বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৩:১২ পূর্বাহ্ন




ভিসা হলেও যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত দিতে হবে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০২৫ ৬:৪৪ pm
New York City নিউ ইয়র্ক শহর ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকা North America United States United State usa
file pic

নির্দিষ্ট কিছু দেশের ভ্রমণকারীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করার আগে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত (বন্ড) জমা দিতে হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী নতুন পদক্ষেপ হিসেবে এ–সংক্রান্ত এক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আপাতত দুই দেশ জাম্বিয়া ও মালাবির ভ্রমণকারীরা এ নীতির প্রথম নিশানা হবেন।

২০ আগস্ট থেকে শুরু হবে ১২ মাসের এ পরীক্ষামূলক কর্মসূচি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বি-১ ব্যবসায়িক ভিসা ও বি-২ পর্যটন ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত পররাষ্ট্র দপ্তরের অস্থায়ী চূড়ান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, এ কর্মসূচি এমন দেশগুলোর নাগরিকদের নিশানা করবে, যেসব দেশের ভিসাধারীদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার (ওভারস্টে) হার ঐতিহাসিকভাবে বেশি। তবে ভ্রমণকারীরা জামানতের শর্ত মেনে চললে জমাকৃত অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

জাম্বিয়া ও মালাবির ভ্রমণকারীরা এ নীতির প্রথম নিশানা হবেন বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছে। ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং মার্কিন ভিসাধারী দর্শনার্থীদের জন্য নতুন কিছু ফি চালু করার পর এ সিদ্ধান্ত নিল যুক্তরাষ্ট্র।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ থাকার হার বেশি, তাঁদের এ জামানত দিতে হবে। তবে কানাডা ও মেক্সিকোর ভ্রমণকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ওয়েভার কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ৪০টির বেশি দেশের নাগরিক এর বাইরে থাকবেন। এ কর্মসূচির অধীন নাগরিকেরা ৯০ দিন পর্যন্ত ব্যবসা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা ছাড়া যেতে পারেন।

নতুন নীতির প্রক্রিয়া ও এর পেছনের ইতিহাস এবার জেনে নেওয়া যাক:

ভিসা বন্ড কী
ভিসা বন্ড হলো একধরনের আর্থিক নিশ্চয়তা। কিছু দেশ নির্দিষ্ট বিদেশি নাগরিকদের সাময়িক ভিসা দেওয়ার আগে এমন জামানত বা নিশ্চয়তা নিয়ে থাকে; যেন তাঁরা ভিসার শর্ত, বিশেষ করে থাকার সময়সীমা মেনে চলেন।

প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র হাজারো বিদেশি শিক্ষার্থী, পর্যটক ও কর্মীকে অস্থায়ী নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেয়। এসব ভিসার মেয়াদ কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে।

কোনো নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাধারী অনুমোদিত মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে সেটি ভিসা ওভারস্টে বলে গণ্য হয়।

বেশির ভাগ দেশই ভিসার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকার প্রমাণ চায়। কিন্তু ফেরতযোগ্য জামানত দিয়ে দেশে প্রবেশের অনুমতি প্রদানের ব্যবস্থা চালু করেনি। নিউজিল্যান্ড একসময় ওভারস্টে নিয়ন্ত্রণে ভিসা বন্ড চালু করেছিল, পরে তা আর কার্যকর হয়নি। ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্য কিছু ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের ভ্রমণকারীদের জন্য ভিসা বন্ড চালুর উদ্যোগ নেয়, কিন্তু পরে তা বাতিল করে।

বন্ডের পরিমাণ কত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বন্ডের তিনটি স্তর আছে—৫ হাজার, ১০ হাজার ও ১৫ হাজার ডলার। পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কর্মসূচি চলাকালে প্রায় দুই হাজার ভিসা আবেদনকারীকে এ জামানত দিতে হবে।

‘যদি গড়ে জামানতের পরিমাণ ১০ হাজার ডলার ধরা হয়, তবে ২ হাজার আবেদনকারীর জন্য তা অঙ্কের হিসাবে দাঁড়াবে মোট ২ কোটি ডলারে’, বলা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

জামানতের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন কনস্যুলার কর্মকর্তারা। তাঁরা আবেদনকারীর ‘ব্যক্তিগত অবস্থা’, যেমন ভ্রমণের কারণ, চাকরি, আয়, দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতাও বিবেচনায় নেবেন।

তবে কিছু ক্ষেত্রে জামানত মওকুফের সুযোগ থাকবে, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীদের ভ্রমণ বা জরুরি মানবিক প্রয়োজন।

