বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বসানো কয়লাভিত্তিক দুই বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা ও রামপাল কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম আপাতত কমছে না। পায়রা কেন্দ্রের অংশীদার চীনের সিএমসি কোম্পানি এবং রামপাল কেন্দ্রের অংশীদার ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি (এনটিপিসি) অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও বিদ্যুতের দাম কমাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ভূরাজনীতিসহ নানা কারণে এ সরকারের আমলে এ দুটি কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম কমছে না বলে মনে করছেন অনেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
রামপাল ১৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৩ দশমিক ৫৭ এবং একই মেগাওয়াটের পায়রা থেকে ১২ টাকা করে কিনছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান কয়লাভিত্তিক মাতারবাড়ী ১২০০ মোগওয়াটের কেন্দ্র থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ কিনছে মাত্র ৮ দশমিক ৪৫ টাকায়। মাতারবাড়ীর বিদ্যুতের দাম গত এপ্রিলে ঠিক করা হয়। এরপর পিডিবি মাতারবাড়ী কেন্দ্রের দামে বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য পায়রা ও রামপালকে প্রস্তাব দেয়। পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, পায়রা ও রামপাল বিদ্যুতের দাম কমাতে চাইছে না। তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিক কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
জানা যায়, ওই দুই কেন্দ্রের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের অর্থ লগ্নিকারী ব্যাংক ওই দুই প্রকল্পের ঋণের সুদ কমাতে রাজি হয়নি। তাই বিদ্যুৎ বিক্রির দাম (ট্যারিফ) কমানো সম্ভব হবে না।
বহুল আলোচিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি লিমিটেডে (বিআইএফপিসিএল) ৫০ শতাংশ করে মালিকানা আছে পিডিবি ও ভারতের এনটিপিসির। এ কোম্পানিই বাগেরহাট জেলার রামপালে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ব্যয় হয়েছে ২০০ কোটি ডলার।
এর মধ্যে ভারতের এক্সিম ব্যাংক ১৬০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। বাকি ১৫ শতাংশ করে বিনিয়োগ করেছে দুই দেশের দুই প্রতিষ্ঠান। তবে এক্সিম ব্যাংকের ঋণের জামিনদার বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে ওই ঋণচুক্তি সই হয়। চাইনিজ সিএমসি কোম্পানির সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ৫০ শতাংশ করে মালিকানায় গঠিত বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড। এর আওতায় ২০২০ সাল থেকে পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। সেখানে চীনের এক্সিম ব্যাংক অব চায়না ১৯৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। সিএমসিও বিদ্যুতের দাম কমাতে চাইছে না।
নর্থওয়েস্ট পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুল হাসান বলেন, নর্থওয়েস্টের পরিচালনা পর্ষদের ১১ জন পরিচালক চাইছেন পায়রার বিদ্যুতের দাম কমাতে। এ ব্যাপারে পায়রা বিদ্যুৎ কোম্পানিকে জানানো হয়েছে। কিন্তু ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নর্থওয়েস্টে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে বিদ্যুতের দাম কমানোর একক কোনো ক্ষমতা নেই।
বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানির ওয়েবপেজের তথ্য অনুযায়ী, এ কোম্পানির চেয়ারম্যান হচ্ছেন জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম। বাকি দুই সরকারি প্রতিনিধি হচ্ছেন পিডিবির চেয়ারম্যান এবং নর্থওয়েস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এছাড়া তিনজন সিএমসির চাইনিজ প্রতিনিধি।
রামপাল ও পায়রাকে প্রতিমাসে ৩৫০ কোটি টাকা করে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। পুরোদমে উৎপাদন করলে এ দুই কেন্দ্রের প্রতিটিকে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা বিল দিতে হয় পিডিবিকে। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কমদামে বিক্রির কারণে পিডিবি গত অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার থেকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এরপরও শুধু গত বছরে পিডিবির ঘাড়ে লোকসানের বোঝা ১৭ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি। এ অবস্থায় বিদ্যুতের উৎপাদন অথবা ক্রয়মূল্য কমাতে উদ্যোগ নিলেও তা তেমন একটা কাজে আসেনি। বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সরকারকে কম দামে বিদ্যুৎ দিতে রাজি হচ্ছে না। এটা খুব হতাশাজনক। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের অংশীদারিত্ব থাকলেও রামপাল চালাচ্ছে ভারতীয় কোম্পানি। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানান, বিগত সরকারের আমলে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে অতিরিক্ত বিনিয়োগ দেখিয়ে অনেক অনিয়ম করা হয়েছে। সেগুলোর খেসারত এখন সাধারণ জনগণকে দিতে হচ্ছে।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রতি ইউনিট ১১ দশমিক ৩৫ টাকা। এটি ২০২৪-২০২৫ সালে ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ১০ টাকা।
(যুগান্তর)