গণপরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে খোলা ট্রাক-পিকআপে চড়ে ছুটছে ঘরেফেরা মানুষ। মঙ্গলবার (২৭ জুন) বিকেলে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদযাত্রায় বাসে দ্বিগুণ জায়গা ভেদে তিনগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। তাই তারা কম ভাড়ায় যাতায়াতের জন্য ট্রাক-পিকআপে চলাচল করছেন।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া বাইপাস থেকে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে ৩০০ টাকায় ঈদযাত্রী তুলছিলেন ট্রাকচালক লিয়াকত। তিনি বলেন, গতকাল রাতে ঢাকায় কাঁচামাল নিয়ে ঢুকেছিলাম। এখন সড়কে অনেক যাত্রী, খালি যাওয়ার চেয়ে ঈদের আগে কিছু টাকা আয় করি।
লিয়াকতের ট্রাকে করে ময়মনসিংহে যাচ্ছিলেন মো. আজিজুল। তিনি বলেন, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও বাসে উঠতে পারিনি। ঢাকা থেকে যে বাসগুলো ময়মনসিংহ যাচ্ছে তা যাত্রী পরিপূর্ণ, ভাড়া নিচ্ছে কয়েকগুন বেশি। ট্রাকে ৩০০ টাকায় ময়মনসিংহের বাইপাস পর্যন্ত যাচ্ছি। বাসের চাইতে কম ভাড়ায় যেতে পারব। বৃষ্টি ঠেকাতে সঙ্গে ছাতাও নিয়েছেন বলে জানান আজিজুল।
জনপ্রতি ৩৫০ টাকায় ২১ জন যাত্রী গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে শেরপুরের উদ্দেশ্যে পিকআপে রওনা হয়েছেন। তাদের একজন আতিকুল ইসলাম জানান, তারা সবাই পাশাপাশি কারখানায় কাজ করেন। সবার বাড়ি শেরপুরের আশপাশে। বাসে অতিরিক্ত ভাড়া, বাস পেতে ভোগান্তিসহ নানা কারণে পিকআপ ভাড়া করে একসঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আতিকুল ইসলাম আরও জানান, ঝুঁকির সঙ্গে আনন্দও রয়েছে। বৃষ্টি ঠেকাতে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে বিশেষভাবে ছাউনি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মাওনা হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কংকন কুমার বিশ্বাস বলেন, মহাসড়কে অনেক যাত্রী রয়েছে। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। আমাদের নজরে আসা মাত্রই আমরা তাদের বুঝিয়ে নামিয়ে নিচ্ছি। ট্রাক-পিকআপ পরিহার করে ঝুঁকিমুক্তভাবে ঈদযাত্রা করতে আমরা যাত্রীদের অনুরোধ করছি।
পবিত্র ঈদুল আজহার বাকি আর মাত্র একদিন। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফিরছে মানুষ। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার সড়কে কোথাও ধীরগতি, কোথাও স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে।
মঙ্গলবার (২৭ জুন) দুপুর ১২টার দিকে মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব পাড়ে যানবাহন চলাচলে ধীরগতি দেখা যায়। এতে ঢাকামুখী ও উত্তরবঙ্গমুখী লেনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়। এরপর দুপুর ২টার পর গোলচত্বর এলাকায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। তবে বিকেল ৩টার দিকে মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে হাতিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়। গাজীপুরের চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত পরিবহন স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করছে।
বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাত ১২টা থেকে আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে বাস, ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেলসহ ১৫ হাজার ৭৩৬টি পরিবহন পারাপার হয়েছে। এতে টোল আদায় হয়েছে এক কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
এদিকে গণপরিবহন না পেয়ে খোলা পিকআপ ও ট্রাকযোগে বাড়ি ফিরছে মানুষজন। তবে মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে তাদের। ফলে শত কষ্টের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছেন তারা।
গার্মেন্টসকর্মী রাসেল আহমেদ জানান, চন্দ্রা থেকে বাস না পেয়ে খোলা পিকআপে চড়েছি। এতে কোথাও কোথাও বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। যদিও গাড়িতে পলিথিনের ব্যবস্থা ছিল।
মোবারক হোসেন বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিরাজগঞ্জে যাব। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও বাস পাইনি। যাও পাওয়া যায় তিনগুণ বেশি ভাড়া চায়। তাই বাধ্য হয়ে খোলা ট্রাকে উঠেছি। কষ্ট হচ্ছে ঠিকই আবার ভালো লাগছে আনন্দে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. শরফুদ্দিন বলেন, এবার ঈদে মানুষ স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছে। এক্ষেত্রে পুলিশের সর্বোচ্চ প্রচেষ্ট রয়েছে। মহাসড়কের টাঙ্গাইল প্রান্তে কোনো অংশে যানজট নেই। পরিবহন চলমান রয়েছে। তবে মহাসড়কে পরিবহনের চাপ রয়েছে।
