শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০১:০২ পূর্বাহ্ন




গ্যাস সরবরাহ আরও কমেছে, ঢাকায়ও লোডশেডিং

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ১০:১২ am
বিদ্যুৎ loadshedding energy crisis electricity power grid বিদ্যুত বিভ্রাট লোডশেডিং মেগাওয়াট
file pic

চলমান গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ কার্গো মহেশখালীর দুই টার্মিনালের কোনোটিই গ্রহণ করেনি। এ কারণে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ নেমে এসেছে এর অর্ধেকে। গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৯ সালে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল গড়ে ১৭৫ কোটি ঘনফুট।

গ্যাসের এমন ঘাটতির পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। ফলে শিল্প, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের জোগান আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতি সামলাতে গত বুধবার রাত থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১৫ হাজার ২২৬ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট। দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ঘাটতি দেখা যায় রাত ২টায়– ২ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট। পরে চাহিদা কমার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতিও কমে আসে। বিকেল ৫টায় ঘাটতি ছিল ৩৭৭ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা ৬টায় ৩৭৬ মেগাওয়াট।

আগের দিনগুলোর তুলনায় গতকাল সামগ্রিক ঘাটতি কম ছিল। গত ৯ আগস্ট সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। ১০ আগস্ট ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। ১১ আগস্ট ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট। সেখানে গতকাল সর্বোচ্চ ঘাটতি ২ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াটে নেমেছে।

অর্থাৎ ১০ আগস্টের তুলনায় সর্বোচ্চ ঘাটতি কমেছে ১ হাজার ১২০ মেগাওয়াট। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদাও কমে আসে। ১০ আগস্ট রাত ৯টায় যেখানে চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫৯৬ মেগাওয়াট, সেখানে গতকাল সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রে জোগান বাড়ানো এবং সার্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় লোডশেডিং কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, এলএনজি টার্মিনালের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা করেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আপাতত সরকারের সামনে তেমন কোনো বিকল্প নেই।

গ্যাস সরবরাহ নিম্ন পর্যায়ে
মহেশখালীতে এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের ক্ষমতা দিনে ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই আগুন লাগার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে এলএনজি সরবরাহে সামিটের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

সামিট এক পর্যায়ে দিনে সর্বোচ্চ ৫৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করলেও পরে তা ৫০ কোটি ঘনফুটে রাখা হয়। তবে গত সোমবার এলএনজি নিয়ে একটি নতুন কার্গো বঙ্গোপসাগরে পৌঁছালেও সমুদ্র উত্তাল থাকায় সেটি টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে মজুত এলএনজি ব্যবহার শুরু করে সামিট। মজুত দ্রুত শেষ হওয়া ঠেকাতে সোমবার সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ কমানো হয়। মঙ্গলবার তা ২০ কোটি ঘনফুটে এবং বুধবার থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ১০ কোটি ঘনফুট করে দেওয়া হচ্ছিল। গতকাল বিকেলে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
স্বাভাবিক সময়ে দেশে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকেই আসে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ ৩০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় মোট সরবরাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে। বুধবারও এই সরবরাহ ছিল ২০৩ কোটি ঘনফুট।

গ্যাসের এই ঘাটতিতে দেশের ছয়টি বিতরণ সংস্থাই চাপে পড়েছে। সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা তিতাসের দৈনিক চাহিদা ১৯০ থেকে ২০০ কোটি ঘনফুট হলেও স্বাভাবিক সময়ে তারা পায় ১৫৫ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সংকট শুরুর পর যা ১২০ কোটি ঘনফুটে এবং গত দুই দিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটে নেমেছিল। সামিটের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় গতকাল সন্ধ্যার পর তিতাস এলাকায় গ্যাস সরবরাহ আরও কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরামকোর কার্গো গ্রহণ করেনি দুই টার্মিনাল
গ্যাস সংকটের মধ্যেই সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ নামে একটি এলএনজি কার্গো মহেশখালীর দুই টার্মিনালের কোনোটিই গ্রহণ করেনি। এডিএনওসির মাধ্যমে সরবরাহ করা কার্গোটি নিয়ে বীমা-সংক্রান্ত আপত্তি থাকায় সেটি টার্মিনালে ভেড়ানো যায়নি।
পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানান, কার্গোটি পরিবর্তনের জন্য আরামকোকে বলা হয়েছে। সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কোনো কার্গো গ্রহণের অনুপযোগী হলে তা পরিবর্তনের স্পষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া অনুকূলে এলে শনিবার সামিটের টার্মিনালে নতুন কার্গো যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার একজন পরিচালক জানিয়েছেন, আজ শুক্রবার রাতে সমুদ্র শান্ত হলে আগামীকাল শনিবার ভোরে জাহাজ থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর শুরু হতে পারে। প্রক্রিয়াটি ঠিকভাবে সম্পন্ন হলে শনিবার দুপুরের পর সামিট আবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস দেওয়া শুরু করতে পারবে। শুক্র ও শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় বিদ্যুৎ-জ্বালানির চাহিদাও কিছুটা কম থাকবে। তাই সামিটের সরবরাহ শুরু হলে সংকটের চাপ কিছুটা কমবে।

তবে সামিটের সরবরাহ বাড়লেই গ্যাস পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ নেই। এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আরও ৭২ ঘণ্টা টার্মিনালটির গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। সামিটের সরবরাহ বাড়লেও অন্যদিকে এক্সিলারেটের পরীক্ষা শুরু হলে জাতীয় গ্রিডে আবার নতুন করে চাপ পড়বে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এক্সিলারেটের ৩০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার দুটি বয়লারের মধ্যে একটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অক্ষত বয়লারটি দিয়ে ৬ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালুর কাজ চললেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দিষ্ট সময় এখনও ঠিক হয়নি।

বিদ্যুতে গ্যাস বাড়লেও কমেছে শিল্পে
গ্যাসের মোট সরবরাহ কমলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দিনে প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। সার উৎপাদনে যাচ্ছে ১৪ কোটি ঘনফুট। ফলে শিল্প, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে অবশিষ্ট থাকছে মাত্র ৮৫ কোটি ঘনফুট। তিন সপ্তাহ আগেও এসব খাতে ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।
বিদ্যুৎ ঠিক রাখতে গিয়ে শিল্পে গ্যাস সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।

রাজধানীতেও লোডশেডিং
ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকোর দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাত থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হয়েছে। রাত ১১টার পর পান্থপথ, যাত্রাবাড়ী, রাজাবাজার, লালমাটিয়া, মণিপুরিপাড়াসহ একাধিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিপিডিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার একজন গ্রাহককে গড়ে প্রায় এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মধ্যে পড়তে হতে পারে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD