ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘ ১৫ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান হতে চলেছে। এ যুদ্ধে ২৩ লাখ ফিলিস্তিনির বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধ বিরতিতে পৌঁছাতে পেরেছে। খবর আল জাজিরা
আগামী রোববার থেকে তিন ধাপে এই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন হবে। ইতোমধ্যে হামাস এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেয়নি।
বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদনের কথা রয়েছে। এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শেষ মুহূর্তের সংকটের জন্য হামাসকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর উগ্র- ডানপন্থি জোট এ চুক্তিতে সম্মতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আম্মান থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক হামদাহ সালহুত বলেছেন, নেতানিয়াহু জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মতি প্রদানে দেরি হচ্ছে।
তিন মাস ধরে ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়িত হবে। যার মধ্যে রয়েছে- গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার এবং ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের মুক্তির বিনিময়ে হামাসের কাছে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি প্রদান।
কাতার, মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও যুদ্ধ পরবর্তী গাজা পুনর্গঠনেও আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোর ইসায়েলি হামলায় গাজায় প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
১৯ জানুয়ারি (প্রথম দিন)
গতকাল বুধবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহম্মাদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি ঘোষণা করেন, আগামী ১৯ জানুয়ারি থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। ওইদিন ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেয়া হবে এবং ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে আর কোনো গুলি চালানো হবে না।
গাজা উপত্যকার দেইর এল-বালাহ থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজম বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরও এখন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিলিস্তিনের বেসামরিক লোকেরা ইসরায়েলের হামলা নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। গত কয়েকদিন ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৮০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
আবু আজম আরও বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী গাজায় প্রতিদিন ৬০০ মানবিক সহায়তাকারী ট্রাক প্রবেশের কথা বলা হয়েছে, তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
এদিকে সহায়তা সংস্থাগুলো গাজায় নিরচ্ছিন্নভাবে মানবিক সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে। কারণ অনেক স্থানে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে।
হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হামাসের কাছে জিম্মি থাকাদের স্বজনরা। জিম্মি থাকা ওফার কালদেরনের চাচাতো ভাই ইফাত কালদেরন বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে তেল আবিবেও আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এটি বাস্তবায়িত হবে কিনা সেটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
জানুয়ারি ২৫ (সপ্তম দিন)
যুদ্ধবিরতির সপ্তম দিনে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের উত্তর গাজায় ফেরার অনুমতি দেয়া হবে। ওই এলাকায় গত অক্টোবর থেকে ভয়াবহ অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল বাহিনী।
এছাড়া এদিন উত্তর গাজার নেতজারিম করিডোরে গাড়ি এবং কোনো ব্যক্তিকে পায়ে হেঁটে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। করিডোরটি দক্ষিণ এবং উত্তর গাজাকে বিভক্ত করেছে। তবে মধ্যস্থকারীদের মাধ্যমে সমন্বয় করে একটি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে ইসরায়েলি পক্ষ গাড়িগুলো চেক করার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
একাধিক ফিলিস্তিনিরা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা সুযোগ পেলেই তাদের শহর এবং গ্রামে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। যুদ্ধে প্রায় ৯০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে।
গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় ১০ সন্তানের মধ্যে ২ জনকে হারানো ৬৬ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী উম মোহাম্মাদ আল জাজিরাকে বলেন, দ্রুতই যুদ্ধবিরতি দরকার, কারণ আমি আমার ভূমি বেইত হ্যাননে ফিরে তাকে চুমু দিতে চাই।
ফেব্রুয়ারি ৩ (১৬তম দিন)
যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার ১৬তম দিনে হামাস ও ইসরায়েল দ্বিতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি ৯ (২২তম দিন)
যুদ্ধবিরতির ২২তম দিনে আল রশিদ স্ট্রিট এবং সালাহ আল-বিন স্ট্রিট থেকে কোনো বাধা ছাড়াই উত্তর দিকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে।
মার্চ ১ (৪২তম দিন)
এদিন যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষ হবে। দ্বিতীয় ধাপে ১০০ কারাবন্দি ফিলিস্তিনিদের বিনিময়ে ৩৩ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেয়া হবে।
দ্বিতীয় ধাপে আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। বলা হচ্ছে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৬৪ জন জিম্মিকে মুক্তি দেয়ার কথা রয়েছে। এসব জিম্মিদের ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার করে নিতে হবে এবং যুদ্ধবিরতি স্থায়ী রুপ নিবে। এছাড়া জীবিত অথবা মৃত ৯৪ জন জিম্মি ইসরায়েলিদের বিনিময়ে ১০০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেয়া হবে। ধারণা করা হচ্ছে ৯৪ জন জিম্মিদের মধ্যে ৩০ জন নিহত হয়েছে।
গাজা ও মিশরকে পৃথক করা ফিলাদেলফিয়া করিডোর থেকে সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নিবে ইসরায়েল। যদিও যুদ্ধবিরতি নিয়ে হামাস মিশর, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত দিলেও ইসরায়েলে কোনো লিখিত দেয়নি।
মার্চ ৯ (৫০তম দিন)
এদিন ইসরায়েল ফিলাদেলফিয়া করিডোর থেকে সব সৈন্যদের প্রত্যাহার করে নিবে।
এপ্রিল ১২ (৮৪তম দিন)
এদিন থেকে যুদ্ধবিরতির তৃতীয় ধাপ শুরু হবে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত এখনও কিছু প্রকাশ করা হয়নি।