বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৯ অপরাহ্ন




সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে দেশজুড়ে তুলকালাম

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫৭ am
fertiliser Ministry of Land জমি জরিপ ভূমি মন্ত্রণালয়Urea ইউরিয়া সার Urea Fertilizer ইউরিয়া ফার্টিলাইজার সার fertiliser Urea Fertilizer ইউরিয়া ফার্টিলাইজার সার
file pic

* নীতি ভেঙে পছন্দের লোকদের নিয়োগের অভিযোগ

* অনিয়মকারীরাই অনিয়ম দেখভালের দায়িত্বে

* তদন্তে ভরসা গোয়েন্দা রিপোর্ট

* চার ইস্যুতে অভিযোগ আমলে নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়

সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে নীতিমালা লঙ্ঘন করে ফ্যাসিস্টের অনুসারী ও অনভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ে কয়েকশ আবেদন জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি গুরুতর অনিয়মের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খতিয়ে দেখছে মন্ত্রণালয়। তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও আমলাদের তদবির উপেক্ষা করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ডিলার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ জানাতে বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা মন্ত্রণালয়ে আসছেন। গত রোববার সরকারদলীয় একজন এমপি, সংরক্ষিত নারী আসনের তিনজন এমপি এবং কৃষক দলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের অভিযোগ জানান।

গত সোমবার ঝিনাইদহে একটি অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, আইনি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস সোমবারও অনিয়মের অভিযোগে পাঁচ-ছয়টি আবেদন জমা পড়ে। এর আগে একই ধরনের প্রায় ৫০০ আবেদন জমা হয়েছে।

ভরা মৌসুমের আগে সমাধানের তাগিদ

আগামী নভেম্বর থেকে সারের ভরা মৌসুম শুরু হচ্ছে। আলু, ভুট্টা, গম ও শীতকালীন সবজি চাষে এ সময় সারের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু ডিলার নিয়োগের জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। মাঠ পর্যায়ে সার না পাওয়ার অভিযোগও উঠছে। ফলে অস্বস্তিতে রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

তবে সারের মজুতে ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন সার ব্যবস্থাপনা শাখার কর্মকর্তারা। তারা বলেন, সৌদি আরব, বেলারুশ, মরক্কো ও কানাডা থেকে সার আমদানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া সারের ব্যাপক চাহিদা শুরুর আগেই ডিলার নিয়োগ ইস্যু সমাধানের দিকে এখন মন্ত্রণালয়ের নজর বেশি।

চার বিষয়ে তদন্ত

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ডিলার নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে চার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে অনিয়ম, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ, ফ্যাসিস্টদলীয় লোকদের ডিলার নিয়োগের সুপারিশের নেপথ্য কারণ এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করে কাউকে ডিলার হিসেবে নির্বাচনের কারণ অনুসন্ধান।

মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সরকার ও বিরোধীদলীয় এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও আমলাদের কেউ কেউ পছন্দের ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে কৃষিমন্ত্রী এবং সচিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে মন্ত্রণালয় এসব তদবির আমলে নেয়নি। বাছাই কমিটির তালিকায় প্রথম স্থানে থাকা ব্যক্তিকেই নিয়োগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল বলে তারা জানান।

