বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়ে নতুন সরকারের কাছ থেকে এখনো গ্রিন সিগন্যাল পায়নি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ফলে এ নিয়ে আপাতত খুব বেশি কাজও হচ্ছে না। এদিকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের কাছে চাওয়া ঋণের বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্পটি যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। এজন্য বর্তমান সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে ইআরডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা রোববার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত যতটা সহজ ছিল, এখন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তা ফের কঠিন হয়ে যেতে পারে। কেন না বছরের পর বছর ‘ভারত না চীন’-কোন দেশ এটি বাস্তবায়নে সহায়তা দেবে তা নিয়েই চলছিল টানাটানি। তবে জনগণের স্বার্থে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হওয়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। কিন্তু এ নিয়ে নতুন সরকারের কাছ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনাই দেওয়া হয়নি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চীন সাধারণত যে কোনো প্রকল্পের ঋণ প্রক্রিয়ায় সময় নেয়। অর্থাৎ ধীরে চল নীতিতে কাজ করে। কিন্তু এ কর্মসূচিতে প্রস্তাবিত ঋণ কার্যক্রমে আরও বেশি বিলম্বিত করছে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ‘কোয়ারি’ (তথ্য যাছাই) দিচ্ছে। আমরাও উত্তর পাঠাচ্ছি। এটুকুই হচ্ছে।
সূত্র জানায়, রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলার মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নসংক্রান্ত স্বপ্ন পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। তিস্তা মহাপরিকল্পনা কার্যকর করতে চীনের কাছে চাওয়া ঋণের বিষয়ে কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চীনের সঙ্গে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হয়নি।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম পছন্দ ছিল ভারত। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নানা ইস্যুতে টানাপোড়েন ছিল ফলে কর্মসূচি বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার চীনের কাছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ চায়। কিন্তু যে কোনো প্রকল্পের ঋণ চুক্তির ক্ষেত্রে ধীরে চলো নীতিতে এগোতে চায় চীন। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ২০১৬ সাল থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাা কথা শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তিস্তা পারের মানুষ বাঁচাতে পরিকল্পনাটির দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। এক্ষেত্রে এটি নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। এতে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটির সুরহা করে যেতে পারেনি। আমরা আশাবাদী বিএনপি সরকার এটি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। প্রায় ২৪০ বছরের পুরোনো নদী তিস্তা। এর সঙ্গে রয়েছে উত্তরের ২৫টি নদীর প্রবাহ। শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলার রাজাহাট, উলিপুর, চিলমারী, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে এ নদী। শুষ্ক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা।
এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদীবেষ্টিত। নদীশাসন না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তিস্তার দুই পার হয়ে উঠবে পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির মতো সুন্দর নগরী। চীনের হোয়াংহো নদীকে এক সময় বলা হতো চীনের দুঃখ। প্রতিবছর ওই নদীর পানি ভাসিয়ে দিত শত শত মাইল জনপদ। ভেঙে নিয়ে যেত বহু গ্রাম-পথ-ঘাট জনপদ। নদীশাসন করায় (পরিকল্পিত ড্রেজিং) চীনের মানুষের দুঃখ ঘুচেছে। হোয়াংহো এখন হয়ে গেছে চীনের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ। হোয়াংহোর মতোই এখন বাংলাদেশের রংপুর অঞ্চলের ‘পাগলা নদী’ খ্যাত তিস্তা ড্রেজিং করে কোটি মানুষের দুঃখ ঘোচানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন এই অঞ্চলের মানুষ।
সূত্র জানায়, কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্টে অর্থায়নের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত বছরের ২৬ মে একটি চিঠি পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনে। চিঠিতে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ঋণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পরে জুলাই মাসে চীনা দূতাবাসে ঋণ চেয়ে চিঠি পাঠায় ইআরডি।
এ চিঠিতে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে ঋণ চাওয়া হয়েছে ৫৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৬ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। প্রক্রিয়াকরণ শেষে প্রকল্পের ডিপিপি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলে ২০২৬ থেকে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
সূত্র আরও জানায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এর আগে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল চীন। সেটি বাস্তবায়ন হলে বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ভাগ্য। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বাড়বে। বন্যার পানি প্লাবিত হয়ে ভাসাবে না গ্রামগঞ্জের জনপদ। সারা বছর নৌ চলাচলের মতো পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা যাবে। এতে আছে ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, নদীর দুপারে ১৭৩ কিলোমিটার তীর রক্ষা, চর খনন, নদীর দুই ধারে স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ, বালু সরিয়ে কৃষিজমি উদ্ধার ও ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা এবং প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন। নৌবন্দর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দুই পারে থানা, কোস্ট গার্ড ও সেনাবাহিনীর জন্য ক্যাম্পের ব্যবস্থা।
(যুগান্তর)