মেয়ে শিরি বেগমের কাছে বেড়াতে যাবেন বলে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন ফিরোজা বেগম (৭৫)। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গুজিয়া গ্রামে মেয়ের বাড়িতে পৌঁছানো আর হলো না তার। পথিমধ্যেই ঘটলো করুণ এক ট্র্যাজেডি। মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হলো এই বৃদ্ধাকে। শুক্রবার সকালে মোকামতলা-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের শিবগঞ্জ উপজেলার গোপীনাথপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পথচারী ফিরোজাকে বাঁচাতে গিয়ে জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীকে বহনকারী সরকারি গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে ধানখেতে নেমে যায়। এতে প্রতিমন্ত্রী ও তার স্ত্রী নাজমা আরা বেগম আহত হন এবং বৃদ্ধা ফিরোজা গুরুতর আঘাত পান। পরে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ১২টার দিকে না ফেরার দেশে চলে যান ফিরোজা।
নিহত ফিরোজা বেগম শিবগঞ্জের গোবিন্দপুর গ্রামের প্রয়াত নিজামউদ্দীন সরকারের স্ত্রী। দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ের জননী ফিরোজা বহুকাল আগেই স্বামীকে হারিয়েছেন। বড় ছেলে ফেরদৌস মারা যান কয়েক বছর আগে। ছোট ছেলে সেলিম সরকার পেশায় কৃষক। স্বামীর মৃত্যুর পর বড় ও ছোট ছেলের স্ত্রীদের সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারেই দিন কাটছিল তার। শাশুড়ির এমন আকস্মিক বিয়োগে বাকরুদ্ধ স্বজনরা। ছোট ছেলের স্ত্রী রেশমা বেগম কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, সকালে মেয়ের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে শাশুড়ি হাসিমুখে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবিত আর ফিরে এলেন না, ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। অন্যদিকে, বড় ছেলের স্ত্রী রিপা বেগম শাশুড়িকে নিজের মাথার ওপরের ছাদ ও বটবৃক্ষের ছায়ার সঙ্গে তুলনা করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিহত বৃদ্ধার স্বজন জাকির হোসেন জানান, পারিবারিক টানাপোড়েনের মধ্যেও স্বাবলম্বী থাকার চেষ্টা করতেন তারা। বার্ধক্যের কারণে মহাসড়ক পার হওয়ার সময় অসাবধানতাবশত প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এটি নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাদআসর পারিবারিক গোরস্থানে মরহুমার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানান শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুজ্জামান।
প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি ধানখেতে, স্ত্রীসহ আহত আবদুল বারী: সরকারি সফরে নিজ এলাকা জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় যাওয়ার পথে বগুড়ার শিবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। এক পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁকে বহনকারী সরকারি গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে ধানখেতে পড়ে যায়। এতে প্রতিমন্ত্রী ও তার স্ত্রী নাজমা আরা বেগম আহত হন। শুক্রবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে জয়পুরহাট-মোকামতলা আঞ্চলিক মহাসড়কের কিচক বাজারসংলগ্ন গোপীনাথপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী তার স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা থেকে জয়পুরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। বহরের সামনে ছিল পুলিশের একটি নিরাপত্তা গাড়ি।
গোপীনাথপুর এলাকায় নিরাপত্তা গাড়িটি পার হয়ে যাওয়ার পরপরই হঠাৎ ফিরোজা বেগম নামের এক বৃদ্ধা মহাসড়ক পার হতে যান। একেবারে গাড়ির সামনে চলে আসা সেই নারীকে রক্ষা করতে গিয়ে চালক দ্রুত ব্রেক কষলে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের ধানখেতে ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনার মুহূর্তটির বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী নাজমা আরা বেগম জানান, পুলিশের স্কট গাড়িটি পার হওয়ার পর পরই হঠাৎ এক নারী সড়ক পার হতে তাদের গাড়ির একেবারে মুখোমুখি চলে আসেন।
তাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে গিয়েই চালক গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং গাড়িটি ধানখেতে নেমে পড়ে। এই ঘটনায় তার স্বামী ও তিনি নিজে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা ও নিরাপত্তা পুলিশের সদস্যরা তাদের দ্রুত উদ্ধার করেন। শিবগঞ্জ থানার ওসি শাহীনুজ্জামান নিশ্চিত করেন যে, দুর্ঘটনার পর প্রতিমন্ত্রী ও তার স্ত্রীকে প্রাথমিক সহায়তার পর বিকল্প একটি বাহনে জয়পুরহাটে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি উদ্ধারে তাৎক্ষণিক কাজ শুরু হয়।
আহত প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায়: সড়ক দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীকে আশঙ্কামুক্ত অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। জয়পুরহাট ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বিকেলে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক আল-মামুন মিয়া জানান, দুর্ঘটনার কারণে প্রতিমন্ত্রী তার পূর্বনির্ধারিত স্থানীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি।
জয়পুরহাট হাসপাতালে প্রাথমিক পরিচর্যা শেষে দুপুর আনুমানিক একটার দিকে তাকে বহনকারী এম্বুলেন্সটি ঢাকার উদ্দেশ্যে হাসপাতাল ত্যাগ করে। প্রতিমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে চিকিৎসকদের আশ্বস্ত বার্তা মিলেছে। জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সরদার রাশেদ মোবারক জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রতিমন্ত্রীর কোনো অস্থি ভঙের প্রমাণ মেলেনি। তবে তার ডান পায়ে ‘সফ্ট টিস্যু ইনজুরি’ হয়েছে। এছাড়া হাত, কাঁধ ও ঘাড়ে মৃদু চোট পেয়েছেন। পায়ে প্রাথমিক ‘শর্ট লেগ’ প্লাস্টার করে বাঁধন দেয়া হয়েছে। বাড়তি সতর্কতা ও সুচিকিৎসার স্বার্থে পরামর্শক্রমেই তাকে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।