পররাষ্ট্রনীতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম ছয় মাসে শহীদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানকে সমুন্নত রেখে বাংলাদেশকে গর্বিত করেছেন। আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, সরকারের এই দৃঢ় ভূমিকায় আমি সুখকরভাবে বিস্মিত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী এবং তার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ পররাষ্ট্রবিষয়ক টিমকে অভিনন্দন জানাই।
আগে আমার বিস্ময়ের কারণ ব্যাখ্যা করে তারপর প্রাসঙ্গিক ভূরাজনৈতিক আলোচনায় যাব।
২০১৬ সালের নভেম্বরের শেষে কারাগার থেকে মুক্তি এবং ২০১৮ সালের আগস্টের শেষে নির্বাসনে যাওয়ার মধ্যবর্তী প্রায় দুই বছরে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আমার মনে হয়েছিল যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় হেজেমনির বিষয়ে আগের দৃঢ় অবস্থান থেকে বেশ খানিকটা সরে গেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে বিজেপির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনার জন্য দলের পক্ষ থেকে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে দিল্লিতে পাঠানো হলে বিএনপির নমনীয়তার বিষয়ে আরো নিশ্চিত হয়েছিলাম। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রেমে মগ্ন ভারত বিএনপির আন্তরিক উদ্যোগকে সেদিন রীতিমতো উপেক্ষা করেছিল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর অনেকটা অকূটনৈতিক ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে তার সরকারের কোনো আগ্রহ নেই। আমি নিশ্চিত, সেদিনের হিমালয়সম ভুলের কারণে দেশটির উদ্ধত নীতিনির্ধারকরা এখন হাত কামড়াচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় একঘরে হয়ে পড়ার জন্য একে অন্যকে দুষছেন।
নির্বাসনের ছয় বছরে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আমার তেমন যোগাযোগ ছিল না। প্রথমে মালয়েশিয়া এবং পরে তুরস্কের নির্বাসিত জীবনে, খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে আমার মতো করে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার এবং ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টা করে গেছি। পক্ষান্তরে দেশ এবং বিদেশে বিএনপি ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে ও অন্যত্র সাধ্যমতো আন্দোলন অব্যাহত রাখলেও ভারতের ব্যাপারে নেতৃত্ব বেশ দোদুল্যমান ছিল বলে আমার কাছে তখন মনে হয়েছিল। সম্প্রতি দলের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত রুহুল কবির রিজভী এবং দলটির আরো দু-একজন নেতা ভারতের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে প্রকাশ্য অবস্থান নিলেও অন্য সিনিয়র নেতারা ভারতের সঙ্গে ক্রমাগত সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলে গেছেন।
ইন্ডিয়ান পণ্য বয়কট আন্দোলনের সময় রুহুল কবির রিজভীর সেই গায়ের ভারতীয় চাদর ছুড়ে ফেলে দিয়ে আগুনে পোড়ানোর দৃশ্য আমার সবসময়ই মনে পড়ে। পররাষ্ট্রনীতিতে এই আপাতত ভারসাম্য বজায় রাখাটাই হয়তো দলের কৌশল ছিল। আমি পেশায় রাজনীতিবিদ নই। ঘটনাচক্রে একেবারেই অন্য পেশা থেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে কখনো কৌশলের ধার ধারিনি। চাণক্যনীতির ভন্ডামিতে আমি বিশ্বাস করি না। শহীদ জিয়াকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে দেশের প্রতি তার অপরিসীম ত্যাগ ও সাহসকে সর্বদা শ্রদ্ধা করেছি। কাছে থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের সম্মানের প্রশ্নে সর্বদা আপসহীন দেখতে পেয়েছি। সুতরাং, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের বাস্তবতা অনুধাবন করলেও বিএনপির ২০১৮ সাল-পরবর্তী অবস্থানে আমি ব্যক্তিগতভাবে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিল, এই বিএনপির রাজনীতিতে আমি একেবারেই বেমানান।
জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়ে শেখ হাসিনা দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর ভারত সরকারের নগ্ন বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখালেও বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে ভারতের প্রতি অব্যাহত নমনীয়তা প্রকাশ পেয়েছিল। তারা ড. ইউনূস সরকারের সাহসী পররাষ্ট্রনীতিকে প্রকাশ্য সমর্থন করা থেকে বিরত থেকেছেন। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচন পর্যন্ত ভারত প্রশ্নে সুবিধাবাদী রাজনীতি করেছে। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটের জন্য বিএনপির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে জামায়াত নেতারাও ভারতের নাম মুখে আনা থেকে মোটামুটি বিরতই ছিলেন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরই শুধু ভারতের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দলটি খানিকটা সোচ্চার হয়েছে। একমাত্র এনসিপির তরুণ নেতারা প্রথাগত রাজনীতিতে প্রবেশ করেও ভারতকে সন্তুষ্ট করার কোনো ধরনের চেষ্টা করেননি। এই তরুণরাই দেখাতে পারছেন যে, দিল্লিকে খুশি না করে বাংলাদেশে সরকারে যাওয়া যায় না, জাতীয় ‘মিথ’কে তোয়াক্কা না করেও এ দেশে রাজনীতি করা যায়। এনসিপিকেও অভিনন্দন। আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃত অর্থেই জুলাই বিপ্লবকে যে রাজনৈতিক দল ধারণ করে, সেই দল চরম ইসলামবিদ্বেষী, হেজেমনিক ভারতকে কখনো তোষামোদ করতে পারে না। আগ্রাসী-নীতি পরিবর্তন ব্যতিরেকে ভারত বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী জনগণের বন্ধুত্ব আশা করতে পারে না।
নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর সর্বমহলে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে সম্ভবত ভারতেই যাবেন। নির্বাচনের আগে ভারত সরকার এবং দেশটির মিডিয়া ড. ইউনূসকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে অবিরাম প্রচার করেছে। বেগম জিয়ার মৃত্যুতে ঢাকায় শোক জানাতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এমন একটি ধারণার সৃষ্টি করেছিলেন যে তারা বিএনপিকেই ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছেন। নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপিও ভারতকে সরাসরি সমালোচনা করে কোনো বক্তব্য দেয়নি। বরং, নির্বাচনের সময় ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’র বিপ্লবী স্লোগানের বিপরীতে বিএনপির স্লোগান, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ… সবার আগে বাংলাদেশ’ ভারতকে যথেষ্ট সন্তুষ্ট করেছিল। দিল্লি এবং পিন্ডিকে এক কাতারে এনে বিএনপি হয়তো ভারতকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিল। নির্বাচনের আগে এবং পরে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামির দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকলে শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের ভারতপন্থি সব রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী ক্রমেই বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন।
অনেকে সরকারি দলে ঢুকেও গেছেন। এই রাজনৈতিক মেরূকরণের বাস্তবতায় তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকলেও, তার প্রথম মালয়েশিয়া এবং চীন সফরের সিদ্ধান্ত পররাষ্ট্রনীতিতে মুনশিয়ানার প্রমাণ দিয়েছে। এই এক বার্তা দিয়েই তিনি দিল্লিকে রীতিমতো ঘাবড়ে দিয়েছেন। মানুষ ঘাবড়ে গেলে ভুল করবেই। প্রাচীন কূটনীতিতে প্রবাদসম চাণক্যের দেশ ভারতও যে সেই ভুলের ব্যতিক্রম নয়, সেটি দেশটির পরবর্তী হঠকারী কর্মকাণ্ডে প্রমাণিত হয়েছে। তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলে ফেলেছে, বাজারে যার কোনো ধরনের মূল্য আর অবশিষ্ট নেই। ভুল চাল দিয়ে সংবিৎ ফেরা মাত্র দিল্লি পরিস্থিতি শোধরাতে সব ধরনের কৌশল ব্যবহার করেও আপাতত তাদের পরাজয় মেনে নিয়ে ভবিষ্যৎ সুযোগের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় দেখছি না।
ভারত প্রথমে ব্রিকস সামিট আয়োজনের সুযোগ নিতে চেয়েছে। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা হয়তো মনে করেছিলেন, বিশ্বের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী নেতার সঙ্গে সাক্ষাতের এই সুযোগ তারেক রহমান হারাতে চাইবেন না। পাঠক, ভেবে দেখুন, শেখ হাসিনা এমন দাওয়াত পেলে কী করতেন? ২০১৮ সালের ভুয়া নির্বাচনের পর দুনিয়ার কাছে অচ্ছুত শেখ হাসিনা বিদেশের হাতে-পায়ে ধরে দাওয়াত নিতেন। আন্তর্জাতিক কোনো অনুষ্ঠানে কোনোক্রমে দাওয়াত জোগাড় করতে পারলে তিনি প্রতিবার বাংলাদেশের ইজ্জতের বারোটা বাজিয়ে এসেছেন। দিল্লির সেই ঘটনার কথা স্মরণ করুন, যেদিন নেতাদের সারি ভেঙে শেখ হাসিনা পরনের শাড়ি উঁচু করে ঘাসের ওপর দৌড়ে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও অন্যান্য প্রথম সারির নেতাদের পাশে যেতে চাইলে মোদির ইঙ্গিতে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে একেবারে পেছনে ঠেলে দিয়েছিল। আর একবার মুখভর্তি খাবার নিয়েই প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছে দৌড়ে গিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ওবামা তাকে শান্তভাবে খাওয়া শেষ করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন হাসিনারূপী একজন নিম্নপর্যায়ের কর্মচারীর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে একটি স্বাধীন দেশের জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করতে হয়, সেটি দিল্লি ভুলে গিয়েছিল। এবারের ঘটনায় তারেক রহমান সম্ভবত সেটি তাদের শেখাতে পেরেছেন। তাকে ভারতে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের সব এজেন্টকে মাঠে নামানো সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত দিল্লির উদ্দেশ্য সফল হয়নি। এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশের সব চিহ্নিত ভারতপন্থি, সুশীল মিডিয়া তারেক রহমানকে ভারত সফরে সম্মত করাতে ‘সিন্ডিকেটেড’ সংবাদ ছেপেছে। এমনকি বিবিসিও পিছিয়ে থাকেনি। কোনো কোনো পত্রিকা সফরের পক্ষে এজেন্সি সরবরাহ করা সংবাদ ছেপেও বিব্রত হয়েছে। বিভ্রান্ত করার সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অপ্রস্তুত অবস্থায়, তড়িঘড়ি সফর বাংলাদেশ এবং সরকারের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত।
ভারত আমাদের বন্ধু না হলেও নিঃসন্দেহে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের সুবিধার্থে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারস্পরিক সফরও অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর কোনো আন্তর্জাতিক সামিটের ‘সাইডলাইনে’ কিংবা কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ করে হতে পারে না। দ্বিপক্ষীয় সফরের নামে ফটোসেশনের কোনো ফায়দা নেই। ভারতের সঙ্গে আমাদের অনেক অনিষ্পন্ন বিষয় সমাধানের জন্য বিশদ আলোচনা ও দরকষাকষি প্রয়োজন হবে। শেখ হাসিনাসহ অন্য পলাতক অপরাধীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ এ বছর শেষ হচ্ছে। তিস্তাচুক্তি বহুদিন ধরে ঝুলে আছে। ভারত অব্যাহতভাবে সীমান্ত হত্যা করে চলেছে এবং ভারতীয় বাংলা ভাষাভাষী নাগরিকদের পুশইন অব্যাহত রেখেছে। ভারতীয় মাদক আগ্রাসনে আমাদের যুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে। সীমান্তে চোরাচালান উভয় দেশের জন্য ক্ষতি ও উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশে কিছুদিন পরপর যে তথাকথিত ইসলামি উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, সেখানেও ভারতীয় সংযোগ রয়েছে। ভারতে মুসলমান সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক জুলুমের প্রতিক্রিয়ায় আমাদের দেশের শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হচ্ছে। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, যোগাযোগ, ক্রিকেট খেলা, ভিসা ইত্যাদি তো আছেই। এসব সমস্যার সমাধানে ভারত সরকারের সঙ্গে আন্তরিক ও অর্থপূর্ণ আলোচনা প্রয়োজন। এই বছরের মধ্যেই উভয় দেশের জন্য সুবিধাজনক সময়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তবে আপাতত ঘরে এবং বাইরের চাপ উপেক্ষা করে তারেক রহমান কৌশলের প্রতিযোগিতায় নরেন্দ্র মোদিকে প্রাথমিকভাবে পরাজিত করেছেন। তাকে আবারও অভিনন্দন।