রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে বিভিন্ন পদে ১৫৭ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছাত্র ১৪৪, ছাত্রী ১৩। গতকাল মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র বিতরণের শেষ দিনে প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ ছাত্রী লড়াইয়ে আছেন। অবশ্য পরে মনোনয়নপত্র জমা ও বিতরণ ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন।
জমা পড়া মনোনয়নপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সহসভাপতি (ভিপি), মহিলাবিষয়ক সম্পাদক, সহকারী মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী সদস্য ছাড়া অন্য ১৬ পদে স্বতন্ত্রভাবে ছাত্রীদের কেউ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেননি। দুটি প্যানেল মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও এর একটিতে কোনো ছাত্রী নেই; অন্যটিতে আছেন পাঁচজন। অথচ মোট ভোটারের ৩৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ছাত্রী।
ছাত্রীদের অভিযোগ, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। প্রার্থী হিসেবে কোনো ছাত্রীর নাম আলোচনায় এলেই সাইবার বুলিং করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত সম্মানহানির ভয়ে অনেকেই আগ্রহ হারাচ্ছেন। ছাত্র সংসদেই এমন হলে, জাতীয় নির্বাচনে কী হবে, তা নিয়েও শঙ্কিত তারা।
রহমতুন্নেসা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তাহমিদা নাসরিন বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এখন যে পরিবেশ, অংশ নিলে আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা মন্তব্য হবে। আমার ছবি ডিপফেক দিয়ে এডিট করে প্রচার করার ঘটনাও ঘটতে পারে। অনেক ভেবেও নির্বাচন করার সাহস পাচ্ছি না।
খালেদা জিয়া হলের শিক্ষার্থী অশেকা জাইমা জানান, সাইবার বুলিংয়ের কারণে তাঁর মতো অনেকেই সরে এসেছেন। যে কোনো আন্দোলনে ছাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু কখনও তাদের অবদানের সঠিক মূল্যায়ন হয় না, আক্ষেপ জাইমার।
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন দীর্ঘদিন বুলিং প্রতিরোধে প্রশাসনকে সেল গঠনের কথা বলে আসছে। আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ অবস্থায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন নারী প্রার্থীরা। ভিপি পদে একমাত্র নারী প্রার্থী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক তাসিন খান বলেন, ক্যাম্পাসে নারীর প্রতিযোগিতা করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ নেই। অ্যান্টি সাইবার বুলিং সেল গঠনে আশ্বাস দিলেও প্রশাসনের উদ্যোগ নেই। নির্বাচনে গেলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে– এমন শঙ্কায় অনেকেই দ্বিধান্বিত। আমি নিজেও ভেবেছিলাম ফরম তুলব না। তবে প্রিয়জনরা সাহস দেওয়ায় শেষ মুহূর্তে তুলেছি। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে আমার নিরাপত্তা নিয়ে এখনও আমি শঙ্কিত।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যে, মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ হাজার ৮৯২। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৩৫১ ছাত্র, ছাত্রী ৯ হাজার ৭৪১। মোট ভোটারের ৩৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ছাত্রী।
প্রার্থিতার ঘোষণা ফেসবুকে প্রকাশের পর বুলিংয়ের শিকার শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিন বিশ্বাস এষা বলেন, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর ইনবক্সে অনেকেই বাজে মন্তব্য পাঠিয়েছেন। আমার পোস্ট রুমমেট শেয়ার করলে তাকেও ইনবক্সে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করা হয় ভুয়া আইডি থেকে। তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই এসব পেজ, গ্রুপের অ্যাডমিন-মডারেটরদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নারীবান্ধব ভোটের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু প্রশাসনের সদিচ্ছা তো দেখছি না। রাকসুতেই এ অবস্থা; বট আইডি জাতীয় নির্বাচনে কী করবে, ভাবতেই পারছি না।
সূত্র জানায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট দুটি ফেসবুক গ্রুপের পাশাপাশি অর্ধশতাধিক পেজ রয়েছে। এসব পেজ থেকে বিভিন্ন সময় বিদ্রুপ ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। চরিত্র হনন করে পোস্ট করা হয়। এসব পোস্ট সাধারণত ভুয়া আইডি দিয়ে করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা চেয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শাহ মখদুম হলের শিক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম রাজু বলেন, সাইবার বুলিং রাকসু নির্বাচনের অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের আগেই এটি সমাধান জরুরি। প্রশাসন নির্বিকার থাকলে নির্বাচন সুষ্ঠু তো হবে না; ভবিষ্যতের নেতাও তৈরি হবে না।
শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, কিছু উগ্রপন্থি গোষ্ঠী সাইবার বুলিং ও বট সন্ত্রাসের সংস্কৃতি চালু করেছে। অনেক শিক্ষার্থী নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন না। প্রশাসনও তেমন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এ ব্যাপারে ফোকলোর ও সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, সাইবার বুলিং, ব্যক্তি আক্রমণের মাধ্যমে চরিত্র হনন ও অপ্রীতিকর মন্তব্য নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা বেশি ভুক্তভোগী। সাইবার বুলিং রোধে আইন রয়েছে। ভয়ে সরে না দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের উচিত বেশি বেশি নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। বুলিংয়ের প্রতিবাদ জানাতেই নির্বাচন করতে হবে।
প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, সাইবার বুলিং শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আমাদের নেই। একমাত্র পুলিশ প্রশাসন আমাদের যতটুকু সহায়তা করবে, ততটুকু বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারব। এটি সময়সাপেক্ষও।
তিনি বলেন, প্রশাসন সাইবার বুলিং রোধে সেল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের ভালো জানাশোনা আছে, তাদের সমন্বয়ে সেল হবে। সেল শুধু রাকসু নির্বাচন নয়, দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করবে।
মনোনয়নপত্র বিতরণের সময় বাড়ল, প্রতিবাদে বিক্ষোভ
রাকসু ও ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিতরণের সময়সীমা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গতকাল রাকসুর কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম। মনোনয়নপত্র বিতরণের সময় বাড়ানোয় নির্বাচন ঠিক সময়ে অনুষ্ঠিত না হওয়ার আশঙ্কায় প্রতিবাদ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবির, সাবেক সমন্বয়ক ও শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর বেশ কিছু দাবি ও ছাত্রদলের দুই মাস সময় চাওয়ার ‘অনুরোধ’-এর পরিপ্রেক্ষিতে এদিন নির্বাচন কমিশনের জরুরি সভা বসে। দুপুর ২টায় শুরু হওয়া এ সভা বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে। এর আগে দুই দফায় বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন। এ সভায় একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় ভোটকেন্দ্র আবাসিক হল থেকে একাডেমিক ভবনে স্থানান্তর, ভোটার তালিকায় ছবি সংযুক্তি ও সাইবার বুলিং রোধে একটি কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে নির্বাচন পেছানো হবে কিনা, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে কমিশন।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে মনোনয়নপত্র বিতরণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেনি ছাত্রদল, শিবির
মনোনয়নপত্র সংগ্রহের শেষ দিন গতকাল শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ একাধিক প্যানেলের কোনো প্রার্থী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেননি। তবে দুপুর ২টার দিকে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা মিলে রাকসুর ২৩টি ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে পাঁচটি পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। এর পর বিকেল ৩টার দিকে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ১০টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে। তবে কে, কোন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা জানাননি তারা।
সময় বাড়ানোর প্রতিবাদ
নির্বাচন কমিশনের মনোনয়নপত্র বিতরণের সময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ও নির্বাচন পেছানোর আলোচনার বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সাবেক সমন্বয়ক এবং শিক্ষার্থীরা। তারা ১৫ সেপ্টেম্বরেই নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান। বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত রাকসুর কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে তারা আন্দোলন করেন। তারা ‘এক দফা এক দাবি, ১৫ তারিখে রাকসু দিবি’, ‘অবৈধ সিন্ডিকেট, মানি না মানব না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, নির্বাচন কমিশন যে সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করেছে, তাতে ১৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচন আয়োজন নিয়ে আমরা শঙ্কিত। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীরা মেনে নেবেন না।
সময় বাড়ানোর বিষয়টি তারা কীভাবে দেখছেন, জানতে চাওয়া হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সম্ভাব্য ভিপি প্রার্থী মাহমুদুল হাসান মিঠুর কাছে। তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। মিঠু বলেন, অপরিপক্বতার কারণে প্রশাসন বারবার নির্বাচনের তপশিল পুনর্বিন্যস্ত করছে আর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে ছাত্রদলের ওপর।
আচরণবিধি লঙ্ঘন
রাকসুর আচরণবিধি অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিলের সময় কোনো মিছিল বা শোভাযাত্রা করা যাবে না। প্রার্থী পাঁচজনের বেশি সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন না। তবে অধিকাংশ প্রার্থীই আচরণবিধি লঙ্ঘন করে দলবল নিয়ে এসে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সমকাল