অতীতে এমন কিছু হয়েছে কি
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে পররাষ্ট্র দপ্তর ভিসা বন্ড কর্মসূচি চালুর চেষ্টা করেছিল। তবে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ হ্রাস পাওয়ায় তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ দপ্তরের নির্দেশনায় কনস্যুলার কর্মকর্তাদের ভিসা বন্ড নিতে অতীতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কেননা, এটি ‘জটিল’ প্রক্রিয়া এবং এ নিয়ে জনমনে ভুল ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। তবে দপ্তর বলেছে, এমন দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে সাম্প্রতিক কোনো উদাহরণ বা প্রমাণ নেই। কারণ, সাম্প্রতিককালে ভিসা বন্ড সাধারণত নেওয়া হয়নি। ২০২০ সালের পরীক্ষামূলক কর্মসূচি থেকেও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাতে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে দেখা যাচ্ছে, অনেক বিদেশি নাগরিক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করলেও তাঁদের প্রস্থানের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এতে প্রমাণ হয় যে প্রতিবছর হাজার হাজার নন-ইমিগ্র্যান্ট দর্শনার্থী ভিসার শর্ত মেনে নির্ধারিত সময়ে দেশ ছাড়েন না।

কোন দেশগুলো প্রভাবিত হবে
৫ আগস্ট পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মালাবি ও জাম্বিয়ার নাগরিকদের ওপর প্রথমে এ নীতি প্রয়োগ করা হবে। দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, ২০ আগস্ট থেকে মালাবি ও জাম্বিয়ার বি-১, বি-২ ব্যবসা ও পর্যটন ভিসার আবেদনকারীদের সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত দিতে হবে।

পরবর্তী সময় আরও দেশকে তালিকাভুক্ত করা হবে, যদি তাদের ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ থাকার হার বেশি হয়, স্ক্রিনিং ও যাচাই প্রক্রিয়া দুর্বল হয় অথবা তারা ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট’ কর্মসূচি চালায়। তালিকা পুরো কর্মসূচি চলাকালে সংশোধন হতে পারে।

‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট’ কর্মসূচিতে মূলত বিনিয়োগের বিনিময়ে বিদেশিদের কাছে নাগরিকত্ব বিক্রি করা হয়। এ কর্মসূচিতে বসবাসের কোনো শর্ত থাকে না। এ ধরনের কর্মসূচি আছে এমন দেশের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, অস্ট্রিয়া, জর্ডান, সেন্ট লুসিয়া ও তুরস্ক।

কোন দেশগুলোর ভিসা ওভারস্টে হার বেশি
২০২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ, হাইতি, লাওস, মিয়ানমার ও ইয়েমেনের বি-১ ও বি-২ ভিসাধারীদের মধ্যে অনুমোদিত মেয়াদের পরও যুক্তরাষ্ট্রে থাকার হার সবচেয়ে বেশি।

ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন ১২ দেশের অনেকটি, যেমন চাদ ও ইরিত্রিয়ার ভিসা ওভারস্টে হারও বেশি।

অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে কত শতাংশের ভিসা ওভারস্টে
কংগ্রেসে দেওয়া প্রতিবেদনে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানিয়েছে, ২০২৩ অর্থবছরে ভিসাধারীদের প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখের প্রস্থান করার কথা ছিল। কিন্তু ওই বছর প্রায় ৪ লাখ মানুষ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গেছেন।

মার্কিন অভিবাসন নীতিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে থাকা অভিবাসীদের একটি বড় অংশেরই ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আর এ কারণেই দেশটিতে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে।

১৯৯০-এর দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাচারালাইজেশন সার্ভিস (আইএনএস) ২০০২ সালে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীর প্রায় ৪১ শতাংশ ভিসা ওভারস্টে।

২০০৩ সালে আইএনএস নতুনভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখায়, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের ৩৩ শতাংশ ভিসা ছিল ওভারস্টে।

এ বিষয়ে অধিকতর সাম্প্রতিককালের তথ্য দিয়েছে অভিবাসন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ। তারা জানিয়েছে, ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে থাকা জনসংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশ ভিসা ওভারস্টে ছিল। ২০২৪ সালেও তারা একই হার উল্লেখ করেছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ জনসংখ্যাবিদ জেফ্রি প্যাসেলের মতে, বিশেষ করে সীমান্ত পার হওয়ার ধরন ও উৎস দেশ বদলে যাওয়ায় ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণের ঘটনা শনাক্ত ও নজরদারি করা এখনো কঠিন। আল জাজিরা




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD