বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ০৩:২১ পূর্বাহ্ন




স্রোতের বিপরীতে মোংলা, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা সংসদীয় আসন: উন্নয়ন বনাম রাজনীতিবীদদের লাভ-লোকসান!

জাহিদ আল আমীন
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০২৫ ১২:২৬ pm
Bagerhat District বাগেরহাট পায়রা বন্দর বিদ্যুৎ Payra Thermal Power Plant coal-fired power station Kalapara Patuakhali পটুয়াখালী কলাপাড়া ধানখালী পায়রা কয়লা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট জাতীয় গ্রীড গ্রিড paira Bagerhat Rampal Power Station plant coal fired রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাগেরহাট potuakhali
file pic

বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ, শরণখোলার সঙ্গে মোংলাকে যুক্ত করে বাগেরহাট জেলায় একটি সংসদীয় আসন কমিয়ে দেয়া হয়েছে৷ আপাতদৃষ্টিতে এই বিভাজনকে বাগেরহাটের জন্য বৈষম্য মনে হলেও, এর ইতিবাচক দিকগুলোও বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘকাল ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে বাগেরহাট চার এবং ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে মোংলা-রামপাল নির্বাচনী আসন বাগেরহাট তিন। বিগত ৫৫ বছরে কোন এমপি এই এলাকার কী কী উন্নয়ন করেছেন? প্রিয় পাঠক/পাঠিকাগণ, আপনারা কি অত্র এলাকার উন্নয়নের একটা তালিকা করতে পারবেন?

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন জনসংখ্যা বিবেচনায় গাজীপুর জেলায় একটি সংসদীয় আসন বৃদ্ধি এবং বাগেরহাট জেলায় একটি সংসদীয় আসন কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে হায় হায় রব উঠেছে! কার গদি ছুটে গেলো। কার কতটুকুন লাভ-ক্ষতি হলো তা নিযে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষন চলছে। অথচ গত অর্ধশত বছরের বেশি সময় যাবৎ একটি ভৌগলিক সীমারেখায় সংসদীয় নির্বাচন হয়েছে। কত এমপি, মন্ত্রী এলো, গেলো, ভাগ্যবিড়ম্বিত দক্ষিনের এই জনপদের মানুষগুলো বঞ্চিতই রয়ে গেলো।

সুতরাং সংসদীয় আসনের পূণর্বিন্যাস যে উন্নয়নের পথে অন্তরায় নয়। বরং মোরেলগঞ্জ, শরনখেলার সঙ্গে সমুদ্র বন্দর সমৃদ্ধ মোংলাকে নিয়ে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী, বিনিয়োগ, বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে এই সংসদীয় আসনটি, সংকীর্ণ ব্যক্তি রাজনীতির স্বার্থ যাদের মগজে অহর্নিশি ঘুরপাক খায়, তাদের বুঝানোর সাধ্যি কার? এই এলাকার নির্বাচিত সংসদের এলাকায় দেশের বৃহত্তম সমুদ্র বন্দরটি থাকতে পারে, এমন হিসাব কয়জন কষে দেখেছেন?

পর্যালোচনার শুরুতে মোংলা, মোরেলগঞ্জ এবং শরণখোলার সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক:

মোংলা উপজেলা : বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম উপজেলা মোংলা। ১,৪৬১.২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মোংলা উপজেলা ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে ২০২২ আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুসারে মোংলা উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৩৭৯৪৭। তাদের মধ্যে পুরুষ: ৫৪.৭৩% নারী: ৪৫.২৪%। মোংলা উপজেলায় মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম: ৭১.৩১% হিন্দু: ২৪.৯৫% অন্যান্য: ৩.১৭৪%।

মোংলা্র শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার হার শিক্ষা ও সাক্ষরতার হার ৪২.৮০%। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৯৭নং আসন বাগেরহাট তিনে মোট ভোটার সংখ্য ৯৫১৬০ জন (ডিসেম্বর ২০২৩)। মোংলা-রামপাল বাগেরহাট তিন আসনে বিগত চার দশকের বিভিন্ন নির্বাচনে সংসদ সদস্য ছিলেন: আফতাব উদ্দিন হাওলাদার, তালুকদার আব্দুল খালেক, এ ইউ আহমেদ এবং হাবিবুন নাহার।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা: ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মোরেলগঞ্জ উপজেলার আয়তন ৪৩৮ বর্গ কিমি। এখানকার মোট জনসংখ্যা ৩০৪৮৬৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৪৬৮৭৩ জন, মহিলা ১৫৭৯৭৯ জন। উপজেলার মোট জনসংখ্যার মধ্যে ২৬৩৩৩২ জন মুসলিম, ৩১১৩৬ জন হিন্দু,৩৪ জন খ্রিস্টান এবং দু’জন জন বৌদ্ধ। মোরেলগঞ্জে মোট ভোটার সংখ্য্ব ১,৮৮,৮২১জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৯৩,৪০৩ জন এবং মহিলা ভোটার ৯৫,৪১৮ জন।

শরণখোলা উপজেলা: দক্ষিণের সবচেয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত জনপদের নাম শরণখোলা। এই উপজেলার আয়তন ১৫১.২৩ বর্গ কিলোমিটার। মোট জনসংখ্যা ১১৯০৮৪ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ৬২৪০০, মহিলা ৫৬৬৮৪। ধর্মের ভিত্তিতে জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে দেখা যায়ম শরণখোলায় মুসলিম জনসংখ্যা ১০৯৮৩৬, হিন্দু ৯২৩২, বৌদ্ধ ৪ এবং খ্রিস্টান ১২ জন।
শরণখোলা উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ১,৭৫৪০৫ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৫০,৭১২ জন এবং মহিলা ভোটার ৫০,০৪২ জন। শরণখোলায় শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার হার ৫৮.৯%।

মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা তথা বাগেরহাট সংসদীয় আসন চার থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শেখ আব্দুল আজিজ থেকে শুরু করে মাওলানা একেএম ইউসুফ, এডভোকেট আলতাফ হোসেন, মিয়া আব্বাস উদ্দিন, মুফতি আব্দুস সাত্তার আকন, আরশাদুজ্জামান, ডা. মোজাম্মেল হোসেন, আমিরুল আলম মিলন, এএইচএম বদিউজ্জামান।

এরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত কেউ নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। কেউ দলের আসন সংখ্যা বাড়িয়েছেন। কেউ ব্যক্তি জীবনে চরম মাত্রার সৎ ছিলেন। কেউ সীমাহীন দুর্নীতি করেছেন। কিন্তু অবহেলিত দক্ষিণের জনপদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণের জন্য কার কী অবদান?

মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার সঙ্গে মোংলা যুক্ত হওয়ায় রাজনীতিবীদদের কাজ একটু বেড়েছে৷ যারা রাজনীতি করেন, তারা একটু পরিশ্রম করুক, তাতে সাধারণ জনগণের খুব বেশি ক্ষতিবৃদ্ধি দেখিনা। এমপি, মন্ত্রী হয়ে মোরেলগঞ্জ – শরণখোলার জন্য কেউ বলার মতো কোন কাজ করে যান নি। মোংলা-রামপালেও জনকল্যান ও উন্নয়নমূলক কাজের তালিকা খুব সংক্ষিপ্ত।

অনেকেই এমপি হবার পরে ঢাকার এমপি হোস্টেলে দেখা করার জন্য লাইন ধরে বসে থাকতে হতো। জনগনের ভোটে নির্বাচিত বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের কাছে এলাকার মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ধমকিও খেতে হয়েছে। একজন পার্লামেন্ট মেম্বার হিসেবে এদের নিজ সংসদীয় এলাকা ঘুরে ঘুরে মানুষের খোঁজ-খবর নেয়ার কথা। কিন্তু ভোটের আগে অলি-গলি, খাল-বিল চষে বেড়ানো এই এলাকার কোন নেতা কি সংসদ সদস্য হয়ে তৃণমূল মানুষের দুয়ারে গিয়ে কোন অসহায়, দুস্থ মায়ের, বোনের খোঁজ-খবর নিয়েছেন?

জলবায়ু পরিবর্তণের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার জনপদগুলোর মধ্যে শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা উল্লেখযোগ্য। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ও বন্যা একটি নিয়মিত ঘটনা। যা এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা, ঘরবাড়ি ও কৃষিক্ষেত্র ধ্বংস করে দেয়। সিডর, আইলা, আম্পান প্রভৃতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এই এলাকার পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা আশংকাজনহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই এলাকার মানুষদের জীবন-জীবিকা ও টিকে থাকার সংগ্রামকে ভিন্ন আঙ্গিকে সাজাতে হবে। সমস্যাগুলোকে একপাশে রেখে সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

প্রস্তাবিত সুন্দরবন জেলা: দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলা। পদ্মাসেতূ নির্মানের পরে মোংলার সঙ্গে সারাদেশের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগের সহজ এবং দ্রুত পথ তৈরি হয়েছে। এই বন্দরের দিকে সরকার মনযোগ দিলে বাংলাদেশের প্রধান বন্দর হতে পারে।

সুন্দরবনঘেষা মোংলা, মোরেলগঞ্জ এবং শরণখোলা নিয়ে সুন্দরবন জেলা হতে পারে। যার সদরদপ্তর হতে পারে শরণখোলায়। জেলা ঘোষিত হলে বাংলাদেশের চির অবহেলিত এই জনপদে রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন অবধারিতভাবে হবে।

পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হবে সুন্দরবন জেলা। মোটেল, কটেজ থেকে শুরু করে ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার হোটেল হতে পারে দক্ষিণের এই জনপদে। সুন্দরবন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা সময়ের ব্যাপার হবে। এই অঞ্চলকে মানুষ বিশেষভাবে চিনবে। বন ও পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা থেকে এই এলাকায়, সুন্দরবনের কোলে স্থানান্তর করা কি খুব অন্যায় আব্দার ?

গ্রামের সাধারণ সহজ-সরল মানুষগুলো রাজনীতির লাভ-লোকসান বোঝেনা। তাদের এসব বোঝার প্রয়োজনও নেই। বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতি নিয়ে তেমন আগ্রহও নেই। এই মানুষগুলোর সুবিধা-অসুবিধা, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। গ্রামের মানুষদের কাছে সুস্থ, স্বাভাবিক, নিরাপদ জীবনই মুখ্য বিষয়। আসন বাড়া-কমায় রাজনীতিবীদদের আরামের ঘুম হারাম হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কোন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

ঝড়, বন্যা, লোনাজল, নদী ভাঙ্গণ আর বেকারত্বের কারণে পিছিয়ে পড়া উপকূলবর্তী দক্ষিণের এই জনপদের মানুষের জন্য টেকসই উন্নয়ন প্রয়োজন। একজন সংসদ সদস্য কমানো-বাড়ানোর জন্য রাজনীতিবীদগণ যেভাবে সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ভেদাভেদ ভুলে একমঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছেন, পিছিয়ে পড়া উপকূলীয় এই তিন উপজেলার প্রকৃত উন্নয়নের লক্ষ্যে সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হতো, জীবন কতোই না সুন্দর হতো!

জাহিদ আল আমীন, জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক।
ই-মেইল: zahidalaminbd@gamil.co




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD