয়ার জন্য তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। তা সত্ত্বেও গত দুই বছরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ১৫টি পোস্ট শেয়ার করেছেন, যেখানে তাকে ‘অ্যাটর্নি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে জাকারিয়ার এক্স (সাবেক টুইটার) ও ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে এসব পোস্ট করা হয়। এতে ফক্স নিউজ ও ওয়ান আমেরিকা নিউজের এমন কিছু সংবাদের শিরোনাম ও ভিডিও ক্লিপ ছিল, যেখানে তাকে অ্যাটর্নি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আর সেই পরিচয়টিই তিনি বারবার নিজের অনুসারীদের মাঝে তুলে ধরেছেন।
এসব পোস্টের মধ্যে অন্তত একটি ইতোমধ্যে মুছে ফেলা হয়েছে। তবে সিএনএনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জাকারিয়া উভয় প্ল্যাটফর্মেই এই পরিচয় প্রচার করেছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও পডকাস্টের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি নিজেকে বারবার ‘লইয়ার’ বা আইনজীবী হিসেবে দাবি করেছেন।
২০১১ সালে পেপারডাইন ইউনিভার্সিটির কারুসো স্কুল অব ল’ থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পর জাকারিয়া নিজের আইনি যোগ্যতাকে কীভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, এসব পোস্টের কারণে তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জাকারিয়ার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একটি প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তিনি ওই বছর বার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জাকারিয়া নিজেই বিষয়টি স্বীকার করেন এবং জানান যে তিনি দ্বিতীয়বার আর এই পরীক্ষায় বসেননি।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও রিয়েল আমেরিকাস ভয়েস-কে দেওয়া সাক্ষাতকারে জাকারিয়া জানান, টিভিতে উপস্থিত হওয়ার আগে পেপারডাইনের প্রেসিডেন্টসহ অন্যদের সঙ্গে তিনি পরামর্শ করেছিলেন। তারা তাকে ‘লইয়ার’ শব্দটি ব্যবহার করার অনুমতি দিলেও ‘অ্যাটর্নি’ বা ‘এসকোয়ার’ পরিচয় দিতে বারণ করেছিলেন। জাকারিয়ার এক ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টগুলো শেয়ার করার উদ্দেশ্য ‘অ্যাটর্নি’ উপাধি ব্যবহারকে সমর্থন করা ছিল না।
বৃহস্পতিবার রাতে ফক্স নিউজকে জাকারিয়া বলেন, ‘আমার মনে হয় সেগুলো রিট্যুইট ছিল। আমি তো আগেই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছি যে, আমি এই উপাধিকে সমর্থন করার জন্য পোস্ট করিনি। আমাকে দেওয়া একটি পরিচয়ের পোস্ট কেবল রিট্যুইট করা হয়েছিল।’
রিয়েল আমেরিকাস ভয়েস-কে দেওয়া সাক্ষাতকারে জাকারিয়া নিজেকে ‘আইনজীবী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বিষয়ে প্রাপ্ত পরামর্শের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তার আইনের ডিগ্রিই তাকে এই শব্দটি ব্যবহারের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
জাকারিয়া বলেন, ‘তারা স্পষ্টভাবেই আমাকে বলেছিল যে আমি নিজেকে ‘আইনজীবী’ বলতে পারি, কারণ আমার জেডি (জুরিস ডক্টর) ডিগ্রি আছে। এর পাশাপাশি আমার আন্তর্জাতিক করপোরেট আইনে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা আমাকে আইন বিশ্লেষণের সক্ষমতা দেয়, যদিও সরাসরি পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা দেয় না।’
ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, সেখানে আইন পেশায় নিয়োজিত হতে হলে বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক এবং সনদ ছাড়া আইনজীবী হিসেবে ভুয়া পরিচয় দেওয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ক্যালিফোর্নিয়া বার অ্যাসোসিয়েশন সিএনএনকে জানিয়েছে, জাকারিয়ার সেখানে আইনচর্চার কোনো লাইসেন্স থাকার রেকর্ড নেই। তবে গোপনীয়তার নীতির কারণে তিনি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন কিনা, সে বিষয়ে তারা কিছু বলতে অস্বীকার করেছে।
জাকারিয়া বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি এ বিষয়ে খুব সতর্ক ছিলাম। আমি কখনোই এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করিনি; যাতে মনে হয় আমি প্র্যাকটিসিং অ্যাটর্নি।’
তবে যে অঙ্গরাজ্যে তিনি কাজ করেছেন সেখানে বারের সনদ না থাকা সত্ত্বেও, জাকারিয়া বারবার তাকে ‘অ্যাটর্নি’ উল্লেখ করা সংবাদগুলো শেয়ার ও প্রচার করেছেন।
২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল জাকারিয়া এক্স-এ ফক্স নিউজের একটি খবরের শিরোনাম শেয়ার করেন, যার ভাষা ছিল- ‘কেবল ডেমোক্র্যাটরাই মার্কিন নির্বাচনে নাগরিকত্বের প্রমাণ চায় না, বললেন অ্যাটর্নি।’ পোস্টটি অবশ্য পরবর্তীতে মুছে ফেলা হয়।
সেই একই দিনে ট্রুথ সোশ্যালে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে তিনি একই খবর ছয়বার শেয়ার করেন এবং ১৪ মে আবারও তা পোস্ট করেন।
২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট তিনি ফক্স নিউজের আরও একটি শিরোনাম শেয়ার করেন, যেখানে তাকে অ্যাটর্নি হিসেবে বর্ণনা করে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসোমের সমালোচনা করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ওয়ান আমেরিকা নিউজের যেসব পোস্টে তাকে ‘অ্যাটর্নি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, তার মধ্যে ছয়টি পোস্ট তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে পুনরায় পোস্ট করেন। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ১৪ মে একটি, ৪ জুন দুটি, ১৭ জুন একটি এবং ১১ সেপ্টেম্বর দুটি।
চলতি অক্টোবরের শুরুর দিকে ‘দ্য গ্রেগ কেলি শো’-তে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাটর্নি মনোনীত করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার সময় তিনি বলেন, ‘আমি একজন আইনজীবী।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে একটি খ্রিস্টান পডকাস্টের সাক্ষাতকারে জাকারিয়া জানান, পেপারডাইনের ল’ স্কুলে পড়ার পর তিনি বেইজিং চলে যান এবং সেখানে ‘প্রায় আড়াই বছর’ আইনি পেশায় কাজ করেন।
জাকারিয়া জানান, বেইজিংয়ে স্বামীর কাছে চলে যাওয়ার পর বার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়াকে তিনি ‘গুরুত্বহীন’ মনে করেছিলেন, কারণ চীনে তার কাজ করার ক্ষেত্রে এটি কোনো বাধা ছিল না।
তিনি বলেন, ‘আমি বার পরীক্ষার ফলাফলের কথা খুব একটা ভাবিনি বা এটাকে এমন কিছু মনে করিনি যার ওপর নজর দিতে হবে।’
তিনি জানান, চীনের অন্যতম শীর্ষ আইনি প্রতিষ্ঠান ‘ঝং লুন ল’ ফার্ম’-এর আন্তর্জাতিক বিভাগে তিনি কাজ করেছেন। সেখানে একজন সিনিয়র পার্টনারের অধীনে থাকা চারজন সহযোগীর একজন হিসেবে তিনি বিশাল অঙ্কের শেয়ারহোল্ডার চুক্তির কাজ সামলেছেন।
জাকারিয়া বলেন, ‘এই কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা আমার ছিল।’
তবে চীনা আইন অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকরা চীনের বার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান না। ফলে তারা নিবন্ধিত আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে পারেন না এবং কোনো বিচার প্রক্রিয়া বা লিটিগেশনে অংশ নিতে পারেন না।
অনুসন্ধানী নিউজলেটার পপুলার ইনফরমেশন জাকারিয়া কখনো বার পরীক্ষা দিয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পর চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পের কাছে সাংবাদিকরা তার প্রেস সচিবের বারের সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুললে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কোন অঙ্গরাজ্যে বার পরীক্ষায় পাস করেছেন, তখন জাকারিয়া উত্তর দেন, ‘যখন আমি চীনে যাই।’ পরবর্তীতে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে তিনি জানান, হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানের বিকট শব্দের কারণে তিনি প্রশ্নটি ভুল শুনেছিলেন এবং মনে করেছিলেন ল’ স্কুলের পর তিনি কোথায় গিয়েছিলেন তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি ভেবেছিলাম প্রশ্নটি ছিল—ল’ স্কুলের পর আপনি কোথায় ছিলেন?
এদিকে জাকারিয়া তার আইনি যোগ্যতার ভুল তথ্য দিয়েছেন কিনা, তা তদন্ত করে দেখার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট বারের কাছে আবেদন জানিয়েছে ওয়াচডগ সংস্থা ‘ক্যাম্পেইন ফর অ্যাকাউন্টেবিলিটি’।
তবে হোয়াইট হাউস জাকারিয়ার পক্ষ সমর্থন করেছে। এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন যেসব চমৎকার কাজ করছে, সে সম্পর্কে মার্কিন জনগণকে অবহিত করার জন্য জাকারিয়া অনন্য যোগ্যতাসম্পন্ন ও অত্যন্ত বুদ্ধিমান একজন ব্যক্তি।’
(যুগান্তর)