সাভারের পোশাক কারখানাগুলোতে ঈদের ছুটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসস্ট্যান্ডে ঢল নেমেছে যাত্রীদের। হঠাৎ যাত্রী বেড়ে যাওয়ায় সাভারের ২৮ কিলোমিটার সড়কে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ জুন) বিকেল ৩টার দিকে সাভারের মহাসড়কগুলো ঘুরে দেখা যায়, বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের বাইপাইল থেকে আশুলিয়া ব্রিজ ১২ কিলোমিটার, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পল্লীবিদ্যুৎ থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
বাইপাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে ওঠা উজ্জল নামে এক যাত্রী বলেন, দুপুর দেড়টায় বাইপাইলে বাসে উঠেছি। এখন পর্যন্ত চন্দ্রা পৌঁছাতে পারিনি। সড়কে প্রথমে ধীরগতির সুষ্টি হয়। এখন থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। আজ প্রায় সব কারখানা ছুটি হয়েছে। ফলে সবাই বাড়ি যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন। এ কারণে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছি।
অপর যাত্রী আয়েশা বলেন, আমি আব্দুল্লাহপুর থেকে নীলফামারী যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠেছি। আশুলিয়া থেকে বাইপাইল পর্যন্ত থেমে থেমে যানজটে পড়েছি। এখন বাইপাইলে অবস্থান করছি। আজ মনে হয় টাঙ্গাইল পৌঁছাতে রাত পেরিয়ে যাবে। তবে পুলিশ যানজট নিরসনে অনেক চেষ্টা করছে। আসলে এতো যাত্রী আর গাড়ি যে প্রাকৃতিকভাবেই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
হানিফ পরিবহনের চালক মোহাম্মদ বলেন, দুপুর পর্যন্ত মহাসড়ক স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। এ কারণে সড়কে যানবাহন বেড়েছে। পাশাপাশি অনেক চালক সড়কের পাশে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠাচ্ছেন। ফলে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে হাইওয়ে থানা পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) আজিজুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা উত্তর ট্রাফিক পুলিশের অ্যাডমিন হোসেন শহীদ চৌধুরী বলেন, আমাদের পুলিশের সকল ইউনিট যার যার স্থান থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা সড়কেই রয়েছি। বিকেলে একটু গাড়ির চাপ পড়েছে। আশা করছি দ্রুতই চাপ কমে যাবে।
গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে পরিবহন সংকটে পড়েছে ঈদে ঘরেফেরা মানুষ। ফলে অনেকেই পায়ে হেঁটে রওনা হয়েছেন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
মঙ্গলবার (২৭ জুন) বিকেল ৩টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত এ দৃশ্য চোখে পড়ে।
এর আগে গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সকালে তেমন চাপ ছিল না। অনেক পরিবহনকে মহাসড়কের পাশে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যাত্রীদের ডেকে তুলতে দেখা গেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, দুপুরের পর কারখানা পুরোদমে ছুটি হলে ঈদযাত্রার স্বাভাবিক এ চিত্র বদলে যেতে শুরু করবে, সড়ক-মহাসড়কে মানুষের ঢল নামবে। বিকেলের দিকে গাজীপুরের টঙ্গী, স্টেশন রোড, হোসেন মার্কেট, কলেজ গেট, বোর্ড বাজার এলাকার যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পরিবহন না পেয়ে তাদের পায়ে হেঁটে যেতে দেখা গেছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশালের উদ্দেশ্যে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে রওনা দিয়েছেন টঙ্গী বাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, সকালে দোকানের কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিতে গিয়ে দুপুর হয়ে গেছে। ঈদযাত্রার ভোগান্তি কথা চিন্তা করে আগেই স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়েছিলাম। আজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। আগে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া দিয়ে ত্রিশাল পৌঁছাতে পারতাম। এখন সেই ভাড়া হাজারের ঘরে গিয়ে ঠেকেছে। তবে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও বাড়ি যাওয়ার বাস পাচ্ছি না। তাই দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করে পায়ে হেঁটেই চান্দনা চৌরাস্তার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি। সেখানে গিয়ে বাস ধরে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হব।
হারিকেন এলাকার পোষাক কারখানার শ্রমিক বুলবুল আহমেদ বলেন, স্ত্রীসহ একটি কারখানায় কাজ করি। বাড়ি যাব তাই আগে থেকেই ব্যাগ গুছিয়ে সকালে অফিসে যাই। দুপুর ২টার মধ্যে অফিস থেকে বের হয়ে এলেও দেড় ঘণ্টা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাস পাইনি। তাই পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছি, আমার মতো আরও অনেকেই হাঁটছেন। একসঙ্গে হাঁটতে ভালোই লাগছে।
টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, ঈদে পরিবহন সংকট থাকলেও একদমই যানজট নেই। অনেক যাত্রী রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পুলিশ সদস্যরা সহযোগিতা করছেন।