কৃষি সচিব সেলিম খান বলেন, মন্ত্রণালয় নীতিমালা ও জেলার সুপারিশের ভিত্তিতে সারা দেশে সার ডিলার নিয়োগ দিয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের তদারকি কমিটির সুপারিশে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেলে কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে আমলযোগ্য অভিযোগ খুবই কম। প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক জেলা বগুড়া থেকেও বেশকিছু আবেদন এসেছে। গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১০ জন ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ইউএনও এবং জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। ডিলার নিয়োগের সুপারিশ ও যাচাই-বাছাইয়ে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের অভিযোগ, নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির হয়েছে। কোথাও কোথাও সংসদ সদস্যদের আধাসরকারি চিঠি (ডিও লেটার) ব্যবহার এবং ইউএনও-ডিসির কাছে তদবিরের জন্য অর্থ লেনদেনের চুক্তির অভিযোগও রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ডিসিরা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ তদন্তে কয়েকটি জেলার প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। গত ১৩ অক্টোবর যশোরের জেলা প্রশাসক আশেক এলাহী তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। মনিরামপুর, অভয়নগর ও চৌগাছা উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিজস্ব গুদাম না থাকা ব্যক্তি ও অনভিজ্ঞদের ডিলারের জন্য সুপারিশ, ইউএনওর তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তিকে ডিসির সুপারিশে প্রথম স্থানে নিয়ে আসা, রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমলে নেওয়া এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে নিয়োগ প্রদান।

পাইকগাছা, বাঘারপাড়া ও ডুমুরিয়ায় অভিযোগ

খুলনার পাইকগাছায় সার ডিলার নিয়োগে অস্বচ্ছতা, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা কমিটির পাঠানো তালিকা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত ঊর্ধ্বতন মহলের কথা বলে পরিবর্তনের জন্য চাপ দেন। পরে জেলা বিএনপি ও প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে একাধিক ইউনিয়নে যোগ্যদের বাদ দিয়ে নিচের সারির ডিলারদের চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী কপিলমুনি ইউনিয়নে প্রথম স্থানে থাকা মেসার্স পপি এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে তৃতীয় স্থানে থাকা মেসার্স দৃশান এন্টারপ্রাইজকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ষোলাদানা ইউনিয়নে এসকেআর এন্টারপ্রাইজের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স সুমি এন্টারপ্রাইজ এবং গড়াইখালী ইউনিয়নে মেসার্স যাবিন স্টোরের পরিবর্তে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসার্স অর্ণব এন্টারপ্রাইজকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ইউএনও এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত তালিকার বাইরে দলীয় বিবেচনা ও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে এই বিতর্কিত নিয়োগ সম্পন্ন হয়।

অভিযোগ অস্বীকার করে ডিসি হুরে জান্নাত বলেন, কমিটির বিবেচনা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাকে প্রথম স্থানে রাখার প্রয়োজন, তাকেই রাখা হয়েছে। এরপরও সুপারিশে অনিয়ম থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ৮ নম্বর বাসুয়াড়ী ইউনিয়নে হাবিবুর রহমানকে সার ডিলারশিপ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন। তার অভিযোগ, একাধিক প্রতারণা, অস্ত্র ও মাদক মামলার আসামি এবং নিজস্ব গুদামঘর নেই—এমন একজনকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তবে হাবিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করায় প্রতিপক্ষরা মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন। সব নিয়ম মেনেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেন।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া বাজারে মেসার্স মোল্ল্যা কৃষি ভান্ডারের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন বিএনপি নেতার ছেলে রিয়াদ মোহাম্মদ। তার নিজস্ব সার বিক্রির দোকান ও গুদাম নেই—এমন অভিযোগ তুলে ডিলারশিপ বাতিলের আবেদন করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী সবুজ মোড়ল।

অন্যদিকে ডুমুরিয়ার মাগুরখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে একটি মিষ্টির দোকানকে গুদাম হিসেবে দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, দোকানটি অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া ছিল এবং দ্রুত খালি করা হচ্ছে। আগে আওয়ামী লীগের পদে থাকলেও বর্তমানে বিএনপির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানান তিনি। তার দাবি, নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন।

ডুমুরিয়ায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ইউএনও সবিতা সরকার জানান, পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ব্যস্ত থাকায় পরে যোগাযোগ করবেন।

অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা

কৃষি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর খাতে সার ডিলার নিয়োগে জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অনুপযুক্ত গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ নেওয়া কিংবা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রতারণা বা বিশ্বাস ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় এবং সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে দুদকের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আমার দেশ




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD