শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২২ পূর্বাহ্ন




রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি

অনন্য শৈলীর রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়ি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০২৩ ১:০৫ pm
Tajhat Palace Tajhat Jamidar Bari Rangpur FAMOUS TAJHAT ZAMINDAR HOUSE tajhat তাজহাট জমিদার বাড়ি রংপুর জেলা
file pic

তাজহাট রাজবাড়ি বা তাজহাট জমিদারবাড়ি বাংলাদেশের রংপুর শহরের অদূরে তাজহাটে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ, যা এখন একটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রংপুরের পর্যটকদের কাছে এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান। রাজবাড়িটি রংপুর শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

প্রথমে তাজহাট জমিদারবাড়ি, তারপর রংপুর হাইকোর্ট। নির্মাণশৈলীর অনন্য নিদর্শন ও ইতিহাসের সাক্ষী এই স্থাপনা এখন রংপুর জাদুঘর। বাড়িটির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ।

তাজহাট জমিদার বাড়িটি রংপুর জাদুঘর থেকে প্রায় ৪ মাইল পূর্ব দক্ষিণে কোণে বর্তমান কৃষি ইনস্টিটিউট পাশে সবুজ গাছপালা পরিবেষ্টিত আর্কষর্ণীয় পরিবেশে অবস্থিত। জমিদার বাড়ির সামনে রয়েছে সমসাময়িককালে খননকৃত বিশাল আকৃতির ৪টি পুকুর। বর্তমান তাজহাটে বাজার হতে উত্তর দিক দিয়ে প্রধান ফটক অতিক্রম করে ক্রমান্বয়ে পশ্চিমে কয়েকশ’গজ পেরিয়ে জমিদার বাড়ির প্রধান প্রবেশ পথে আসা যায়।

বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন জমিদার মান্না লাল রায়। তিনি ভারতের পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন। প্রথম দিকে পেশায় ছিলেন স্বর্ণকার। স্বর্ণখচিত টুপি কিংবা তাজ নির্মাণ করায় এ অঞ্চলের নাম হয়েছে তাজহাট। ব্রিটিশ শাসনামলে তিনি পুরো একটি পরগনা কিনে নিয়ে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৃত্যুর পর জমিদারির দায়িত্ব পান পুত্র গিরিধারী লাল রায়।

তাজহাটের জমিদার বংশের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন গিরিধারী লাল রায়। ১৮৯৭ সালে তার মৃত্যু হলে পুত্র গোবিন্দ লাল রায় জমিদারি লাভ করেন। জমিদার গিরিধারী লাল রায় ছিলেন প্রজাহিতৈষী ও দানশীল। এ জন্য তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ১৮৮৮ সালে রাজা, ১৮৯২ সালে রাজা বাহাদুর এবং ১৮৯৬ সালে মহারাজা উপাধিতে ভূষিত হন। এ সময়টি ছিল তাজহাটের জমিদারদের সোনালি অধ্যায়। পরে জমিদার গোবিন্দ লাল রায়ের মৃত্যু হলে তার পুত্র গোপাল লাল রায় জমিদার নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন এই বংশের শেষ জমিদার। তিনিও ১৯১২ সালে রাজা ও ১৯১৮ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রাজাবাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে গোপাল লাল রায়ের বংশধররা ভারতে চলে যান।

৫৬ একর এলাকাজুড়ে রয়েছে এ কমপ্লেক্সটি। পূর্বমুখী দোতলা এ বাড়িটির সামনের দিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৭ মিটার। বাড়ির সামনে রয়েছে বড় একটি দালান। এতে ওঠার জন্য রয়েছে শ্বেতপাথরে আবৃত দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি। বাড়ির ছাদের মূল অংশে আট কোনা পিলারের ওপর অবস্থিত রেনেসাঁ গম্বুজ। তাজহাট জমিদার বাড়ির নকশা অনেকটা ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো। বাড়িটিতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চোখ পড়ে ১৯ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪ মিটার প্রস্তের বিশাল হলঘরে। এর দুই দিকে রয়েছে একটি করে ঘর। ভেতরে আছে তিন মিটার প্রশস্ত টানা বারান্দা। প্রধান ফটকের উত্তর দিকের দোতলায় বিশাল একটি কাঠের সিঁড়ি রয়েছে। পুরো ভবনে আছে মোট ২২টি ঘর। বাড়িটিতে গাড়ি রাখার বারান্দা প্রায় ১০ মিটার দীর্ঘ। এর ওপরে যে ঝুল বারান্দা রয়েছে, তার ছাদ চারটি পিলারের ওপর অবস্থিত। দুই প্রান্তের বারান্দায়ও রয়েছে ত্রিকোনাকৃতির ছাদ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটির অংশবিশেষ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের পর গোপাল লাল রায়, বর্তমানে যে ভবনটি রয়েছে, তার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। কাজ শেষ হয় ১৯১৭ সালে। ইতালি থেকে আমদানিকৃত শ্বেতপাথর দিয়ে তৈরি করা হয় বাড়ির সামনের অংশের সিঁড়ি। ভবনের সামনে মার্বেল পাথরের একটি ফোয়ারা রয়েছে।

মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে জাদুঘরে উঠলেই দেখা যায়, বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ, যাতে রয়েছে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম। এখানে রয়েছে সংস্কৃত এবং আরবি ভাষায় লেখা বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে রয়েছে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ের কোরআনসহ মহাভারত ও রামায়ন। পেছনের ঘরে রয়েছে বেশ কয়েকটি কালো পাথরের হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিকৃতি; কিন্তু জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রাসাদ চত্বরে রয়েছে বিশাল খালি মাঠ, গাছের সারি এবং প্রাসাদের দুই পাশে রয়েছে দুটি পুকুর। জাদুঘরে নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য পরিশোধ করে প্রবেশ করা যায়।

জানা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রাসাদটি ব্যবহৃত হয় রংপুর হাইকোর্ট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি শাখা বা বেঞ্চ হিসেবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা সদরে বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগের আঞ্চলিক বেঞ্চ স্থাপন করেন, যার একটি রংপুরে স্থাপিত হয়েছিল। পরে, ১৯৯১ সালে এই পদ্ধতি তুলে দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রাসাদটিকে একটি সংরক্ষিত স্থাপনা তথা স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করেন। ২০০২ সালে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। এই জাদুঘরে ৩শ’র বেশি মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে। প্রতিদিন দেশি ও বিদেশি পর্যটকরা এ বাড়ির সৌন্দর্য দর্শনে আসেন।

তাজহাট জমিদার বাড়ির কাস্টডিয়ান হাবিবুর রহমান বলেন, এই বাড়ি সপ্তাহে এক দিন দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবং বিদেশি দর্শনার্থীও আসেন বাড়িটি দেখতে।

Tajhat Palace Tajhat Jamidar Bari Rangpur FAMOUS TAJHAT ZAMINDAR HOUSE tajhat তাজহাট জমিদার বাড়ি রংপুর জেলা

file pic

তাজহাট জমিদার বাড়ি ও রংপুর জাদুঘর পরিদর্শনের সময়সূচি

গ্রীষ্মকালীন সময়ে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস ব্যাপী রংপুর জাদুঘর তথা তাজহাট জমিদার বাড়ি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর শীতকালীন সময় অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ মাস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পরিদর্শনের জন্য খোলা থাকে। দুপুর ১টা থেকে ১ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত রংপুর জাদুঘরে মধ্যাহ্ন বিরতির বন্ধ থাকে।

সপ্তাহের প্রতি রবিবার পূর্ণ দিবস, সোমবার অর্ধ দিবসের জন্য জাদুঘরটি বন্ধ থাকে। এছাড়াও সমস্ত সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘরটিতে পরিদর্শন বন্ধ থাকে।

তাজহাট জমিদার বাড়ি ও রংপুর জাদুঘর প্রবেশের টিকেট মূল্য

প্রাপ্তবয়স্ক সকল বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য রংপুর জাদুঘরে প্রবেশ করতে ২০ টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের তাজহাট জমিদার বাড়ি প্রবেশ করতে ৫ টাকা দিয়ে টিকেট সংগ্রহ করতে হয়, তবে ৫ বছরের কম বাচ্চাদের প্রবেশ করতে কোন টিকেট লাগে না। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীর প্রবেশের টিকেট মূল্য ১০০ টাকা এবং অন্য যেকোন বিদেশীদের প্রবেশ টিকেটের মূল্য ২০০ টাকা।

কিভাবে যাবেন

রাজধানী ঢাকার কল্যাণপুর, গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল হতে নিয়মিত ভাবে বিভিন্ন পরিবহণের বাস রংপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এসব বাসে চড়ে রংপুর যেতে জনপ্রতি ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা ভাড়া লাগে। রংপুর বাসষ্ট্যান্ড থেকে রিকশাযোগে তাজহাট জমিদার বাড়ি যেতে মাত্র ২০ টাকা ভাড়া লাগে। তবে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী বাসে চড়লে সরাসরি তাজহাট জমিদার বাড়ির সামনে নামা যায়।

কোথায় থাকবেন

রংপুরে ভালো হোটেলের মধ্যে রয়েছে- হোটেল শাহ আমানত (জাহাজ কোম্পানির মোড়), হোটেল গোল্ডেন টাওয়ার (জাহাজ কোম্পানির মোড়), হোটেল দি পার্ক (জাহাজ কোম্পানির মোড়), হোটেল তিলোত্তমা (থানা রোড), হোটেল বিজয় (জেল রোড), আরডিআরএস (জেল রোড)।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD